রবীন্দ্রনাথের আত্মমর্যাদা ও আত্মমুক্তির সন্ধানে
২৫ বৈশাখ জন্মতিথির শ্রদ্ধার্ঘ্য
বাবুল চন্দ্র সূত্রধর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙ্গালি জাতির পরিচয়ের অনন্য প্রতীক। সাহিত্য ছাড়াও সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখায় ছিল তাঁর লেখনীর বলিষ্ট স্পর্শ। তাঁর লেখনী শক্তির মহিমা তাই শুধু দেশ বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি-দেশ থেকে দেশান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে তা প্রবাহিত হয়ে চলেছে গৌরবের সাথে, মর্যাদার সাথে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর একটি কথা প্রায়শই মনে পড়ে। তিনি বলেছেন, “বিশ্ব সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে রবীন্দ্র প্রতিভার বহুমুখিনতার সঙ্গে তুলনীয় আরেকটি প্রতিভার সন্ধান লাভ করা সহজ নয়। ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিণী, পত্রসাহিত্য, গান, ছড়াসহ কোন অঙ্গন নেই যাকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসামান্য সৃজনশীলতায় ঐশ্বর্যম-িত করে তোলেননি। এর এক একটি শাখার মধ্যেও একইসঙ্গে কী গভীরতা ও বৈচিত্র্য।” বললে অত্যুক্তি হয় না যে, রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে রস, ভাব, ছন্দ, শব্দশৈলী, বাক-চাতৃর্য কিংবা শিল্প বৈচিত্র্য প্রভৃতির আড়ালে যে মূল্যবান বিষয়টি পাঠককুলের নিকট সুক্ষভাবে ধরা পড়ে, তা হলো, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদাবোধ- মানুষের প্রতি মানুষের আচরণের গতি-প্রকৃতি। আমরা যে সমাজের মানুষ বলে সৃষ্টির সেরা পদটির দাবি নিয়ে বাহদুরি করে থাকি, তার সার্থকতা মানুষের সার্বিক আচরণের ফসল বই আর কিছু নয়। ভালো বা মন্দ, উন্নত বা অনুন্নত- সমাজের চেহারা যেমনই হোক, তা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া দ্বারাই মূলত নির্ণীত হয়ে থাকে।
সমাজবিজ্ঞানে একটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় অধ্যয়ন করা হয়; ‘সামাজিক স্তরবিন্যাস’ নামক এই প্রত্যয়টি মূলগতভাবে সমাজে বসবাসকারী জনসমষ্টির আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ক্রমোচ্চ চিত্র অঙ্কন করে থাকে। অর্থাৎ, এই প্রত্যয়টি সুষ্টুভাবে উপলব্ধি করতে পারলে একটি নির্দিষ্ট সমাজের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন, অগ্রসর-অনগ্রসর, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রভৃতি স্তরের ধরন, কারণ, প্রভাব, ফলাফল প্রভৃতি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট জ্ঞান লাভ করা যায়। সামাজিক স্তরবিন্যাসের বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা থেকে সমাজে অনুসৃত নীতি-নৈতিকতা, ধ্যান-ধারণা ও আদর্শিক মানদ-ের সম্যক চরিত্রও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। যে সমাজব্যবস্থায় মানুষের মধ্যকার উচ্চ-নীচ ব্যবধান যত বেশি সে সমাজ ব্যবস্থা তত বেশি বৈষম্যমূলক, সামাজিক গবেষণা বা পরিসংখ্যানের আশ্রয় গ্রহণ না করেও এ কথা বলা যেতে পারে। ধরুন, কোন সমাজে যুগ যুগ ধরে একটি জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারছে না আবার ঐ সমাজেরই অপর এক জনগোষ্ঠী সম্পদের পাহাড় রচনা করে উর্ধমুখি যাত্রা অব্যাহত রেখেছে, সে সমাজের নৈতিকতা বৈষম্যমূলক; এখানে সম্পদের বণ্টনব্যবস্থা, আয়ের উৎস তথা বৃত্তির অধিকার, সামাজিক পরিষেবা বিতরণের প্রক্রিয়া, মানবিক মূল্যায়নের ভিত্তি, পারস্পরিকতার ধরন প্রভৃতি সব কিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আবার, উর্ধে অবস্থানকারী গোষ্ঠী, যারা আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠা লাভে সমর্থ হয়েছে, তারা বিভিন্ন সময়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে তাদের অধস্তন অবস্থানের জন্য দায়ী করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে থাকেন। নানা নেতিবাচক বিশেষণ প্রদান করে তাদেরকে ছোটো করার, তাদের দীনতাকে আরো প্রকট করে তোলার প্রচেষ্টাও দেখা যায়। কিন্তু সমাজে কোন ধরনের নৈতিক আদর্শ লালনের ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং এতে অগ্রসর জনগোষ্ঠীর কোন দায় রয়েছে কি না, এ বিষয়ে বিশেষ কোন বক্তব্য শোনা যায় না। এখানেই আমরা মানবপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পাই; ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “যে-মানুষকে মানুষ সম্মান করতে পারে না, সে-মানুষকে মানুষ উপকার করতে অক্ষম। .. .. এখানে (রাশিয়ায়) এসে যেটা সবচেয়ে আমার চোখে ভাল লেগেছে, সে হচ্ছে এই ধনগরিমার ইতরতার সম্পূর্ণ তিরোভাব। কেবলমাত্র এই ক্রাণেই এদেশে জনসাধারণের আত্মমর্যাদা এক মুহূর্তে অবারিত হয়েছে। চাষাভূষা সকলেই আজ অসম্মানের বোঝা ঝেড়ে ফেলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে। এইটে দেখে আমি যেমন বিস্মিত তেমনি আনন্দিত হয়েছি। মানুষে মানুষে ব্যবহার কী আশ্চর্য সহজ হয়ে গেছে।”
মানুষে মানুষে এই যে সহজ সম্মিলন, পারস্পরিকতা, বুঝাপড়া, আদান-প্রদান ও ভাবের বিনিময়- এসবকে অবজ্ঞা করে বা পাশ কাটিয়ে টেকসই বা আদর্শ সমাজব্যবস্থার যাত্রা নিশ্চিত হতে পারে না, এটিই সমাজের প্রাণস্বরূপ। সম্মানজনক পারস্পরিক মূল্যায়নের উপলব্ধি থেকে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় দায়বদ্ধতা তথা কর্তব্যের বোধ। কর্তব্যবোধের প্রেরণা মানুষের মনে বপন করে মালিকানার দুর্মূল্য বীজ। মালিকানার অনুভূতি থেকেই মানুষ বলিষ্ট কণ্ঠে বলতে পারে, ‘আমার দেশ’, ‘আমার সমাজ’, ‘আমার পথ’, ‘আমার প্রতিষ্ঠান’ প্রভৃতি। যত চেষ্ঠাই করুন, সকল মানুষের অন্তরে সমভারে ‘আমার’ কিংবা ‘আমাদের’ অনুভূতির অনুরণন না ঘটাতে পারলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়টিকে অত্যন্ত সুষ্পষ্ট করেছেন, “যেখানেই অনুগ্রহ আসিয়া সকলের চেয়ে বড়ো আসনটা লয় সেইখান হইতেই কল্যাণ বিদায় গ্রহণ করে। সকলের গোড়ায় দরকার লোক সাধারণকে লোক বলিয়া নিশ্চিতরূপে গণ্য করা।”
মানুষ আত্মমর্যাদার উপলব্ধি করে তখনই, যখন সমাজ থেকে সে যথাযোগ্য মূল্যায়ন পেয়ে থাকে। এমন সমাজব্যবস্থাও তো রয়েছে. যেখানে সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্তেও কাঙ্খিত বস্তু (চাকরি, ব্যবসায়, পরিষেবা, সম্মান, পদবী, বৃত্তি প্রভৃতি) লাভে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে! এতে একদিকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে ও অপরদিকে সমাজকে বঞ্চিত করা হচ্ছে প্রকৃত মেধার সেবা থেকে। শধু তাই নয়, অলক্ষ্যে সমাজ কলঙ্কিতও হচ্ছে। রাজনৈতিক ও মতাদর্শভিত্তিক বিদ্বেষ ও নিষ্ঠুরতার কথা নাই বা বললাম। এভাবে কি সুন্দর ও অর্থবহ সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব?
সমাজের সকল মানুষের মনে আত্মমর্যাদার এই অমূল্য উপলব্ধি ঘটানো তাই খুব জরুরী। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই নিজেকে/ নিজেদেরকে আত্মনির্ভরতায় বলীয়ান করে তুলে বা অন্তত তুলতে সচেষ্ট হয়। আর তখনই মানুষের মানসলোক থেকে আপনা-আপনি এ গান ধ্বনিত হয়ে ওঠে-
“আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা-
তরিকে পারি শকতি যেন রয়,
আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত¦না,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : আত্মশক্তি কবিতা)
রবীন্দ্রনাথ বিত্তের স্বাধীনতার চেয়েও চিত্তের স্বাধীনতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পরাধীন চিত্ত কখনো আত্মমর্যাদার কথা ভাবতে পারে না, মুক্তি তো দূরের কথা। চিত্ত বা মন থেকে যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে ভাবতে পারবে, তখনই সে তার নিজকে নিয়ে তৃপ্তি বোধ করতে পারবে। তার বৈভবের পরিমাণ সামান্য হোক, তার পদবী ছোটো হোক, সে তখন এসব বিবেচনায়ই আনতে চাইবে না; যেমনটা ‘জোনাকি’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
“তুমি নও তো সূর্য নও তো চন্দ্র
তোমার তাই বলে কি কম আনন্দ
তুমি আপন জীবন পূর্ণ করে
আপন আলো জ্বেলেছো। ….
তুমি আঁধার-বাঁধন ছাড়িয়ে ওঠো
তুমি ছোটো হয়ে নও গো ছোটো
জগতে যেথায় যত আলো
সবায় আপন করে ফেলেছো।”
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ও জোনাকি, গীতবিতান)
শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই নয়, জাতির ক্ষেত্রেও একই ধারণা প্রযোজ্য। আত্মমর্যাদা ব্যতীত কোন জাতি গঠিত হতে পারে না, আর পারলেও তা টেকসই হয়ে উঠতে পারে না। এজন্যই স্বাধীন জাতির অভিধা থাকা সত্তেও পৃথিবীর সকল জাতির মূল্যায়নগত অবস্থান সমান নয়। পৃথিবীতে অস্তিত্বশীল সকল জাতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমরা বলতে পারি যে, মার্কিন, বৃটিশ, রুশ বা ফরাসী জাতির সাথে নিশ্চয়ই আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকা এমনকি এশিয়ার অনেক জাতির মূল্যায়নের নিক্তি বিস্তর ভারসাম্যহীন, কারণ যাই হোক। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, অধিকার, আইন, বিচার, নিরাপত্তা প্রভৃতির নিরীখে উন্নত বলে সমাদৃত জাতিসমূহ রাষ্ট্র, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি পর্যন্ত এমন এক শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়েছে, যেখানেনাগরিক হিসেবে একজন ব্যক্তির মনেও কোন হতাশা বা হীনমন্যতা নেই। ব্যক্তির এহেন আত্মমর্যাদার বোধই জাতীয় চেতনায় পরিণত হয়, যা মুক্তির পথকে সুপ্রশস্ত করে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রচুর লেখায় এই বিষয়টির অবতারণা পরিলক্ষিত হয়। বিনয়ের সাথে স্বীকার করছি যে, এই লেখাটি রবীন্দ্রনাথের অনুরূপ চিন্তার খুবই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি প্রয়াস মাত্র। আমরা এখানে তাঁর কেবল দু’তিনটি লেখার আলোকে এটি সাজানোর চেষ্টা করেছি। ২৫ বৈশাখ এই মহাপ্রাণের শুভ জন্মতিথিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
লেখক: বাবুল চন্দ্র সূত্রধর, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক












