প্রসঙ্গ: উপকূলের নিরাপত্তায় আধুনিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র এখন সময়ের দাবি
সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ মানেই প্রকৃতির সঙ্গে এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। বিশেষ করে সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ ধসের আতঙ্কে দিন কাটায়। বৈশাখের কালো মেঘ কিংবা বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নি¤œচাপের খবর এলেই উপকূলের মানুষের মনে ফিরে আসে আইলা, সিডর কিংবা আম্পানের ভয়াবহ স্মৃতি। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র—এটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় অবহেলার একটি বড় উদাহরণ।
প্রযুক্তির এই যুগে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। একটি নির্ভরযোগ্য সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অনেক সময় হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে। কিন্তু আশাশুনিসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো সেই ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। স্থানীয় মানুষদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তারা শুধু দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছেন না; তারা লড়াই করছেন অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও তথ্যের অপ্রতুলতার সঙ্গেও। আইলার সময় সময়মতো খবর না পাওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষ বিপদের মুখে পড়েছিল। অথচ সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা যথেষ্ট শিক্ষা নিতে পারিনি।
বর্তমানে স্থানীয় আবহাওয়া অফিসগুলো সীমিত তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠায়। এরপর বিশ্লেষণ শেষে সতর্কবার্তা আসে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ ঘটে, যা দুর্যোগের সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উপকূলের নদী ও সাগরসংলগ্ন অঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে সক্ষম। ফলে আশাশুনি অঞ্চলে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপন এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বেড়িবাঁধের দুর্বলতা উপকূলবাসীর জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আশাশুনি ও শ্যামনগর অঞ্চলের বহু কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হলে এসব বাঁধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই কেবল আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ বা বাঁধ সংস্কার করলেই চলবে না; প্রয়োজন দুর্যোগের আগাম ও নির্ভুল তথ্য দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় মৃত্যুহার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সেই সফলতা ধরে রাখতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইটনির্ভর তথ্য, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, সাইরেন নেটওয়ার্ক, মোবাইলভিত্তিক সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য প্রচারের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত আশাশুনি ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলকে ঘিরে একটি আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও সাধারণ মানুষকে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে আরও সচেতন করতে হবে।
উপকূলের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছেন, তারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে জানেন। কিন্তু তাদের সেই লড়াইকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। দুর্যোগের আগাম বার্তা যদি সময়মতো পৌঁছে যায়, তাহলে অসংখ্য প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। তাই আশাশুনিসহ উপকূলীয় অঞ্চলে আধুনিক ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র স্থাপন এখন শুধু একটি দাবি নয়Ñএটি সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন।












