প্রসঙ্গ: শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং ভোমরা স্থলবন্দরের সংকট
একটি দেশের অর্থনীতির ফুসফুস হলো তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিচালিত হয়, তা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎপাদনকারী কেন্দ্র ‘ভোমরা স্থলবন্দর’ যেভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক শর্ত ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার যে বেড়াজাল তৈরি হয়েছে, তার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
দৈনিক পত্রদুতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েনের জেরে ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সাথে সুতা, তৈরি পোশাক, তুলা, আসবাবপত্র ও পাটজাত পণ্যের মতো অতিপ্রয়োজনীয় ও লাভজনক খাতের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এখন তলানিতে। বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই এই নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের কড়াকড়ি ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
তবে ভোমরা স্থলবন্দরের এই সংকটের পেছনে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনই একমাত্র কারণ নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের ওজন স্কেলে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস এবং প্রকাশ্য দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেখানে এমনিতেই বাণিজ্য কমে গেছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নামাটা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর শামিল। এই অনিয়ম উচ্ছেদ করা না গেলে বন্দরের ওপর ব্যবসায়ীদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য স্পষ্টÑএই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শুধু সাতক্ষীরা অঞ্চল নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমরা দুটি জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিচ্ছিÑ ১. দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবিলম্বে ফলপ্রসূ আলোচনা শুরু করতে হবে। বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আরোপিত বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করার বিষয়ে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি। ২. ভোমরা স্থলবন্দরের ওজন স্কেলের কারসাজি বন্ধ করা, মিথ্যা ঘোষণা রোধ এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্দর পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সৎ ব্যবসায়ীরা টিকতে পারবেন না।
রেকর্ড রেমিট্যান্সের প্রবাহ যেমন সাময়িকভাবে আমাদের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে, ঠিক তেমনি টেকসই অর্থনীতির ভিত গড়তে স্থলবন্দরগুলোর বাণিজ্য সচল রাখা অপরিহার্য। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভোমরা স্থলবন্দরের এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।






