মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রসঙ্গ: শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং ভোমরা স্থলবন্দরের সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ
প্রসঙ্গ: শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং ভোমরা স্থলবন্দরের সংকট

একটি দেশের অর্থনীতির ফুসফুস হলো তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে স্থলবন্দরগুলোর মাধ্যমে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিচালিত হয়, তা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎপাদনকারী কেন্দ্র ‘ভোমরা স্থলবন্দর’ যেভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক শর্ত ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার যে বেড়াজাল তৈরি হয়েছে, তার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
দৈনিক পত্রদুতের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েনের জেরে ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সাথে সুতা, তৈরি পোশাক, তুলা, আসবাবপত্র ও পাটজাত পণ্যের মতো অতিপ্রয়োজনীয় ও লাভজনক খাতের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এখন তলানিতে। বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই এই নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের কড়াকড়ি ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
তবে ভোমরা স্থলবন্দরের এই সংকটের পেছনে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক টানাপোড়েনই একমাত্র কারণ নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের ওজন স্কেলে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য খালাস এবং প্রকাশ্য দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যেখানে এমনিতেই বাণিজ্য কমে গেছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নামাটা ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর শামিল। এই অনিয়ম উচ্ছেদ করা না গেলে বন্দরের ওপর ব্যবসায়ীদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
ব্যবসায়ী নেতাদের বক্তব্য স্পষ্টÑএই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শুধু সাতক্ষীরা অঞ্চল নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমরা দুটি জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিচ্ছিÑ ১. দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবিলম্বে ফলপ্রসূ আলোচনা শুরু করতে হবে। বাণিজ্য সহজীকরণ এবং আরোপিত বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করার বিষয়ে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি। ২. ভোমরা স্থলবন্দরের ওজন স্কেলের কারসাজি বন্ধ করা, মিথ্যা ঘোষণা রোধ এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্দর পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে সৎ ব্যবসায়ীরা টিকতে পারবেন না।
রেকর্ড রেমিট্যান্সের প্রবাহ যেমন সাময়িকভাবে আমাদের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে, ঠিক তেমনি টেকসই অর্থনীতির ভিত গড়তে স্থলবন্দরগুলোর বাণিজ্য সচল রাখা অপরিহার্য। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভোমরা স্থলবন্দরের এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

Ads small one

সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: নদী-খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘস্থায়ী ও অভিশাপতুল্য জলাবদ্ধতা সংকটের মূল উৎস নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়া। কপোতাক্ষ, ইছামতি ও বেতনার মতো প্রবাহমান নদীসহ অসংখ্য সরকারি খাল বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী দখলদারদের পেটে চলে গেছে। নদী ও খালের জমি গিলে খেয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা, শিল্পকারখানা, মাছের ঘের এবং পাকা বসতবাড়ি। এর মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে—সামান্য বৃষ্টিতেই জলজটে অচল হয়ে পড়ে জীবনযাত্রা, দেখা দেয় তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বাস্তবতায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত এবং ৫০ দিনের বিশেষ ‘ক্র্যাশ’ অভিযানের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদী দখল করে গড়ে ওঠা ইটভাটা কিংবা বিনেরপোতায় বেতনা নদীর সীমানার ভেতরে নির্মাণাধীন বিনোদন ও প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো স্পষ্ট করে দেয়, কী পরিমাণ বেপরোয়াভাবে নদীকে লুণ্ঠন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি খালের অস্তিত্বই মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম। সাতক্ষীরাবাসীর বহুদিনের দাবি ছিলÑপানির প্রবাহ সুগম করতে এই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো অতীতেও এমন বহু তালিকা প্রণয়ন ও অভিযানের উদ্যোগ আমরা দেখেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ছত্রছায়া, আইনি জটিলতা কিংবা অদৃশ্য প্রভাবে সেই অভিযানগুলো ছোটখাটো দখলদারদের ওপর দিয়ে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে; ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে প্রভাবশালী শ্রেণি। ফলে এবার জেলা প্রশাসনের এই অভিযান যেন আর ১০টি ‘লোকদেখানো’ উদ্যোগের মতো মুখ থুবড়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আইনের প্রয়োগ হতে হবে সার্বজনীন ও বৈষম্যহীন।
অভিযানের পাশাপাশি কিছু বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে। বিশেষ করে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং খাসের জমিতে বাস করা প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। ভূমিহীনদের অজুহাতে যেন কোনো শিল্পপতি বা প্রভাবশালী পার না পায়, আবার অভিযান চালাতে গিয়ে যেন কোনো হতদরিদ্র পরিবারকে আশ্রয়হীন করা না হয়Ñএই ভারসাম্যের প্রতি সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন।
নদী ও খাল বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে। তাই নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্র্যাশ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কপোতাক্ষ, বেতনা ও ইছামতিকে মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে শুধু সাময়িক উচ্ছেদ নয়, উচ্ছেদকৃত জমি যাতে পুনরায় হাতছাড়া না হয়, তার জন্য স্থায়ী তদারকি ও সীমানা নির্ধারণ প্রয়োজন। সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন; জেলা প্রশাসন এবার তাদের প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ় ও আপসহীন থাকবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
পরাজিত হলেও প্রতিশ্রুতির ১২ অঙ্গীকার পূরণে কাজ করার ঘোষণা বিএনপি প্রার্থীর

শ্যামনগর প্রতিনিধি: নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে দেওয়া প্রাক্-নির্বাচনী ১২টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান। সোমবার বেলা ১১টায় শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘উপকূলীয় জনপদ, হতে হবে নিরাপদ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এই কথা বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, সরকারের এক প্রভাবশালী আমলার হস্তক্ষেপের কারণেই নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে তাঁকে আইনসভায় যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। ভোটাররা প্রতিপক্ষকে তাঁর চেয়ে যোগ্য মনে করেছেন বলেই জয়ী হয়েছেন—এমন মন্তব্য করলেও তিনি জানান, এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার স্থবিরতা কাটাতে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ চলছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশ, ফিশ প্রসেসিং সেন্টার ও পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মধু শিল্পের সম্প্রসারণ এবং এলাকার একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রেসক্লাবের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক সামিউল মনিরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সোলায়মান কবির, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আশেক-ই এলাহী মুন্না ও ডাকসুর সাবেক নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ।

 

সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৬ অপরাহ্ণ
সাপ্তাহিক ‘বেগম’: বাঙালি নারীর কণ্ঠস্বর ও জাগরণের প্রতীক

সাকিবুর রহমান বাবলা
২০ জুলাই বাংলা সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও নারী জাগরণের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে কলকাতার ওয়েলেসলি স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’। দেশভাগের প্রাক্কালে যখন নারীদের শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা ও জনজীবনে অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন ‘সওগাত’-এর সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা নারী সমাজের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। তৎকালীন প্রতিকূল সামাজিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার আলোয় আনার লক্ষ্যেই ছিল। পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছবি। মাত্র ৫০০ কপি মুদ্রিত চার আনা মূল্যের সেই সংখ্যাই পরবর্তীকালে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করে।
পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি ও সমাজনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি প্রথম চার মাস সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন বিএ শ্রেণির ছাত্রী নূরজাহান বেগম শুরু থেকেই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের একদল তরুণী শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ‘বেগম’-এর প্রাথমিক কর্মপরিসর। পরবর্তীকালে নূরজাহান বেগম সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় ছয় দশক ধরে পত্রিকাটিকে সফলভাবে পরিচালনা করেন। সম্পাদকীয় বিভাগে ফজলে লোহানীরও গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে ‘বেগম’-এর কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সে সময় নারীদের ছবি প্রকাশ করা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রক্ষণশীল সমাজে অনেক নারী ছদ্মনামে লিখতেন, কিন্তু ‘বেগম’ তাঁদের নিজস্ব নাম ও ছবিসহ লেখা প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করত। এটি ছিল তৎকালীন সময়ে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে অসংখ্য নারী প্রথমবারের মতো জনপরিসরে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ পান।
নারী সাংবাদিকতার বিকাশে ‘বেগম’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাগুলোও পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং নারীদের লেখালেখির পরিসর সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। এটি শুধু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রই তৈরি করেনি, বরং নারী সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাহিত্যিক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও গড়ে উঠেছিল। সুফিয়া কামাল, শামসুন্নাহার মাহমুদ, জাহানারা আরজু, নীলিমা ইব্রাহিম, রাজিয়া খাতুন, প্রতিভা গাঙ্গুলী, সেলিনা পান্নি এবং পরবর্তীকালে সেলিনা হোসেনসহ বহু বিশিষ্ট লেখকের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে ‘বেগম’-এর নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা ছিল না, বরং তা তৎকালীন পাঠিকাদের কাছে একটি ‘পরিবার’-এর মতো হয়ে উঠেছিল। ডাকযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা পৌঁছানো এবং পাঠিকাদের চিঠি ও লেখা প্রকাশের মাধ্যমে এটি শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগসূত্র গড়ে তোলে, যা ‘বেগম-পাঠিকা সভা’ নামেও পরিচিতি পায়। এই সংযোগ নারীদের একাকীত্ব দূর করে তাঁদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি পরিবার ও জীবনযাপনভিত্তিক নানা বিষয়ও নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম ক্লাব’। শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন এর সভাপতি, নূরজাহান বেগম সেক্রেটারি এবং সুফিয়া কামাল অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্লাব হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ষাট ও সত্তরের দশকে ‘বেগম’ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে। নারী শিক্ষা, আইনি অধিকার, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার দূরীকরণ ও আত্মনির্ভরতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিত স্থান পেত এর পাতায়।
বর্তমানে ‘বেগম’ মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর প্রচ্ছদমূল্য ৫০ টাকা। নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ফ্লোরা নাসরিন খান পত্রিকাটির দায়িত্ব পালন করছেন। ডিজিটাল যুগে মুদ্রিত পত্রিকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘বেগম’ তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। একই সঙ্গে, সাত দশকের সমৃদ্ধ আর্কাইভ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি, যা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। বাংলা সাংবাদিকতা ও নারী জাগরণের ইতিহাসে ‘বেগম’ কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি নারী আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক প্রতীক।