বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা, লোকজন সংকটে বাড়ছে লিগ্যাল এইডের চাপ!
নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সেবা কার্যক্রমে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের আওতাভুক্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতে মামলা দায়েরের আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার (মেডিয়েশন) উদ্যোগ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা চালু হওয়ার পর থেকে এ চাপ আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, অভিযোগ নিবন্ধন থেকে শুরু করে পক্ষদের নোটিশ প্রদান, শুনানি ও মধ্যস্থতার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি আবেদন প্রক্রিয়াজাত করতেই কয়েক দিন সময় ব্যয় হচ্ছে। ফলে দ্রুত প্রতিকার প্রত্যাশী সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসন শাখা থেকে ৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা বিজ্ঞপ্তি (নং-৩০১) অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, বিশেষ করে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩; পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩; যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর নির্দিষ্ট ধারা; দ-বিধির কয়েকটি ধারা; স্পেসিফিক রিলিফ অ্যাক্ট, ১৮৭৭ এবং নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারাসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের বিরোধে মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
লিগ্যাল এইড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ সেবার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সেবার আওতা সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধি না পাওয়ায় অনেক জেলা অফিসে চাপ বেড়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা যায়, দুই লিগ্যাল এইড অফিসারকে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আবেদন গ্রহণ, পরামর্শ প্রদান, মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনা, বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়াকরণ, প্যানেল আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির প্রশাসনিক কার্যক্রমও পরিচালনা করতে হয়। ফলে প্রতিদিনের সেবা কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে কয়েকজন সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেন, অনেক সময় প্রতিপক্ষকে হাজির করা, শুনানির তারিখ নির্ধারণ এবং মধ্যস্থতার জন্য উভয় পক্ষকে একত্রিত করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা নিয়ে আসা মানুষদের হতাশ হতে হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেও সেবাপ্রার্থীদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে আদালতের মামলার সংখ্যা কমবে এবং সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম সময় ও ব্যয়ে প্রতিকার পাবে বলে তাঁরা মনে করেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমকে কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হলে জেলা পর্যায়ের লিগ্যাল এইড অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সেবার মান ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে দ্রুত ও সহজলভ্য বিচারসেবা পৌঁছে দেওয়া। তাই সেবার পরিধি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামগত সক্ষমতা নিশ্চিত না করা হলে কাক্সিক্ষত সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।






