বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস: আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, প্রকৌশলের বিস্ময় এবং নগর সভ্যতার নতুন দিগন্ত
সাকিবুর রহমান বাবলা
৩ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস। আধুনিক স্থাপত্য, প্রকৌশল, নগর পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অসাধারণ সাফল্যকে সম্মান জানাতেই এই দিনটি উদযাপিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আকাশরেখা আজ যেসব সুউচ্চ ভবনের মাধ্যমে নতুন পরিচয় লাভ করেছে, সেসব স্থাপনার পেছনে রয়েছে মানুষের সৃজনশীলতা, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাস। এই দিবস সেই অর্জনগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩ সেপ্টেম্বর তারিখটি বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে স্থাপত্য ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৮৫৬ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন মার্কিন স্থপতি লুই এইচ. সুলিভান, যিনি আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকার পথিকৃৎ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তার বিখ্যাত নীতি ‘কাজের প্রয়োজনই নকশার রূপ নির্ধারণ করবে’Ñআজও আধুনিক স্থাপত্যচর্চার অন্যতম মৌলিক দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। বহুতল ভবনের নকশা ও কাঠামোগত পরিকল্পনায় তার অবদান এতটাই গভীর যে তাকে ‘গগনচুম্বী অট্টালিকার জনক’ নামে অভিহিত করা হয়।
গগনচুম্বী অট্টালিকা বলতে সাধারণত এমন ভবনকে বোঝায়, যা আশপাশের স্থাপনাগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মিত। বর্তমানে কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস অ্যান্ড আরবান হ্যাবিট্যাট-এর মানদ- অনুযায়ী ১৫০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতার ভবনকে গগনচুম্বী অট্টালিকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধিকাংশ আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপারে ৪০টিরও বেশি তলা থাকে এবং এগুলো শক্তিশালী ইস্পাত কাঠামো, উন্নত কংক্রিট প্রযুক্তি ও উচ্চগতির এলিভেটরের ওপর নির্ভর করে নির্মিত হয়।
আজকের পৃথিবীতে গগনচুম্বী অট্টালিকা শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নগর উন্নয়নের পরিচায়ক। বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফা, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে অবস্থিত, ৮২৮ মিটার উচ্চতা নিয়ে আধুনিক প্রকৌশলের এক অনন্য নিদর্শন। এর পরেই রয়েছে মালয়েশিয়ার মেরদেকা ১১৮, চীনের সাংহাই টাওয়ার, সৌদি আরবের মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার, এবং চীনের পিং অ্যান ফাইন্যান্স সেন্টার। এসব ভবন শুধু উচ্চতার রেকর্ডই গড়েনি, বরং শক্তি সাশ্রয়, বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, ভূমিকম্প প্রতিরোধ এবং টেকসই নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন মানদ- স্থাপন করেছে।
ঢাকার শীর্ষস্থানীয় বহুতল ভবনগুলোর মধ্যে শান্তা পিনাকলের মূল স্থপতি এহসান খান (ইকে আর্কিটেক্টস) এবং প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে মাইনহার্ট সিঙ্গাপুর। মতিঝিলের সিটি সেন্টারের নকশায় যৌথভাবে স্থপতি টিআইএম নুরুন্নবী চৌধুরী ও বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার (সাইট ফোর্স ও আরবান কন্টেক্সট)। তেজগাঁওয়ের ইনস্টার ট্রেড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ভবনের প্রধান স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ (ভলিউমজিরো)। আর গুলশানের হিলটন ঢাকা ভবনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য নকশায় এইচবি ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিয়েছে ইইসি লিনকন স্কট।
গগনচুম্বী অট্টালিকার ইতিহাসে দুটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমটি হলো ইস্পাতের কঙ্কাল কাঠামো। প্রচলিত ইট বা পাথরের ভারী দেয়ালের পরিবর্তে ইস্পাতের শক্তিশালী ফ্রেম ব্যবহারের ফলে ভবনের উচ্চতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো নিরাপদ যাত্রীবাহী এলিভেটর। দ্রুত ও নিরাপদ ওঠানামার সুবিধা না থাকলে শততলা ভবনের ধারণা কখনো বাস্তবে রূপ নিত না। এই দুটি প্রযুক্তির সমন্বয়ই আধুনিক নগর সভ্যতার আকাশছোঁয়া রূপ গঠনে সহায়ক হয়েছে।
আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খানের আবিষ্কৃত ‘টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ এক বৈপ্লবিক ভিত্তি তৈরি করে, যা ছাড়া উইলিস টাওয়ার বা বুর্জ খলিফার মতো বহুতল ভবন তৈরি অসম্ভব ছিল। পরবর্তীতে আমেরিকান কাঠামো প্রকৌশলী উইলিয়াম এফ. বেকার এই টিউবুলার পদ্ধতিকে আরও উন্নত করে ‘বাট্রেসড কোর’ সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে বুর্জ খলিফার মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ও দৃষ্টিনন্দিত গগনচুম্বী ভবনগুলোর নেপথ্যে রয়েছেন আদ্রিয়ান স্মিথ, নরম্যান ফস্টার, মার্শাল স্ট্র্যাবালা, সিজার পেলি এবং জাহা হাদিদের মতো প্রখ্যাত স্থপতিরাÑযাঁরা বুর্জ খলিফা, দ্য ঘেরকিন, পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার ও সাংহাই টাওয়ারের মতো আইকনিক স্থাপত্যের নকশা করেছেন। পাশাপাশি এসওএম, কেপিএফ এবং জেন্সলার-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মগুলো যৌথ স্থাপত্য ও প্রকৌশলগত দক্ষতার মাধ্যমে ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পিং অ্যান ফাইন্যান্স সেন্টার ও পরিবেশবান্ধব সাংহাই টাওয়ারসহ বিশ্বের সর্বোচ্চ ১০০টি ভবনের বেশিরভাগের নির্মাণ ও কাঠামোগত বাস্তব রূপদান সম্পন্ন করেছে।
বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস মূলত মানব মেধা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থাপত্য এবং প্রকৌশলের সম্মিলিত সাফল্যকে উদযাপনের দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সীমাবদ্ধ নয়; সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একসময় অসম্ভব মনে হওয়া স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে পারে। আকাশ ছুঁয়ে থাকা এসব স্থাপনা কেবল কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের সমষ্টি নয়; এগুলো মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক।






