সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
বিশ্ব চকোলেট দিবস: ভালোবাসা, উপহার ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির যাত্রা

সাকিবুর রহমান বাবলা

৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব চকোলেট দিবস। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, এর দীর্ঘ ইতিহাস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদানকে স্মরণ করতেই দিনটি উদযাপিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১৫৫০ সালের ৭ জুলাই ইউরোপে চকোলেটের বিস্তৃত পরিচিতির সূচনা হয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই বিশ্ব চকোলেট দিবস পালিত হয়।

চকোলেটের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। মধ্য আমেরিকার মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকো বীজ থেকে তৈরি পানীয়কে মূল্যবান সম্পদ ও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড ভোগের দিক থেকে শীর্ষে। উন্নত উৎপাদন ও ঐতিহ্যের কারণে সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম বিশেষভাবে সমাদৃত। সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়াম চকোলেটকে তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অন্যতম “জাতীয় প্রতীক” বা গৌরব হিসেবে গণ্য করে।

বিশ্বের বিলাসবহুল ও উচ্চমূল্যের চকোলেট ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরের টো’আক চকোলেট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিরল ‘ন্যাসিওনাল’ কোকো বীজ দিয়ে তৈরি এই পণ্যটি বিশ্বের অন্যতম দামি ও অভিজাত চকোলেট হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব নিপশিল্ট-এর তৈরি ‘লা মাদেলিন ও ট্রাফল’ বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রাফল চকোলেট হিসেবে খ্যাত। ইতালির আমেদেই ব্র্যান্ডের ‘আমেদেই পোর্সেলানা’ ডার্ক চকোলেট বিরল সাদা কোকো বীজ থেকে প্রস্তুত হওয়ায় এটি অত্যন্ত মূল্যবান ও সমাদৃত। সুইজারল্যান্ডের টয়শার ও লিন্ডট দীর্ঘ ঐতিহ্য, উৎকৃষ্ট মান এবং প্রিমিয়াম উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।

 

একইভাবে বেলজিয়ামের গোদাইভা ও গাইলিয়ান তাদের আভিজাত্য, নান্দনিক উপস্থাপন এবং রাজকীয় স্বাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ফেরেরো রোশে, ক্যাডবেরি ডেইরি মিল্ক, কিন্ডার, হার্শেজ, টোব্লেরোন ও লিন্ডট-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো আজ বিশ্বজুড়ে উৎসব, উদ্যাপন, উপহার প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে আশির দশকে ‘মিমি’ চকোলেটের মাধ্যমে এ দেশে চকোলেট সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের সমন্বয়ে বাজার বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও উপহার সংস্কৃতির প্রসারে জন্মদিন, বিবাহোত্তর সংবর্ধনা, করপোরেট অনুষ্ঠান ও ভালোবাসা দিবসে চকোলেটের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে ‘ফেয়ার ট্রেড’ সার্টিফিকেশন কোকো চাষিদের ন্যায্য মূল্য ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে।

শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ দাঁতের ক্ষয় ও স্থূলতার কারণ হতে পারে। তবে ডার্ক চকোলেটে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষের সুরক্ষা, হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতি, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। পরিমিতি বজায় রেখে সচেতন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই এটি গ্রহণ করা শ্রেয়।

বিশ্ব চকোলেট দিবসে আমরা কোকো চাষি, শ্রমিক ও উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের অবদানকে স্মরণ করি। একটি চকোলেট বারের পেছনে থাকে দীর্ঘ শ্রম ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল শৃঙ্খল। এই দিবস কেবল স্বাদের উদযাপন নয়; বরং মানুষের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য স্বীকৃতি।

Ads small one

স্বাস্থ্যসুরক্ষা কি নাগরিকের অধিকার?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২১ পূর্বাহ্ণ
স্বাস্থ্যসুরক্ষা কি নাগরিকের অধিকার?

হক মো. ইমদাদুল, জাপান

একজন মানুষ অসুস্থ হলে শুধু তাঁর শরীরটাই অসুস্থ হয় না; অসুস্থ হয়ে পড়ে তাঁর সংসারের অর্থনীতি, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং অনেক সময় পুরো পরিবারের নিরাপত্তাবোধ। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, ঋণ করতে হয়, জমি বা সম্পদ বিক্রি করতে হয়, এমনকি সন্তানের পড়াশোনা বা পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও বন্ধ হয়ে যায়। অথচ অসুস্থ হওয়া কোনো মানুষের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নয়। তাহলে অসুস্থতার আর্থিক ঝুঁকির পুরো দায় কি একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের ওপরই বর্তাবে?

এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত হলেও এর উত্তর সব সময় ব্যক্তির হাতে থাকে না। কারণ স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের শ্রমশক্তি, উৎপাদনশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একজন কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু তাঁর পরিবার নয়, তাঁর কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই জায়গাতেই জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাপান এক দিনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ১৯২২ সালে Health Insurance Lwa প্রণয়ন, ১৯২৭ সালে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৯৩৮ সালে ‘কোকুমিন কেনকো হোকেন’Ñব্যবস্থার সূচনা এবং পরবর্তী কয়েক দশকের সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে এগিয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও প্রায় ৩ কোটি মানুষÑতৎকালীন জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশÑস্বাস্থ্যবিমার আওতার বাইরে ছিল। ১৯৫৮ সালে National Health Insurance Lwa ব্যাপকভাবে সংশোধন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের এপ্রিল থেকে জাপানের সব পৌরসভায় ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘কোকুমিন কাইহোকেন’, অর্থাৎ সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমাÑব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজ প্রশ্নটি তাই আরও প্রাসঙ্গিকÑজাপান যদি কয়েক দশক আগে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, বাংলাদেশ কেন এখনো এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারছে না, যেখানে অসুস্থতা মানেই একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় নয়?

জাপানের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑদেশটি স্বাস্থ্যকে কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি; বরং ধীরে ধীরে এটিকে সামাজিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। জাপানের বর্তমান স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো মূলত দুটি বড় ধারার ওপর গড়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে Social Insurance.

কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমা-শাকাই হোকেন), অন্যদিকে রয়েছে ঘধঃরড়হধষ ঐবধষঃয ওহংঁৎধহপব-কোকুমিন কেনকো হোকেন)। যারা অন্য কোনো সরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় পড়েন না, তাদের সাধারণত ঘধঃরড়হধষ ঐবধষঃয ওহংঁৎধহপব-এর আওতায় আনা হয়। এই ব্যবস্থার ফলে চিকিৎসার পুরো ব্যয় সাধারণত রোগীকে একা বহন করতে হয় না। বয়স ও নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী রোগীকে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ নিজে বহন করতে হয়Ñসাধারণভাবে ৭০ বছরের নিচে ৩০ শতাংশ, ৭০ থেকে ৭৪ বছর বয়সে ২০ শতাংশ এবং ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ১০ শতাংশ। অবশ্য আয় ও অন্যান্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যতিক্রম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ঐরময-ঈড়ংঃ গবফরপধষ ঊীঢ়বহংব ঝুংঃবস ‘কোগাকু রিয়োইয়োহি সেইদো’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্তে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে গেলে তাঁর নিজের বহন করতে হওয়া অর্থের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এই কাঠামোর পেছনের দর্শনটি খুব গুরুত্বপূর্ণÑএকটি গুরুতর অসুস্থতা যেন একজন মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, পরিবারের সম্পদ কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে না দেয়। এখানে চিকিৎসা পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত না হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো সরাসরি মানুষের নিজের পকেট থেকে আসে। ফলে অসুস্থতার সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়ও যুক্ত হয়ে যায়। একজন দরিদ্র বা নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে রোগ নির্ণয়ের পর প্রথম প্রশ্ন অনেক সময় হয়Ñ‘চিকিৎসা কোথায় পাব?’ নয়, বরং ‘টাকা কোথা থেকে আসবে?’
চিকিৎসার খরচ দৃশ্যমান; কিন্তু অসুস্থতার কারণে হারিয়ে যাওয়া আয় অনেক সময় তার চেয়েও বড় ক্ষতি। পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষ দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারলে একদিকে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে আয় কমে যায়Ñএকসঙ্গে তৈরি হয় দ্বিমুখী আর্থিক চাপ।
জাপানের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। স্বাস্থ্যবিমার আওতাভুক্ত কোনো কর্মী কর্মস্থলের বাইরে অসুস্থতা বা আঘাতের কারণে কাজ করতে অক্ষম হলে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে অসুস্থতাজনিত ভাতা পেতে পারেন। এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকা আবশ্যক নয়। সাধারণত প্রথম তিন দিন অপেক্ষাকাল এবং চতুর্থ দিন থেকে নির্ধারিত শর্তে ভাতা দেওয়া হয়। এর পরিমাণ আগের ১২ মাসের গড় সামাজিক বিমার হিসাবের জন্য নির্ধারিত মাসিক পারিশ্রমিক-এর ভিত্তিতে দৈনিক প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হতে পারে এবং একই অসুস্থতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ বছর ৬ মাস পর্যন্ত পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাপানের ঐবধষঃয ওহংঁৎধহপব এর হিহোকেনশাÑবিমাকৃত ব্যক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত যোগ্য বিদেশি কর্মীরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই সুবিধা পেতে পারেন। অর্থাৎ, এটি শুধু জাপানি নাগরিকদের জন্য নয়; মূল বিষয় হলো স্বাস্থ্যবিমার আওতাভুক্ত থাকা এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করা।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন শ্রমিক, কর্মচারী কিংবা নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া আয়ের সুরক্ষা কতটা রয়েছে? স্বাস্থ্যসুরক্ষা যদি শুধু চিকিৎসার বিল কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু অসুস্থতার কারণে একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা কতটা পূর্ণাঙ্গ? কারণ স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রকৃত অর্থ শুধু রোগের চিকিৎসা নয়; অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার যেন অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে না পড়ে, সেই নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। শিশুমৃত্যু কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার ঘটেছে এবং ১৯৯৮ সাল থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষাÑএই দুটি এক বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের টহরাবৎংধষ ঐবধষঃয ঈড়াবৎধমব বা টঐঈ ঝবৎারপব ঈড়াবৎধমব ওহফবী মাত্র ৫৪/১০০। একই সময়ে ৪১.৭ শতাংশ মানুষÑপ্রায় ৭ কোটিÑনিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় করার কারণে আর্থিক সংকট -এর মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ডঐঙ এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২৬-২০৩৫ সময়ের জন্য একটি টঐঈ জড়ধফসধঢ় তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের বাস্তব জীবন। ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, ছেলে এখনো বেকার। পরিবারের সঞ্চয় দিয়ে প্রথম কয়েক মাস চিকিৎসা চলল। এরপর সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল। শুরু হলো ধারদেনা। তারপর হয়তো জমি বিক্রি, আত্মীয়ের সাহায্য কিংবা উচ্চ সুদের ঋণ। চিকিৎসা চললেও পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে কয়েক বছর পিছিয়ে গেল। এই ধরনের ঘটনা শুধু কল্পিত কোনো দৃশ্য নয়; বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক চাপের বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। আর এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশে হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংক্রামক রোগ এখন মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এসব রোগের অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন তৈরি করে।
বিশ্বব্যাংকের ডড়ৎষফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহফরপধঃড়ৎং-এ ডঐঙ এষড়নধষ ঐবধষঃয ঊীঢ়বহফরঃঁৎব উধঃধনধংব-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট ঈঁৎৎবহঃ ঐবধষঃয ঊীঢ়বহফরঃঁৎব-এর প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেটের ব্যয় থেকে এসেছে। এখানে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরিÑএর অর্থ এই নয় যে মানুষ তার আয়ের ৭৯ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করেছে। অর্থ হলো, দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ সরাসরি মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে এসেছে। এটি স্বাস্থ্যসুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সমস্যাটি তাই শুধু ‘হাসপাতাল কম’Ñএখানে থেমে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও মান, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার প্রাপ্যতা, বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা, স্বাস্থ্যবিমার সীমিত বিস্তার এবং সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতা।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি এবং অনিয়মিত আয়ের মানুষের বড় একটি অংশ কোনো প্রচলিত কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমার কাঠামোর মধ্যে নেই। ফলে অসুস্থতা শুধু চিকিৎসার খরচ তৈরি করে না; অনেক সময় উপার্জনের পথও বন্ধ করে দেয়।
এই জায়গায় জাপানের কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো সরাসরি বসিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শ্রমবাজার, আয় কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। কিন্তু কঠিন মানেই অসম্ভব নয়। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে এমন একটি স্বাস্থ্য-ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিক, কৃষক, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, নি¤œ-আয়ের পরিবার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে একটি কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো নয়; বরং স্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষার একটি মৌলিক অংশ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। টহরাবৎংধষ ঐবধষঃয ঈড়াবৎধমব-এর অর্থ শুধু মানুষের জন্য হাসপাতালের দরজা খোলা রাখা নয়। প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় যেন মানুষকে আর্থিক সংকটে না ফেলেÑএটিও টঐঈ-এর মৌলিক অংশ।
বাংলাদেশের বর্তমান টঐঈ জড়ধফসধঢ় ২০২৬-২০৩৫-এর আলোচনাতেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছেÑসবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, ধীরে ধীরে সুরক্ষা সম্প্রসারণ, একটি সমন্বিত অর্থায়ন কাঠামো, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার একটি নির্ধারিত প্যাকেজ, জবাবদিহি ও সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এখানে জাপানের আরেকটি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণÑস্বাস্থ্যসুরক্ষাকে শুধু চিকিৎসার ব্যয় কমানোর নীতি হিসেবে দেখলে হবে না; অসুস্থতার কারণে মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার কথাও ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের পক্ষে হয়তো একবারে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু ধাপে ধাপে এগোনো সম্ভব। সীমিত সম্পদ প্রথমে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও উচ্চঝুঁকির স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করা যেতে পারে। যেসব সরকারি কর্মসূচি ইতিমধ্যে ভালো ফল দিচ্ছে, সেগুলো আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা যেতে পারে। শ্রমিক, কৃষক, স্বনিযুক্ত ও নি¤œ-আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা বা সমন্বিত ঝুঁকি-পুল তৈরি করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্যকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, করব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা নীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ অসুস্থতা একজন মানুষের শরীরে শুরু হলেও তার প্রভাব পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন জাপানের ব্যবস্থা হুবহু অনুকরণ করা নয়; প্রয়োজন জাপানের মতো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং স্বাস্থ্যকে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন স্বাস্থ্য খাতকে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক নিয়োগ কিংবা ওষুধ সরবরাহের হিসাব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যকে দেখতে হবে জাতীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে।
জাপান যখন ১৯৬১ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ প্রতিষ্ঠার দিকে পৌঁছায়, তখন দেশটি আজকের সমৃদ্ধ জাপান ছিল না। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মধ্য দিয়েই তাকে এগোতে হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলÑঅর্থের অভাবে একজন মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না।
বাংলাদেশের সামনেও এখন সেই ধরনের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটি শুধু ‘জাপানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাংলাদেশে কপি করা যাবে কি না’Ñতা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা কবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করব, যেখানে অসুস্থ হওয়া মানেই একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় নয়? একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা বড় অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হয়Ñএকজন শ্রমিক অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে ঋণ করতে হয় কি না; একজন কর্মচারী দীর্ঘদিন কাজে যেতে না পারলে তার পরিবার আয়হীন হয়ে পড়ে কি না; একজন প্রবীণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু খরচ করতে হয় কি না।
স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন অসুস্থ মানুষ অন্তত এই নিশ্চয়তাটি অনুভব করতে পারেনÑ‘আমি চিকিৎসা পাব, আর আমার অসুস্থতার কারণে আমার পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়বে না।’
অসুস্থতা হয়তো একজন মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য। কিন্তু সেই অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার যদি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যায়, সন্তানের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় কিংবা বহু বছরের সঞ্চয় এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়Ñতখন সেটি আর শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই শুধু আরও হাসপাতাল নয়; প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তার দর্শন, যেখানে চিকিৎসার অধিকার, অসুস্থতার সময় আর্থিক সুরক্ষা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাÑএই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা হবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা কোনো অলৌকিক ব্যবস্থা নয়। এটি তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, ধারাবাহিক নীতি, সুশাসন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল অর্থায়নের মাধ্যমে।
জাপান তার নিজস্ব ইতিহাস ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সেই পথ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পথ অবশ্যই বাংলাদেশেরই হতে হবে। কিন্তু পথ তৈরির আগে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজনÑস্বাস্থ্য কি কেবল যার টাকা আছে তার অধিকার, নাকি এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তার অংশ? কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু চিকিৎসা পাওয়া বা না-পাওয়ার নয়। প্রশ্ন হলোÑঅসুস্থ হওয়ার পরও একজন মানুষ কতটা নিরাপদে বাঁচতে পারেন। আর সেই নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত একটি উন্নত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার মানবিকতারও সবচেয়ে বড় পরিচয়। হক মো. ইমদাদুল, লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষক

 

সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

মো. মামুন হাসান

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে এই বন বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ। তবে সুন্দরবনের আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে, যা এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। বন ও মানুষের সম্পর্ক এখানে সব সময় সহাবস্থানের নয়। জীবিকার প্রয়োজনে বনে যাওয়া মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কখনো কখনো কেড়ে নেয় একটি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে। আর সেই মৃত্যুর পর যে নারীরা স্বামীহারা হয়ে সন্তান ও পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামেন, স্থানীয় সমাজে তাঁদের পরিচয় হয় বাঘবিধবা হিসেবে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের জীবন কেবল স্বামী হারানোর বেদনায় থেমে থাকে না। শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবজ্ঞা, কুসংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও গণমাধ্যমের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

সম্প্রতি নেচার গ্রুপের হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা সুন্দরবনের বাঘবিধবাদের এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক অবস্থান, কুসংস্কার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বাঘবিধবাদের জীবিকা সংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কলঙ্ক।

এই কলঙ্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস। সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণকে কখনো কখনো অতীতের পাপের শাস্তি কিংবা অলৌকিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এমন বিশ্বাসের কারণে স্বামী হারানো নারীদেরও অনেক সময় দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক আচরণ পর্যন্ত সামাজিক সন্দেহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একজন নারী স্বামী হারানোর পর যে শোক, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যান, তার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের তৈরি আরেকটি অদৃশ্য দেয়াল।

এখানেই সংকটটি আরও গভীর। একজন বনজীবী যখন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান, তখন কেবল একটি জীবনই শেষ হয় না, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে। স্বামী হারানো নারীকে একদিকে সন্তানদের দায়িত্ব নিতে হয়, অন্যদিকে জীবিকার নতুন পথ খুঁজে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁদের সামনে যে জীবন তৈরি হয়, সেটি এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন।

এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক আঘাত। গবেষণায় বাঘবিধবাদের মধ্যে গভীর শোক, বিষণ্নতা এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসের মতো মানসিক সমস্যার উপসর্গের কথা উঠে এসেছে। প্রিয়জনকে ভয়াবহভাবে হারানোর অভিজ্ঞতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আর্থিক সংকট একসঙ্গে একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এই বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকটের জন্য আলাদা কোনো কাঠামো খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল নিয়ে প্রকাশিত আরও কিছু গবেষণাতেও বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, সামাজিক কুসংস্কার ও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে তাঁদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে একই সঙ্গে গবেষণাগুলো একটি আশাব্যঞ্জক দিকও দেখিয়েছে। যথাযথ সহযোগিতা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং জীবিকার সুযোগ পেলে এসব নারী নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা শুধু নিজেদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন না, অন্য নারীদেরও স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখান।

এই জায়গাটিই আমাদের নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। বাঘবিধবাদের কেবল অসহায় মানুষ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁরা সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রয়োজন তাঁদের সেই সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এই নারীদের জন্য কী করছে। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে জরুরি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাঘ সংরক্ষণের মানবিক মূল্যও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি বন ও তার বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি সেই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রথম প্রয়োজন বাঘবিধবাদের একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, সন্তানদের অবস্থা এবং জীবিকার ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কার্যকর নীতি প্রণয়ন কঠিন। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে এ উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজকে এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। কারণ আইন বা সরকারি সহায়তা একা সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারে না।

তৃতীয়ত, বাঘবিধবাদের পুনর্বাসনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্থিক সহায়তা তাঁদের জীবিকার সংকট কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু স্বামী হারানোর গভীর মানসিক আঘাত নিরসনে প্রয়োজন কাউন্সেলিং ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, বিকল্প জীবিকা ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় পর্যায়ে ইতিমধ্যে যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বাঘবিধবাদের নিয়ে কাজ করছে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তাঁদের কার্যকর উদ্যোগগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহত্তর পরিসরে নেওয়া গেলে এই নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সুন্দরবন রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু সুন্দরবন রক্ষার অর্থ শুধু বন, নদী ও বাঘকে রক্ষা করা নয়। এই বনের সঙ্গে যাঁদের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে, তাঁদেরও রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জীবনকে করুণা নয়, অধিকার ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। বাঘবিধবা কোনো অভিশপ্ত পরিচয় নয়। এটি একটি ভয়াবহ মানবিক অভিজ্ঞতার ফল। তাঁদের প্রতি সমাজের সন্দেহ নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা। অবহেলা নয়, প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা। সাময়িক সহায়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও স্বনির্ভরতার সুযোগ।

সুন্দরবনের বাঘ বাঁচুক, বন বাঁচুক। একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হোক। প্রকৃতি সংরক্ষণ তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হবে, যখন বন্যপ্রাণী রক্ষার সঙ্গে মানুষের জীবন ও অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য জ্ঞানের আলোকবর্তিকা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৭ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য জ্ঞানের আলোকবর্তিকা

সাকিবুর রহমান বাবলা

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে উন্নয়ন, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই সমৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলোÑএখনও কোটি কোটি মানুষ পড়তে, লিখতে কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে সক্ষম নন। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগেও সাক্ষরতা মানবজাতির অন্যতম মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া নয়; বরং সাক্ষরতাকে মানবমুক্তি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ সাক্ষরতা এমন একটি ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে ব্যক্তি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। দিবসটির ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এই প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ আজকের বিশ্বে সাক্ষরতা শুধু ব্যক্তি উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই জীবনযাপন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও চ্যালেঞ্জ এখনও বিশাল। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেও প্রায় ৭৩ কোটি ৯০ লাখ যুবক-যুবতী ও প্রাপ্তবয়স্ক মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন ন্যূনতম পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ২৭ কোটি ২০ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরী বিদ্যালয়ের বাইরে ছিল। এসব পরিসংখ্যান শুধু শিক্ষা খাতের দুর্বলতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সাক্ষরতার বৈষম্য এখনও উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার বহু দেশে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় কম। অন্যদিকে নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো প্রায় শতভাগ সাক্ষরতার মাধ্যমে দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কীভাবে একটি জাতিকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তর করতে পারে। বিপরীতে নাইজার, চাদ ও মালির মতো দেশগুলো এখনও দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার সীমিত সুযোগের কারণে পিছিয়ে রয়েছে।

সাক্ষরতার প্রশ্নে লিঙ্গ বৈষম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বব্যাপী নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নারী। অনেক দেশে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত প্রবেশাধিকার মেয়েদের শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সাক্ষরতার উন্নয়নকে কেবল শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আন্দোলন হিসেবেও দেখতে হবে।

বর্তমান সময়ে সাক্ষরতার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে। একসময় সাক্ষরতা বলতে শুধু পড়া ও লেখা বোঝানো হলেও এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য সাক্ষরতা, গণমাধ্যম সাক্ষরতা এবং আর্থিক সাক্ষরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল সেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির যুগে তথ্য যাচাই, ভুয়া খবর শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারও সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু বিদ্যালয়মুখী শিক্ষা নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাক্ষরতা অর্জনের যাত্রা আশাব্যঞ্জক হলেও এখনও অনেক পথ বাকি। স্বাধীনতার পর দেশের সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত নি¤œ। ধারাবাহিক সরকারি উদ্যোগ, প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৮ থেকে ৭৯ শতাংশের মধ্যে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য, নারীদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা, চর, হাওড়, পাহাড়ি অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাবঞ্চনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ব্র্যাক, জাগো ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে ইউনেস্কো, ইউনিসেফ, গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখছে। ডিজিটাল শিক্ষা, মোবাইলভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা, অনলাইন লাইব্রেরি এবং বিকল্প শিক্ষার সুযোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যাতে কেবল শহর বা সচ্ছল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান। কারণ সাক্ষর মানুষ শুধু নিজের জীবনই বদলায় না, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও এগিয়ে নিয়ে যায়। জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিভাজন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই সময়ে সাক্ষরতা হচ্ছে সেই শক্তি, যা মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং একটি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।

সুতরাং আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিতÑকোনো মানুষ যেন জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত না থাকে। শিক্ষা ও সাক্ষরতায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটি সাক্ষর জনগোষ্ঠীই পারে বৈষম্য কমাতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য একটি আরও সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।