বিশ্ব বসতি দিবস: সবার জন্য নিরাপদ আবাসনের অঙ্গীকার
সাকিবুর রহমান বাবলা
একটি নিরাপদ ঘর শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনের ভিত্তি। অথচ আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পর্যাপ্ত আবাসনের বাইরে। এই বাস্তবতায় প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার পালিত হয় বিশ্ব বসতি দিবস। ২০২৬ সালে দিবসটি পালিত হচ্ছে ৫ অক্টোবর, এর প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’। এ বছরের বৈশ্বিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ওমানের মাস্কাটে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৪০/২০২ রেজুলেশনের মাধ্যমে অক্টোবরের প্রথম সোমবারকে বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৮৬ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে প্রথম দিবসটি পালিত হয়; প্রতিপাদ্য ছিলÑ‘আশ্রয় আমার অধিকার’। দিবসটির উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বসবাসের পরিবেশের অবস্থা পর্যালোচনা করা এবং সবার জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়ের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা।
বর্তমানে আবাসন সংকটের ব্যাপ্তি আরও গভীর। ইউএন হ্যাবিট্যাট ওয়ার্ল্ড সিটিজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসনের কোনো না কোনো ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে এক বিলিয়নের বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে বসবাস করছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক আবাসন ঘাটতি প্রায় ২৮৮ মিলিয়ন ইউনিটে পৌঁছেছে। অপর্যাপ্ত আবাসনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অনিরাপদ জমির মালিকানা, অতিরিক্ত ভিড়, মৌলিক সেবার ঘাটতি, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এই সংকটের পেছনে রয়েছে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আয়-বৈষম্য, আবাসন ও জমির উচ্চমূল্য, দারিদ্র্য, যুদ্ধ-সংঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দুর্যোগ মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত করছে। ফলে আবাসন এখন কেবল নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা, জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নগরায়ণ, গ্রাম থেকে শহরে কর্মসংস্থান ও সেবার সন্ধানে মানুষের আগমন এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি শহরাঞ্চলে আবাসনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ইউএন হ্যাবিট্যাট-এর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নগর দরিদ্র ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ এবং বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ আবাসন পরিস্থিতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভিত্তি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যেও বস্তি ও ভাসমান পরিবারের উপস্থিতি স্পষ্ট; তাই আবাসন পরিকল্পনায় শুধু বাড়ির সংখ্যা নয়, বাসস্থানের মান, নিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা ও ভাড়ার সক্ষমতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে কিছুটা হলেও সহায়ক ভূমিকা পালন করা যেতে পারে।
বিশ্ব বসতি দিবসের তাৎপর্য এখানেইÑমানুষকে শুধু একটি ছাদ দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ, সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যসম্মত, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ১১-এর লক্ষ্যও হলো শহর ও মানববসতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সংকটসহনশীল ও টেকসই করে তোলা। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের মূল্যায়ন বলছে, এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব এখনও প্রয়োজনীয় গতিতে এগোতে পারেনি।
এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব হলো সাশ্রয়ী আবাসন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ ভূমি-ব্যবস্থা, পানি ও স্যানিটেশন, পরিবহন এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামোকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা। নি¤œআয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্প, বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ইউএন হ্যাবিট্যাট, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইউএন হ্যাবিট্যাট-ও জাতীয় সরকারকে সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের নীতি ও কৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানায়।
১৯৮৯ সাল থেকে ইউএন হ্যাবিট্যাট স্ক্রোল অব অনার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে আসছে মানব বসতি ও নগরজীবনের মানোন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এটিও দেখিয়ে দেয়Ñআবাসন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলা যায়, একটি সুন্দর শহর মানেই শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো নয়; সুন্দর শহর হলো যেখানে প্রত্যেক মানুষের নিরাপদে থাকার জায়গা আছে, যেখানে বস্তি ও প্রান্তিক মানুষ উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকে না এবং যেখানে আবাসন মানুষের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত থাকে। বিশ্ব বসতি দিবস তাই কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়Ñএটি সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করার দিন।












