বিশ্ব বৃষ্টিবন দিবস: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ২২ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব বৃষ্টিবন দিবস’। এই দিনটি পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু স্থিতিশীলতার জন্য বনভূমি কতটা অপরিহার্য জানিয়ে দেয়। যদিও আয়তনের বিচারে বাংলাদেশে আমাজনের মতো বিশাল কোনো বৃষ্টিবন নেই, তবুও আমাদের দেশের পার্বত্য চিরসবুজ বন, ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, শালবন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিবসের তাৎপর্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় আজ অপরিসীম।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি আমাদের নদী, খাল, বিল, হাওড়, বাওড় ও জলাভূমিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদীর নাব্যতা সংকট, খাল এবং জলাধার ভরাট করার ফলে এই প্রাকৃতিক পানিসম্পদ সংরক্ষণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বনভূমি বৃষ্টির পানি শুষে নিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণে সহায়তা করে। তাই বন সংরক্ষণ করা মানেই হলো বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা, যা মূলত খরা ও জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
আমাদের বনাঞ্চলে হাজারো উদ্ভিদ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, কুমির কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিরল প্রজাতির বৃক্ষ ও পাখিকূল আমাদের অমূল্য জাতীয় সম্পদ। বৃক্ষকুল ও জীববৈচিত্র্যের এই ভা-ার রক্ষা করতে হলে অবৈধ বৃক্ষনিধন, বনভূমি জবরদখল এবং বন্যপ্রাণী নিধন ও পাচার রোধে প্রশাসনিক কঠোরতা জরুরি।
বিশ্ব বৃষ্টিবন দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে আমাদের আরও কৌশলী ও উদ্যোগী হতে হবে: স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণকে জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে, যা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শুধু গাছ লাগানোই নয়, গাছের পরিচর্যা ও সেগুলোর টিকে থাকা নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বয়ে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এবিষয়ে বিশেষায়িত গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়তে হবে।
দ্রুত নগরায়ণের চাপে যেন প্রাকৃতিক সবুজ এলাকা ও জলাধার হারিয়ে না যায়, সেদিকে প্রচলিত আইন ও সম্প্রসারিত আইন অনুমোদন করে কার্যকর নজরদারি করতে হবে।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে স্বাভাবিক খাল ও পুকুরের উপর ছেড়ে না দিয়ে য়ে প্রযুক্তি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে সর্বস্তরে উৎসাহিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া, পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা রক্ষায় ২০১৬ সালের নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল কাজে লাগাতে হবে এবং এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল’ গঠন করতে হবে।
প্রকৃতি আমাদের কেবল অক্সিজেনই দেয় না; খাদ্য, পানি, জীবিকা এবং দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। তাই বিশ্ব বৃষ্টিবন দিবসটি আমাদের জন্য টেকসই উন্নয়ন, নিরাপদ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ার অঙ্গীকারের দিন। বন, বৃষ্টির পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি সবুজ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।












