বৃষ্টির ছড়ায় মিশে থাকা শৈশব
তারিক ইসলাম
বৃষ্টির দিনের দুপুরে টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট শিশুদের কিচিরমিচির—এই চিরাচরিত রূপটি আমাদের গ্রামবাংলার। আর এই বর্ষার আমেজ যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে যখন সেই বহু পুরোনো ছড়াটি কানে আসে:
‘আয় বৃষ্টি ঝেপে/ধান দেবো মেপে/লেবুর পাতা করমচা/ যাহ বৃষ্টি ঝরে যা।’
এই চারটি পঙ্ক্তি কেবল একটি ছড়া নয়, বরং এটি আমাদের বাংলার শৈশবের এক জীবন্ত দলিল। করমচা, যা গ্রামবাংলার ঝোপঝাড়ের এক সাধারণ ফল, তা এই ছড়ার হাত ধরে আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে।
শৈশবে আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের কাছে করমচা মানেই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। কাঁটাভরা গাছ থেকে সতর্ক হয়ে করমচা পাড়া, তারপর কাঁচা লঙ্কা, কাসুন্দি আর নুন দিয়ে সেই টক ফলের স্বাদ নেওয়া—এ যেন এক দারুণ উৎসব। করমচার রক্তিম আভা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা। ছড়ায় উল্লেখিত ‘লেবুর পাতা আর করমচা’র মেলবন্ধন কেবল একটি শব্দের খেলা নয়, বরং এটি আমাদের গ্রামীণ জীবনধারার প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
করমচা কেবল স্বাদে অনন্য নয়, পুষ্টিগুণেও এটি অতুলনীয়। এতে বিদ্যমান প্রচুর আয়রন ও ভিটামিন সি শরীরকে সতেজ রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। হজমশক্তি বাড়াতে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্লান্তি দূর করতে করমচার ভূমিকা বৈজ্ঞানিকভাবেই স্বীকৃত। এর ঔষধি গুণের কারণেই গ্রামীণ ভেষজ চিকিৎসায় করমচার ব্যবহার অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বাংলা সাহিত্যের অলিতে-গলিতে করমচার এমন উল্লেখ হয়তো কম, কিন্তু লোকজ ঐতিহ্যে এর জায়গা দখল করে আছে আমাদের এই শিশুতোষ ছড়াটি। বর্ষার বৃষ্টিকে আহ্বান জানাতে গিয়ে করমচার উল্লেখ করাটা যেন এটাই প্রমাণ করে যে, করমচা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অতি আপন সত্তা। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা হয়তো আজ করমচার ঝোপগুলোকে চোখের আড়াল করছি, কিন্তু এই ছড়াটি যখনই মনে পড়ে, তখনই যেন আমরা মুহূর্তের জন্য ফিরে যাই সেই নস্টালজিক গ্রামবাংলার মেঠোপথে।
আজকের দিনে যখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যস্ত, তখন তাদের এই মাটির সোঁদা গন্ধমাখা ছড়া ও ফলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। করমচা কেবল একটি ফল নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক টুকরো ইতিহাস, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকা প্রয়োজন। লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি









