সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটা সময় ছিল, যখন বিদ্যুৎ না থাকাটা ছিল স্বাভাবিক। সন্ধ্যা নামলেই হারিকেন, কুপিবাতি বা হ্যাজাকের আলোয় জীবন চলত। গ্রামের মানুষ রাতের আকাশের নিচে বসে গল্প করত, শহরেও অন্ধকারকে মেনে নেওয়ার এক ধরনের অভ্যাস ছিল। কিন্তু সেই সময় আর নেই। এখন বিদ্যুৎ ছাড়া একটি মুহূর্তও যেন অচল হয়ে পড়ে পুরো জীবনযন্ত্র।
তাই আজ যখন কেউ বলেÑ“বিদ্যুৎ না পাইলে মরে যাব”Ñতখন সেটি নিছক বাড়াবাড়ি নয়, বরং এক গভীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এই বাস্তবতা আমাদের বলে, বিদ্যুৎ এখন আর শুধু একটি সুবিধা নয়; এটি আধুনিক সভ্যতার শিরা-উপশিরা। এই শিরায় রক্ত চলাচল বন্ধ হলে যেমন শরীর থেমে যায়, তেমনি বিদ্যুৎ না থাকলে থেমে যায় আধুনিক জীবন।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গত দুই দশকে বিদ্যুতায়নের বিস্তৃতি ঘটেছে অভূতপূর্ব গতিতে। গ্রাম-শহরের বৈষম্য অনেকটাই কমেছে। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফ্রিজ, সেচপাম্পÑসবকিছুই এখন সাধারণ মানুষের নাগালে। এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে জীবনমান উন্নত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে এক গভীর নির্ভরতা। এখন মানুষ শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে না; বরং বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন কল্পনাও করতে পারছে না।
একটি পরিবারে সকাল শুরু হয় মোবাইলের অ্যালার্মে, দিনের কাজ চলে ইন্টারনেট ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সাহায্যে, রাত শেষ হয় আলো ও ফ্যানের নিচে। বিদ্যুৎ চলে গেলে এই পুরো চক্র থেমে যায়। শহরে কয়েক মিনিট লোডশেডিং হলেই অস্থিরতা শুরু হয়। লিফট বন্ধ হয়ে যায়, ট্রাফিক সিগন্যাল কাজ করে না, অফিসের কাজ থেমে যায়, অনলাইন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। অন্যদিকে গ্রামে এর প্রভাব আরও তীব্র। পানির পাম্প বন্ধ হয়ে যায়, কৃষিকাজ ব্যাহত হয়, মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই দুই বাস্তবতা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়Ñবিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবন অচল। আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল লাইব্রেরি, প্রজেক্টও ভিত্তিক শিক্ষাÑসবকিছুই বিদ্যুৎনির্ভর। বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার গতি থেমে যায়।গ্রামের শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের আলোকে পড়াশোনা করে। বিদ্যুৎ না থাকলে তাদের প্রস্তুতি ব্যাহত হয়, পরীক্ষার ফলেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ এখন শিক্ষার সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো।
হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে বিদ্যুৎ মানে জীবন। অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, ডায়াগনস্টিক মেশিনÑসবকিছু বিদ্যুৎ ছাড়া অচল। এক মুহূর্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় রোগীর জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে দেয়। বড় হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর থাকলেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেই সুযোগ সীমিত। ফলে বিদ্যুৎ সংকট সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
বিদ্যুৎ শুধু ঘর আলোকিত করে না; এটি অর্থনীতির চাকা ঘোরায়। পোশাক শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য খামার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পÑসবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
একটি কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে উৎপাদন ক্ষতি হয়, রপ্তানি কমে যায়, শ্রমিকদের আয় ব্যাহত হয়। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। বাংলাদেশের কৃষি এখন অনেকাংশে যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎনির্ভর। সেচপাম্প, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার, মাছের ঘেরের অক্সিজেন সরবরাহÑসবই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি ও মাছচাষে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি চলাচল বন্ধ হয়, ফলে উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ে।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ের প্রবণতাও বাড়ছে। অপ্রয়োজনে লাইট-ফ্যান চালু রাখা, এসির অতিরিক্ত ব্যবহার, অবৈধ সংযোগÑএসব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে উৎপাদন বাড়লেও অনেক সময় প্রকৃত সরবরাহ সংকট থেকে যায়। বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাসÑএসব উৎস আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে সূর্যের আলো প্রচুর, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ আরও বিস্তৃত করা গেলে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিদ্যুৎ সংকট শুধু উৎপাদনের সমস্যা নয়; এটি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও নাগরিক আচরণেরও প্রশ্ন। সরকারকে যেমন দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।
অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ না হলে কোনো উৎপাদন ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। “বিদ্যুৎ না পাইলে মরে যাব”Ñএই কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়, কিন্তু প্রতীকী অর্থে এটি গভীর বাস্তবতা বহন করে। বিদ্যুৎ ছাড়া আমরা হয়তো বাঁচব, কিন্তু সেই জীবন হবে অগোছালো, অচল এবং পিছিয়ে পড়া। আধুনিক সভ্যতা বিদ্যুতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো কাঠামোই কেঁপে উঠবে। তাই বিদ্যুৎকে শুধু সুবিধা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু বিদ্যুৎ পাওয়া বা না পাওয়ার নয়Ñপ্রশ্ন হলো, আমরা এই সম্পদকে কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারছি। কারণ ভবিষ্যতের উন্নয়ন নির্ভর করবে আলো জ্বালানোর ক্ষমতার ওপর নয়, বরং সেই আলো কতটা টেকসইভাবে ধরে রাখতে পারি তার ওপর।
লেখক: সংবাদকর্মী