শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ভারতীয় ‘পুশইন’ বন্ধের দাবিতে ভোমরায় ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ সমাবেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৮:১৩ অপরাহ্ণ
ভারতীয় ‘পুশইন’ বন্ধের দাবিতে ভোমরায় ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ সমাবেশ

সংবাদদাতা: জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মুহা. ইজ্জতুল্লাহ বলেছেন,“বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। সীমান্তে যে কোনো ধরনের অন্যায়, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড দেশের জনগণ মেনে নেবে না। সকলকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের সব ধরনের আগ্রাসন ও অপতৎপরতা প্রতিরোধে দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াবে।” তিনি সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে সাতক্ষীরা জেলার ভারত সীমান্তসংলগ্ন ভোমরা স্থলবন্দরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ তিনি এসব কথা বলেন।

ভারত সীমান্ত দিয়ে ‘পুশইন’ বন্ধ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন ১১ দলীয় জোটের প্রধান ও জেলা জামায়াতের আমীর উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মো. ওমর ফারুক, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য এড আজিজুল ইসলাম, পৌর আমির জাহিদুল ইসলাম, সদর আমির মাওলানা মোশারফ হোসেন, সদর সেক্রেটারি মাওরানা হাবিবুর রহমান, দেবহাটা জামাযাতের সেক্রেটারি হাফেজ ইমদাদুল হক এনসিপির জেলা যুগ্ম সম্পাদকসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, “সীমান্ত এলাকায় বারবার ‘পুশইন’ ও অনুপ্রবেশের অভিযোগ উদ্বেগজনক। দেশের নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।” বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

 

 

Ads small one

সাতক্ষীরার মানুষ কি শুধু ভোট দেবে, নাকি উন্নয়নের হিসাবও চাইবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:০৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার মানুষ কি শুধু ভোট দেবে, নাকি উন্নয়নের হিসাবও চাইবে?

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

স্বাধীনতার পর থেকে সাতক্ষীরার মানুষ বিভিন্ন সময়ে তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ওপর আস্থা রেখে ভোট দিয়েছে। জনগণের সেই আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জেলার বিভিন্ন আসনের জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও জনমনে ঘুরপাক খায়-সাতক্ষীরা এর বিনিময়ে কতটা কাক্সিক্ষত উন্নয়ন পেয়েছে?

একজন সংসদ সদস্যের প্রধান দায়িত্ব শুধু নির্বাচিত হওয়া নয়; বরং সংসদে নিজ এলাকার মানুষের দাবি, সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্পায়নের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কার্যকর ভূমিকা রাখাই জনগণের প্রত্যাশা।

বর্তমানে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই একই রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও জেলার বহু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে রেলপথ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয় বলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সাতক্ষীরা রেলপথ প্রকল্প এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও এ প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা গুরুত্বের প্রতিফলন না পাওয়ায় জেলার মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। একইভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

জনগণ জানতে চায়-তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাতক্ষীরার দাবিগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। কেন আজও রেলপথ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত? কেন জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জনগণের অধিকার।
গণতন্ত্রে ভোট শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যম নয়; এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম শক্তিশালী উপায়। তাই দলীয় আবেগ বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে এখন সময় এসেছে উন্নয়নের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে বাস্তব অগ্রগতির হিসাব চাওয়ার।

সাতক্ষীরার মানুষ কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরোধিতা নয়, বরং জেলার সার্বিক উন্নয়ন দেখতে চায়। তারা চায় আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, কার্যকর রেলসংযোগ, উন্নত সড়ক, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং একটি সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা।

সাতক্ষীরার মানুষের ভোটের মূল্য আছে। সেই ভোটের যথাযথ মর্যাদা দিতে হলে উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। লেখক: কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ

 

শিশুশ্রম: সামাজিক ব্যাধি না-কি পারিবারিক আর্থিক সংকটের প্রতিফলন?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ণ
শিশুশ্রম: সামাজিক ব্যাধি না-কি পারিবারিক আর্থিক সংকটের প্রতিফলন?

সাকিবুর রহমান বাবলা

১২ জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর মেধা ও শারীরিক বিকাশের জন্য হাতে বই-খাতা, রঙ-তুলি কিংবা খেলনা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চাপে অনেক শিশুর হাতেই আজ কাজের সরঞ্জাম। প্রশ্ন হলো-শিশুশ্রম কি শুধুই একটি সামাজিক সমস্যা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে পারিবারিক আর্থিক সংকটের নির্মম বাস্তবতা?

আর্থিক দারিদ্র্য, বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষার অভাব, পারিবারিক সচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা শিশুশ্রমের প্রধান কারণ। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং নি¤œ আয়ের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের শ্রমে যুক্ত করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, স্বল্প খরচে শ্রম পাওয়ার সুযোগ থাকায় মালিকপক্ষও শিশুদের কাজে আগ্রহী হয়। ফলে শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের শারীরিক গঠন ও মৌলিক শিক্ষার ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শিশুশ্রম নিরোধে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও আয়বর্ধক কর্মসূচি নিশ্চিত করা জরুরি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিশুবান্ধব শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা, যুগোপযোগী ও সম্প্রসারিত শ্রম আইন প্রণয়ন, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন বিকাশের পরিবেশ গড়ে তোলা। পাশাপাশি, সুশীল সমাজের দায়িত্ব হলো শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক হিসেবে না দেখা, শিশু অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং প্রতিটি শিশুর মেধা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

শিশু কোনো শ্রমিক নয়; তারা এক একটি সম্ভাবনা, একটি স্বপ্ন, আগামীর আলোকিত ভবিষ্যৎ এবং দেশ গড়ার কারিগর। তাই শিশুশ্রমমুক্ত সাতক্ষীরা জেলা তথা শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

কৃতজ্ঞতার শক্তি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
কৃতজ্ঞতার শক্তি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গল্প ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গল্পটি ছিল একটি ছোট্ট পাখিকে নিয়ে। চারদিকে তপ্ত বালু, নেই কোনো গাছ, নেই কোনো জলাশয়। প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রামে তার পালক ঝরে পড়ছে, শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। একদিন সে জানতে পারল, তার এই দুর্দশা আরও বহু বছর চলবে। এমন সংবাদ যে কাউকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে পাখিটি অভিযোগ না করে প্রতিদিন সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করল। আর কিছুদিনের মধ্যেই তার চারপাশ বদলে গেল।

 

শুষ্ক ভূমি সবুজে ভরে উঠল, জল এলো, জীবন ফিরে এলো।এটি নিছক একটি গল্প। বাস্তবতার নিরিখে এর সত্যতা বিচার করার প্রয়োজন নেই। কারণ গল্পের শক্তি তার ঘটনার মধ্যে নয়, তার বার্তার মধ্যে। আর এই গল্পের বার্তা হলোÑকৃতজ্ঞতা মানুষের জীবনবোধ বদলে দিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজ কাজ গুলোর একটি হলো অভিযোগ করা। রাষ্ট্র নিয়ে অভিযোগ, সমাজ নিয়ে অভিযোগ, পরিবার নিয়ে অভিযোগ, নিজের ভাগ্য নিয়ে অভিযোগÑআমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ জুড়েই যেন অসন্তোষের ভাষা।

 

অভিযোগের অনেক কারণও আছে। দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশগত বিপর্যয় কিংবা সামাজিক বৈষম্যÑএসব বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অভিযোগ কি আমাদের সমস্যার সমাধান দেয়? নাকি আমাদের আরও হতাশ করে তোলে? মানুষের মনোবিজ্ঞানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মন সাধারণত যা নেই, তার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘নেগেটিভিটি বায়াস’। অর্থাৎ ইতিবাচক ঘটনার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাই আমাদের মনে বেশি প্রভাব ফেলে।

 

দশটি ভালো ঘটনার মধ্যে একটি খারাপ ঘটনা ঘটলে আমরা সেই একটিকেই বেশি মনে রাখি। ফলে জীবনের অসংখ্য প্রাপ্তি আড়ালে পড়ে যায়। আমাদের চারপাশে তাকালেই এর উদাহরণ পাওয়া যায়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেনি। তখন তার মনোযোগ থাকে ব্যর্থতার দিকে। একজন চাকরিজীবী হয়তো একটি স্থায়ী আয়ের উৎস পেয়েছেন, কিন্তু কাক্সিক্ষত পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। একজন কৃষক হয়তো গত বছরের তুলনায় ভালো ফলন পেয়েছেন, কিন্তু বাজারদর প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় সব অর্জনকেই ব্যর্থতা মনে করেন। এভাবে আমরা জীবনের প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির হিসাবই বেশি করি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

 

প্রতিদিন আমরা অন্যের সাফল্যের ছবি দেখি। কেউ বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনছে, কেউ ব্যবসায় সফল হচ্ছে, কেউ ঘুরতে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এসব দেখে অজান্তেই আমরা নিজের জীবনকে তাদের সঙ্গে তুলনা করি। ফলে নিজের অর্জনগুলোকে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অন্যের জীবনের পুরো গল্প দেখায় না। দেখায় কেবল নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত। যে মানুষটির হাসিমাখা ছবি আমরা দেখছি, তার জীবনেও হয়তো আছে গভীর উদ্বেগ, সংগ্রাম কিংবা একাকিত্ব। তাই তুলনার এই সংস্কৃতি মানুষকে সুখী করার বদলে আরও অসন্তুষ্ট করে তুলছে। কৃতজ্ঞতা এই অসন্তোষের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ।

 

কৃতজ্ঞতা মানে শুধু ‘ধন্যবাদ’ বলা নয়। কৃতজ্ঞতা হলো জীবনের প্রতি এক ধরনের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার জীবনে অনেক কিছুই আছে, যা মূল্যবান।আমরা কি কখনও ভেবে দেখি, সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের পায়ে হেঁটে চলতে পারা কত বড় আশীর্বাদ? পরিবারের সদস্যদের সুস্থভাবে পাশে পাওয়া কত বড় প্রাপ্তি? প্রতিদিন খাবার জোগাড় করতে পারা, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারা কিংবা নিরাপদে ঘুমাতে পারাÑপৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এগুলো স্বপ্নের মতো।

 

জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনও বিশ্বের বহু মানুষ নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য কিংবা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখো মানুষ অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের অভিযোগের পাশাপাশি কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণও কম নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তবু তারা জীবন থামিয়ে রাখে না।

 

ঝড়ের পর আবার ঘর তোলে, ভেঙে যাওয়া জমিতে আবার চাষ করে, সন্তানদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। এই যে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, এর পেছনে রয়েছে আশাবাদ ও কৃতজ্ঞতার এক অদৃশ্য ভিত্তি। মানুষের ইতিহাসও মূলত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগÑকত বিপর্যয়ই তো এসেছে। কিন্তু মানুষ আবার নতুন করে শুরু করেছে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিক স্থিতি। আর কৃতজ্ঞতা সেই স্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে কৃতজ্ঞতার উপকারিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। গবেষণাগুলো বলছে, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চা করেন, তারা তুলনামূলক ভাবে কম হতাশায় ভোগেন, তাদের মানসিক চাপ কম থাকে এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি বেশি থাকে।

 

কৃতজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ তৈরি করে, সম্পর্ক উন্নত করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়েছিল। যখন পৃথিব জুড়ে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছিল, তখন অনেক মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোর মূল্য। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, সুস্থ শরীরে শ্বাস নিতে পারা কিংবা প্রিয়জনের উপস্থিতিÑএসবই তখন অমূল্য হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয় দর্শনেও কৃতজ্ঞতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

 

প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনের মধ্যেই একটি অভিন্ন বার্তা রয়েছেÑঅহংকার নয়, কৃতজ্ঞতাই মানুষকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। তবে কৃতজ্ঞতা মানে এই নয় যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। সমাজের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা যাবে না। বরং কৃতজ্ঞতা মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। কারণ যে মানুষ নিজের প্রাপ্তির মূল্য বোঝে, সে অন্যের বঞ্চনাও উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সে সমাজ পরিবর্তনের কাজেও বেশি আন্তরিক হয়। আমাদের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় কৃতজ্ঞতার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।

 

শিশুদের শেখাতে হবে, প্রতিটি অর্জনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। একজন কৃষক খাবার উৎপাদন করেন, শ্রমিক রাস্তা তৈরি করেন, শিক্ষক জ্ঞান দেন, চিকিৎসক জীবন বাঁচান। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে উপলব্ধি করতে পারলেই মানুষের মধ্যে বিনয় ও মানবিকতা বাড়বে। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে প্রত্যাশাও। আমরা যত বেশি পাচ্ছি, তত বেশি চাইছি। ফলে সন্তুষ্টি যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

 

এই অন্তহীন চাওয়ার সংস্কৃতির মধ্যে কৃতজ্ঞতা আমাদের থামতে শেখায়। শেখায়, জীবনের মূল্য শুধু ভবিষ্যতের অর্জনে নয়, বর্তমানের প্রাপ্তিতেও নিহিত। ছোট্ট পাখিটির গল্পে দশ বছরের কষ্ট এক মাসে শেষ হয়ে যায়। বাস্তব জীবন এত সহজ নয়। এখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই সব সমস্যা দূর হয়ে যায় না। কিন্তু কৃতজ্ঞতা মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। আর সেই শক্তিই তাকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বাইরের জগতে নয়, মানুষের ভেতরে ঘটে। যখন একজন মানুষ অভিযোগের ভাষা ছেড়ে কৃতজ্ঞতার ভাষা শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

 

আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে অনেক সময় জীবনও বদলে যায়। এই অস্থির সময়ে তাই কৃতজ্ঞতার শিক্ষা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একবার নিজের প্রাপ্তিগুলোর কথা স্মরণ করি, যদি উপলব্ধি করি যে জীবনে এখনও অনেক সৌন্দর্য, অনেক সম্ভাবনা এবং অনেক আশীর্বাদ আছে, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজও কিছুটা ইতিবাচক হবে। কারণ সুখের সবচেয়ে বড় উৎস সবসময় বেশি পাওয়া নয়; বরং যা পেয়েছি, তার মূল্য বুঝতে শেখা। আর সেই শিক্ষার নামই কৃতজ্ঞতা।

লেখক: সাংবাদকর্মী