বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ, নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ, নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি?

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইতিপূর্বে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই জোটকে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর ঢাকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের যে স্বাধীন ও সুষম পররাষ্ট্রনীতি, তার আলোকেই এই জোটে অংশগ্রহণের অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত লাভ-ক্ষতি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলো “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়। একটি বহুজাতিক সামরিক বা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এই নীতিনির্ধারণী ভিত্তিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

‎এ ধরনের চুক্তিতে সরাসরি যোগ দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে ধারণা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, যেখানে মক্কা চুক্তিতে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো ‘একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ’ নীতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংঘাতের জটিলতায় জড়িয়ে বাংলাদেশের সৈন্যদের অন্য দেশের যুদ্ধে নিয়োজিত করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সাথে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং বিভিন্ন প্রধান শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক। কোনো সামরিক ব্লকে জড়ানোর ফলে যদি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

আঞ্চলিক পরাশক্তি, সামরিক বাজার ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ
‎দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান এবং শক্তিশালী সামরিক প্রবিধিসম্পন্ন তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক সম্পৃক্ততা প্রতিবেশীদের দৃষ্টিতে একটি নতুন কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সীমানা সংলগ্ন অঞ্চলে কৌশলগত চাপ বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে ঢাকার পথ জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের উদীয়মান প্রসার ও বাণিজ্যিক স্বার্থও এখানে স্পষ্ট। তুরস্কের সামরিক আধুনিকায়ন প্রকল্প ‘ঋড়ৎপবং এড়ধষ ২০৩০’-এর আওতায় তাদের আধুনিক ড্রোন, প্রযুক্তিসম্পন্ন নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় বড় বাজার হতে পারে।

‎বৈশ্বিক মঞ্চে ইতিবাচক কূটনীতি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকার কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবকেই পুনর্ব্যক্ত করে। বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের এই বর্ধিত দরকষাকষির ক্ষমতাকে সামরিক জোটে যোগ না দিয়ে বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও সুষম কূটনীতির কাজে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশ ইতিপূর্বে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন ১৪টি দেশের ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’-এ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ওই জোটের উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক নিরাপত্তা দেওয়া, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে, সরাসরি কোনো বহুজাতিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়া ভিন্ন হিসাব-নিকাশের বিষয়।

‎বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রভাব, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও কূটনৈতিক সম্ভাবনা
‎১. অর্থনৈতিক রূপরেখা: মক্কা চুক্তির মতো জোটে যোগ দিলে স্বল্পমেয়াদে সৌদি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা মিললেও, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখে জ্বালানি আমদানির খরচ ও শিপিং বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অক্ষুণœ রাখা।

‎২. ত্রিমুখী কৌশলগত ভারসাম্য (ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র): বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সফলভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি এবং তুরস্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঢাকার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
‎৩. জাতিসংঘ ও বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে ভূমিকা: সরাসরি কোনো সামরিক বলয়ে না গিয়ে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের মধ্যস্থতাকারী ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী ভাবমূর্তিকে জোরদার করা প্রয়োজন। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা।

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণনগর-সেনেরগাঁতী খালের সুুইসগেট বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে পাট পচানো হচ্ছে। এতে খালের পানি বিষাক্ত ও দূষিত হয়ে যেমন ব্যাপক হারে মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর—যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য বহু বছর ধরে এই জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় আজ তাঁরা কর্মহীন, ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর ঋণ ও দেনার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
কৃষিপ্রধান আমাদের এই অঞ্চলে পাট উৎপাদন ও পাট পচানো কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষির একটি খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন খালের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ ধ্বংস করা হয় এবং অন্য একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ নিস্ব ও উপবাসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই বা গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন হতে পারে না।
প্রভাবশালী মহলের সুবিধার্থে খালের ওপর নির্মিত কপোতাক্ষের পানির কপাট বা সুইচগেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করে, অথচ তা সামগ্রিক জনস্বার্থ ও সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির পরিপন্থী। উন্মুক্ত জলাধারে এভাবে পানিপ্রবাহ আটকে রাখা এবং পরিবেশদূষণ ঘটানো পরিবেশ আইন ও মৎস্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষ্ণনগর খালের সুইচগেটটি খুলে দিয়ে দ্রুত কপোতাক্ষের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দূষিত পানি সরে গিয়ে পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেনাগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। জলাশয় সবার, একে ব্যক্তিস্বার্থে জিম্মি করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন করার সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

 

 

 

শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আয়োজিত সালিস বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযোগকারীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. মোকসেদ আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ২৬ আগস্ট বিকেলে শ্যামনগর সদরে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজা মাহমুদ জানান, তাঁদের কেনা ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমিতে গত ২৫ আগস্ট চাষাবাদ করতে গেলে মোকসেদ আলীসহ কয়েকজন বাধা দেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগকারীর দাবি, সালিসে মোকসেদ আলী জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো সালিস চলাকালেই তিনি সুজা মাহমুদকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. মোকসেদ আলী নিজেকে ‘ভূমিহীন নেতা’ দাবি করে বলেন, জমিটি সরকারি খাসজমি এবং তা ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, জমিটি খাস নাকি বন্দোবস্ত দেওয়াÑতা সরকারি খতিয়ান ও নথি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হুমকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

 

শ্যামল শীল
১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয়। সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় ১৮৮২-৮৪ সালে । এ সময় নাভারনে রেলওয়ে স্টেশনও নির্মাণ করা হয়। ১৯১৪ সালে ভাইসরয় অব বৃটিশ ইন্ডিয়া কলকাতা থেকে নাভারণ হয়ে সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত রেল লিংক স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং সেটি অনুমোদনও করেন। ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়েও রেলের জায়গা রেখে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা শোনা যায়। কালেক্রমে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কি. মি. রেল লাইন নির্মাণ করা হয়। রেল নেটওয়ার্কে দেশের ৪৪টি জেলা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে যায় অবহেলিত।
দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বাণিজ্য নির্ভর ও অর্থনীতির সুতিকাগার হিসেবে সাতক্ষীরা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেছে। জেলার বিশলক্ষাধীক মানুষের যাতায়াত এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম সড়ক পথ আর তাই জেলাবাসির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা আর বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ প্রত্যাশা রেলপথ, রেল যোগাযোগ। এই মাধ্যমটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেকাংশে কম, সাতক্ষীরা বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। এবং অভ্যন্তরীন বানিজ্য নির্ভর। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী বিশ্ব বাজারে রপ্তানীর মাধ্যমে দেশ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে, এই চিংড়ী পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ, রেলপথ কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারে বিশেষত পণ্য পরিবহনে খরচ কম সহ হিমায়িত বিষয় গুলোতে সুবিধা পাবে। দেশের অন্যতম স্থল বন্দর সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহারে বিশেষ উৎসাহিত হতো যদি জেলায় রেলপথ থাকতো। আর এ ক্ষেত্রে আমদানী ও রপ্তানী কৃত পণ্য সামগ্রী ট্রাকের পরিবর্তে রেলে নিলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেনাপোল সহ দেশের অপরাপর বন্দর গুলো রেলযোগাযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। সাতক্ষীরা কৃষি প্রধান এলাকা এই জেলাকে শস্য ভান্ডার বলা হয়। কৃষক তার ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য ট্রাকের পরিবর্তে রেলে আনা নেওয়া করলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমবে। অন্যদিকে সাধারন ব্যবসায়ীরা আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য শহর হতে পণ্য সামগ্রী ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আনা নেওয়া করে থাকে যা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময় গুলোতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রী আনা নেওয়া ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল খুশি মত মূল্য নির্ধারন করে গ্রাহকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। রেলগাড়ী দৃশ্যতঃ বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং ব্যাপক ভিত্তিক পণ্য সামগ্রী বহনে ও পরিবহনে প্রস্তুত বিধায় যাতায়াত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেল গাড়ীর বিকল্প কেবলই রেলগাড়ী। সাতক্ষীরা মুন্সিগঞ্জ টু বেনাপোল, যশোর, খুলনা রেল যোগাযোগের বিষয়টি যেমন সময়ের দাবী অনুরুপ ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবীর যৌক্তিকতার সাথে সহমত ও পোষন করেছে। সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ একনেকের বৈঠকেও রেল যোগাযোগ তথা সাতক্ষীরা রেলপথে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত দৃশ্যতঃ কোন কাজ শুরু হইনি। জেলাবাসি আশা অবিলম্বে রেললাইন নির্মান কাজ শুরু হোক। সাতক্ষীরার অর্থনীতি এবং ব্যবসা বানিজ্যের নবদিগন্তের ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে রেলপথ অন্যদিকে রেলপথের অভাব হেতু সাতক্ষীরার কাঙ্খিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াত যোগাযোগ এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বিনির্মান করবে তা নয় নগরায়ন, সভ্যতা, নতুন নতুন হাট বাজার ও মোকাম সৃষ্টি করবে, গ্রামের মেঠো পথ নগরায়নের ছোয়া পাবে, আলোকিত হবে গ্রামীন জনপথ সব মিলে রেলপথ সংযুক্ত সাতক্ষীরা হবে আধুনিক, উন্নয়ন নির্ভর ব্যবসা সফল আর অর্থনীতির আলোকিত সাতক্ষীরা। কিন্তু সেই সুসময় সম্ভব কেবল মাত্র রেল পথের মাধ্যমেই। সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক মানুষের আশার প্রতীক রেল পথ কতদূর?
১১১ বছর পূর্ব থেকে সাতক্ষীরার মানুষ রেলের স্বপ্ন দেখছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, সুন্দরবন ও পর্যটন, ভারতের সাথে ব্যবসা—বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানকার মোট কৃষি জমির এক—তৃতীয়াংশের বেশি জমিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ হয়। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন মাছের এর একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ হয়। সাতক্ষীরার আম এখন বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়, কুল, ধানসহ শাক সবজির ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যার একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্নস্থান ছাড়াও দেশের বাইরে রপ্তানী হয়। সড়ক পথে সুন্দরবন ভ্রমনের একমাত্র সুযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে যে কোন যানবাহনে সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ পৌছালেই চুনকড়ি নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। পর্যটনে কক্সবাজারের পরেই সুন্দরবন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পট। বাংলাদেশ—ভারতের মধ্যকার ২৭২কি.মি. সীমান্ত রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এখানকার ভোমরা স্থল বন্দর থেকে মাত্র ৮০কি.মি. দূরত্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা শহর অবস্থিত। কোলকাতা সমুদ্র বন্দরের সবচেয়ে নিকটে রয়েছে অধুনালুপ্ত সাতক্ষীরার বসন্তপুর নৌবন্দর। এটিই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার ব্যবসা—বানিজ্যের সেতুবন্ধনকারী একমাত্র নৌবন্দর। এবছর সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম কুরিয়ারে ঢাকায় পাঠাতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির খরচ ২০ টাকার কম নয়। একই আম চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে প্রতি কেজির খরচ হয়েছে ১টাকা ৩১ পয়সা। রেলে ঝুক্কি—ঝাকি কম হওয়ায় প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ কম। ফলে রেলে আম পরিবহনে প্যাকিংসহ খরচ গড়ে ৫টাকার বেশি নয়। সাতক্ষীরা এবং চাপাইনবাবগঞ্জের এই আম পরিবহনের খরচের পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরার আম তুলনামূলক সুস্বাদু হওয়া সত্বেও পরিবহন ব্যয়ের এই পার্থক্যের কারনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পন্য পরিবহনের সিংহভাগ ছিল নদী কেন্দ্রীক। তখন সড়ক পথে খুলনায় যেতে হতো যশোর হয়ে এবং সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১৫/২০ ঘন্টা। নৌপথ বন্ধ হওয়ার পর সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন সড়ক পথ। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগন্তরকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাতক্ষীরায় সড়ক উন্নয়ন হয়েছে কম। এর অন্যতম প্রধান কারন মনে করা হয় সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা।
প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইল কোম্পানি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়। নাভারণ—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেললাইনের সম্ভাব্যতা ম্যাপে নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ পর্যন্ত ৯৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এলাকায় মোট আটটি স্টেশনের কথা বলা হয়। স্টেশনগুলোর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয় নাভারণ, বাগআচড়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, পারুলিয়া, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ম্যাপে বাঁকাল, লাবণ্যবতী, সাপমারা খাল ও কাকশিয়ালী নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নাভারন থেকে বাগআচড়া স্টেশনের দূরত্ব ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, বাগআচড়া থেকে কলারোয়া ১২ দশমিক ৬৮, কলারোয়া থেকে সাতক্ষীরা ১৪ দশমিক ২৩, সাতক্ষীরা থেকে পারুলিয়া ১৫ দশমিক ১১, পারুলিয়া থেকে কালিগঞ্জ ১৮ দশমিক ৩৭, কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর ১৩ দশমিক ৮২ ও শ্যামনগর থেকে মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের দূরত্ব হবে ১১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। প্রকল্পটি মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে আরও ১০ কি.মি. বাদ দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ গ্যারেজ বাজার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিরই পিডিপিপি প্রণয়ন করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কন্সট্রাকশন অব নিউ বিজি ট্র্যাক ফর্ম নাভারন টু সাতক্ষীরা’ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীনের কাছে থেকে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা—ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়ও রেললাইনের জায়গা ধরে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তখনও রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। কিন্তু সে প্রক্রিয়া বেশিদুর যায়নি।
এই পরিস্থিতির অবসানে জরুরিভাবে নাভারন—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর সেজন্য প্রয়োজন সাতক্ষীরার রাজনীতিবীদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা