সচ্চিদানন্দ দে সদয়
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৮ জুন থেকে পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ এবং ১ জুলাই থেকে ভিসা প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে।
সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে। কারণ ভারত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পর্যটন এবং পারিবারিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস, ভূগোল এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের নানা উত্থান-পতন থাকলেও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভিসা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই যোগাযোগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। ফলে নতুন করে পর্যটন ভিসা চালুর সিদ্ধান্তকে অনেকেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশিদের কাছে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় বিদেশ ভ্রমণের গন্তব্য। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ। প্রথমত, ভৌগোলিক নৈকট্য। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ। তৃতীয়ত, ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগীয় সম্পর্ক বহু পুরোনো। কলকাতার রাস্তাঘাট, সাহিত্য-সংস্কৃতি, খাবার কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচিতি ও আকর্ষণ দীর্ঘদিনের।চিকিৎসা খাতেও ভারত বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম নির্ভরতার জায়গা। প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু কিংবা মুম্বাইয়ের হাসপাতালগুলোতে যান।
অনেক পরিবার চিকিৎসা ভিসার পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে থাকে। পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এই যাতায়াতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত সেই সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান করবে।শিক্ষাক্ষেত্রেও ভারতের গুরুত্ব কম নয়। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কিংবা একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচির জন্য প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভারতে যায়। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা সাক্ষাৎকারের জন্যও ভ্রমণ করে থাকে। পর্যটন ভিসা চালু হওয়ায় এসব কার্যক্রম আরও সহজ হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি পর্যটকরা ভারতের পর্যটন অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। হোটেল, পরিবহন, চিকিৎসা, বিপণিবিতান এবং বিভিন্ন সেবাখাত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আবার বাংলাদেশ থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের একটি বড় অংশ ভারতগামী পর্যটকদের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ফলে ভিসা চালু হওয়ার ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।তবে শুধু অর্থনৈতিক লাভের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তকে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। আধুনিক বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি হলো ‘পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি’ বা জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক যতই শক্তিশালী হোক, সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্ব না থাকলে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পর্যটন ভিসা সেই আস্থা গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পর্যটনকে একটি কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সীমান্ত উন্মুক্ত করে মানুষের যাতায়াত সহজ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশও একই পথে এগিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নানা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সেই মাত্রার সহযোগিতা গড়ে ওঠেনি। তবুও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিসা সহজীকরণ পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মানবিক ও বাস্তবমুখী করতে পারে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়Ñদুই বছর ধরে পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ থাকার ফলে যে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তার দায় কে নেবে? অনেক মানুষ পারিবারিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় তীর্থযাত্রা কিংবা অবকাশ যাপনের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়ে দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের আরও দূরদর্শী হতে হবে।ভিসা চালুর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসেÑভিসা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা। অতীতে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলা এবং অনলাইন জটিলতা নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল।
অনেক সাধারণ মানুষ দালালের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি হয়রানির শিকার হয়েছেন অসংখ্য আবেদনকারী।পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর এই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, আধুনিক এবং হয়রানিমুক্ত করা। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা এবং আবেদনকারীদের জন্য স্বচ্ছ নির্দেশিকা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দালালচক্র নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণকে সচেতন করা। অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য বা ভুল ধারণার কারণে আবেদনকারীরা সমস্যায় পড়েন।
ভ্রমণবিষয়ক তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন আবেদন পদ্ধতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এখানে আরেকটি দিকও বিবেচনার দাবি রাখে। দুই দেশের মধ্যে শুধু বাংলাদেশিদের ভারতগমন নয়, ভারতীয় পর্যটকদের বাংলাদেশে আগমনও উৎসাহিত করতে হবে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। পারস্পরিক পর্যটন বৃদ্ধি পেলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে চলে আসে। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতির নানা প্রশ্ন আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু এসব জটিলতার মধ্যেও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সংকট অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হলেও মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব সহজে কমানো যায় না।পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত সেই দূরত্ব কমানোর একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম একে অপরের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। ভুল ধারণা ও পূর্বধারণা দূর হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে। আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেবল রাষ্ট্রীয় চুক্তি বা রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং যোগাযোগের ওপর। সেই যোগাযোগের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি হলো পর্যটন।অতএব, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন পুনর্র্নিমাণের একটি উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন, সেবার মানোন্নয়ন এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই শক্তিশালী হবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা। কাঁটাতারের সীমান্ত মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা ও মানবিক সম্পর্কের বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত সেই সত্যকেই আবারও স্মরণ করিয়ে দিল।এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কেবল ভ্রমণের সুযোগ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
লেখক: সংবাদ কর্মী