বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

মোবাইলে অব্যবহৃত ডাটার মেয়াদ ও বিমানের টিকিটের দাম নিয়ে সংসদে ক্ষোভ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ৮:২৪ অপরাহ্ণ
মোবাইলে অব্যবহৃত ডাটার মেয়াদ ও বিমানের টিকিটের দাম নিয়ে সংসদে ক্ষোভ

মোবাইল ইন্টারনেটের মেয়াদ শেষ হলে অব্যবহৃত ডাটা কেটে নেওয়া এবং সপ্তাহের শেষ দিকে বিমানের টিকিটের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিন বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ পর্যায়ে সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

পয়েন্ট অব অর্ডারে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘গতকাল ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে আমরা জেনেছি, চারটি টেলিফোন কোম্পানির কাছে সরকারের ১৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে এটি বিশাল অঙ্কের রাজস্ব। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান টেলিটকের কাছে এই টাকা পাওনা।’

জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আরও একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ এক মাসের জন্য হয়তো ১০০০ টাকার ইন্টারনেট কিনলাম। কিন্তু মাস শেষে দেখা গেল ৪০০ বা ৫০০ টাকার ইন্টারনেট অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হলে সেই টাকা বা ডাটা অটোমেটিক্যালি কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়। এটা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের অন্যায়। এই টাকা কেন তারা নিয়ে যাবে?’

বিমানের টিকিটের দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফারুক বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার যারা যাতায়াত করেন, তাদের পকেট কাটা হচ্ছে। অন্য দিন যে টিকিটের দাম ২৮০০ বা ৩০০০ টাকা, বৃহস্পতিবার সেটি হয়ে যায় ১০ হাজার টাকা। এই বিষয়গুলো দেখা দরকার।’

জয়নুল আবদিন ফারুকের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিমানের টিকিটের ওপর যে জুলুম চলছে, সে বিষয়ে আমি আগেও নোটিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও সমাধান হয়নি। এটি আলোচনার যোগ্য একটি বিষয়। মানুষের ওপর এই জুলুম বন্ধ হওয়া উচিত।’

মুজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘শুধু টেলিফোন কোম্পানি নয়, সাবেক অনেক সংসদ সদস্যের কাছেও টেলিফোন বিল ও বাড়ি ভাড়া বাবদ অনেক টাকা পাওনা রয়েছে। এই জাতীয় সম্পদগুলো উদ্ধারে সংসদকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কেউ মারা যাওয়ার আগে যেন এই ঋণের বোঝা নিয়ে না যান, সে ব্যবস্থা করা উচিত।’

সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আপনারা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে বিষয়গুলো তুললেন, সেগুলোর জন্য যথাযথ বিধি মেনে নোটিশ দিন। নোটিশ দিলে আমরা অবশ্যই সংসদে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দেবো।’

 

Ads small one

মুক্তমত: লালসালু’র মজিদ এবং আমাদের চিরন্তন অন্ধত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: লালসালু’র মজিদ এবং আমাদের চিরন্তন অন্ধত্ব

তারিক ইসলাম

‎সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যখন ১৯৪৮ সালে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস লালসালু লিখেছিলেন, তখন তিনি আসলে শুধু মহব্বতপুর গ্রামের এক মজিদকে আঁকেননি; তিনি এঁকেছিলেন বাঙালি মুসলিম সমাজের এক চিরন্তন ও অশুভ মনস্তত্ত্বের অবয়ব। আজ পৌনে এক শতাব্দী পরেও যখন আমরা চারপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে তাকাই, তখন মজিদ চরিত্রটি মোটেও অতীত বা কাল্পনিক কোনো চরিত্র মনে হয় না। বরং মনে হয়, লালসালুর মজিদ আজ বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করে আমাদের চেনা চত্বরেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ও আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে।

‎উপন্যাসের শুরুতে মজিদ যখন শস্যহীন ‘গারো পাহাড়’ অঞ্চল থেকে ক্ষিধের তাড়নায় মহব্বতপুর গ্রামে প্রবেশ করে, তখন তার একমাত্র পুঁজি ছিল মানুষের ধর্মভীরুতা ও অবদমিত ভয়। গ্রামের এক অজ্ঞাত, জরাজীর্ণ কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের মাজার’ বলে ঘোষণা দিয়ে সে রাতারাতি নিজের ভাগ্য বদলে ফেলে। লাল কাপড়ে ঢাকা সেই মাজার হয়ে ওঠে তার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আর ধর্ম হয়ে ওঠে শোষণের হাতিয়ার। মজিদের এই চাতুর্য কেবল তার একার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ছিল না, এটি ছিল ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সম্পদ কুক্ষিগত করার এক চরম রাজনীতি।

‎আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে কি আমরা মজিদের উত্তরসূরিদের দেখতে পাই না? প্রযুক্তির আধুনিকায়ন আর শিক্ষার হার বাড়লেও আমাদের সমাজ থেকে হুজুগ, কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতা বিদায় নেয়নি। বরং মজিদের সেই আদিম চাতুর্য আজ ডিজিটাল রূপ ধারণ করেছে। ওয়াজ মাহফিলের নামে একশ্রেণীর বক্তার উগ্র ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মের ভুল ও চটকদার ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের সরলতাকে পুঁজি করা, কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা—সবই মজিদীয় দর্শনের আধুনিক সংস্করণ।
‎মজিদের শক্তির মূল উৎস ছিল মানুষের ‘প্রশ্নহীন আনুগত্য’। সে গ্রামের মানুষদের প্রতিনিয়ত পরকালের ভয় দেখাত, যাতে তারা ইহকালের অধিকার ও শোষণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে। যখনই গ্রামে তাহের-কাদেরের বাবার মতো কেউ তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছে, কিংবা জমিলা নামের এক অবাধ্য কিশোরী তার ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে চেয়েছে, তখনই মজিদ ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করেছে। জামিলার চুল মাজারের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার সেই দৃশ্যটি আসলে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার এক আদিম প্রতীক।

‎আজকের সমাজেও যখনই যুক্তি, বিজ্ঞান বা মুক্তবুদ্ধির চর্চা হতে যায়, তখনই একদল আধুনিক ‘মজিদ’ ধর্মের অবমাননার ধুয়া তুলে উন্মাদনা তৈরি করে। সহজ-সরল মানুষকে খেপিয়ে তুলে ভাঙচুর, সহিংসতা কিংবা সামাজিক বয়কটের মতো ঘটনা ঘটানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ধর্ম রক্ষা নয়, বরং নিজেদের তৈরি করা ক্ষমতার ‘লালসালু’র সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ধর্ম মানুষের আত্মিক শান্তির জন্য, নৈতিকতা শিক্ষার জন্য। কিন্তু যখনই ধর্মকে কেন্দ্র করে অন্ধত্ব তৈরি হয়, তখনই জন্ম নেয় মজিদের মতো সুবিধাবাদীরা।

‎মজিদেরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মানুষের সচেতনতা, শিক্ষা এবং প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে। তাই লালসালু উপন্যাসের শেষে যখন মহব্বতপুর গ্রাম বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল, মানুষ যখন নিয়তির চেয়ে বাস্তব জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখনও মজিদ তার মাজার আঁকড়ে ধরেছিল—কারণ মাজার হারালে তার শোষণের রাজত্ব শেষ হয়ে যায়।

‎আজকের বাংলাদেশকে যদি আমরা একটি প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তবে এই মজিদদের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি। গ্রামীণ ও শহরের মানুষের মন থেকে অন্ধত্বের অন্ধকার দূর করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজকে এমন এক শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে, যা মানুষকে ভয়ের সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তিবাদী হতে শেখায়। যেদিন আমাদের সমাজ হুজুগ আর অলৌকিক ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে চিনতে পারবে, সেদিনই কেবল লালসালু’র মজিদদের এই চিরন্তন শোষণের অবসান ঘটবে।

লেখক: ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

 

 

পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু: আস্থার সেতুবন্ধন নাকি নতুন সম্ভাবনার দ্বার?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:১৩ অপরাহ্ণ
পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু: আস্থার সেতুবন্ধন নাকি নতুন সম্ভাবনার দ্বার?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৮ জুন থেকে পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ এবং ১ জুলাই থেকে ভিসা প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে।

 

সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে। কারণ ভারত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পর্যটন এবং পারিবারিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস, ভূগোল এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের নানা উত্থান-পতন থাকলেও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভিসা সীমাবদ্ধতার কারণে সেই যোগাযোগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। ফলে নতুন করে পর্যটন ভিসা চালুর সিদ্ধান্তকে অনেকেই দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

 

বাংলাদেশিদের কাছে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় বিদেশ ভ্রমণের গন্তব্য। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ। প্রথমত, ভৌগোলিক নৈকট্য। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ। তৃতীয়ত, ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগীয় সম্পর্ক বহু পুরোনো। কলকাতার রাস্তাঘাট, সাহিত্য-সংস্কৃতি, খাবার কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচিতি ও আকর্ষণ দীর্ঘদিনের।চিকিৎসা খাতেও ভারত বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম নির্ভরতার জায়গা। প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু কিংবা মুম্বাইয়ের হাসপাতালগুলোতে যান।

 

অনেক পরিবার চিকিৎসা ভিসার পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে থাকে। পর্যটন ভিসা বন্ধ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এই যাতায়াতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত সেই সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান করবে।শিক্ষাক্ষেত্রেও ভারতের গুরুত্ব কম নয়। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কিংবা একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচির জন্য প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভারতে যায়। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা সাক্ষাৎকারের জন্যও ভ্রমণ করে থাকে। পর্যটন ভিসা চালু হওয়ায় এসব কার্যক্রম আরও সহজ হবে।

 

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি পর্যটকরা ভারতের পর্যটন অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। হোটেল, পরিবহন, চিকিৎসা, বিপণিবিতান এবং বিভিন্ন সেবাখাত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আবার বাংলাদেশ থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের একটি বড় অংশ ভারতগামী পর্যটকদের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ফলে ভিসা চালু হওয়ার ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।তবে শুধু অর্থনৈতিক লাভের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তকে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। আধুনিক বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি হলো ‘পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি’ বা জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ।

 

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক যতই শক্তিশালী হোক, সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্ব না থাকলে সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পর্যটন ভিসা সেই আস্থা গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পর্যটনকে একটি কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সীমান্ত উন্মুক্ত করে মানুষের যাতায়াত সহজ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশও একই পথে এগিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নানা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সেই মাত্রার সহযোগিতা গড়ে ওঠেনি। তবুও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিসা সহজীকরণ পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মানবিক ও বাস্তবমুখী করতে পারে।

 

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়Ñদুই বছর ধরে পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ থাকার ফলে যে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তার দায় কে নেবে? অনেক মানুষ পারিবারিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় তীর্থযাত্রা কিংবা অবকাশ যাপনের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়ে দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের আরও দূরদর্শী হতে হবে।ভিসা চালুর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসেÑভিসা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা। অতীতে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলা এবং অনলাইন জটিলতা নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ ছিল।

 

অনেক সাধারণ মানুষ দালালের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি হয়রানির শিকার হয়েছেন অসংখ্য আবেদনকারী।পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর এই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, আধুনিক এবং হয়রানিমুক্ত করা। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা এবং আবেদনকারীদের জন্য স্বচ্ছ নির্দেশিকা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দালালচক্র নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।বাংলাদেশ সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণকে সচেতন করা। অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য বা ভুল ধারণার কারণে আবেদনকারীরা সমস্যায় পড়েন।

 

ভ্রমণবিষয়ক তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইন আবেদন পদ্ধতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এখানে আরেকটি দিকও বিবেচনার দাবি রাখে। দুই দেশের মধ্যে শুধু বাংলাদেশিদের ভারতগমন নয়, ভারতীয় পর্যটকদের বাংলাদেশে আগমনও উৎসাহিত করতে হবে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। পারস্পরিক পর্যটন বৃদ্ধি পেলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।

 

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে চলে আসে। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতির নানা প্রশ্ন আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু এসব জটিলতার মধ্যেও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সংকট অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হলেও মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব সহজে কমানো যায় না।পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত সেই দূরত্ব কমানোর একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

 

দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম একে অপরের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। ভুল ধারণা ও পূর্বধারণা দূর হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে। আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেবল রাষ্ট্রীয় চুক্তি বা রাজনৈতিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং যোগাযোগের ওপর। সেই যোগাযোগের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি হলো পর্যটন।অতএব, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন পুনর্র্নিমাণের একটি উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন, সেবার মানোন্নয়ন এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই শক্তিশালী হবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা। কাঁটাতারের সীমান্ত মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা ও মানবিক সম্পর্কের বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত সেই সত্যকেই আবারও স্মরণ করিয়ে দিল।এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কেবল ভ্রমণের সুযোগ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

লেখক: সংবাদ কর্মী

 

মাদকবিরোধী দিবস : সাতক্ষীরার প্রান্তিক মরণোৎসব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
মাদকবিরোধী দিবস : সাতক্ষীরার প্রান্তিক মরণোৎসব

আখলাকুর রহমান

গাছের পাতায় আষাঢ়ের প্রথম মেঘের ছায়া নামার আগেই বিশ্বজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ নামের সেই মস্ত বড় বৈশ্বিক পর্ষদটি খাতা-কলমে প্রস্তাব পাস করে ২৬শে জুন তারিখটিকে ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল দাগ দিয়ে চিহ্নিত করেছিল। এই উদযাপনের একটা ঐতিহাসিক গৌরবও আছে; চীনের কিং রাজবংশের আমলে লিন জেক্সু নামের এক অকুতোভয় ম্যান্ডারিন যখন ক্যান্টন বন্দরে ব্রিটিশ বণিকদের আনা জাহাজ জাহাজ আফিম পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন, সেই ঔপনিবেশিকতাবিরোধী প্রতিরোধকে সম্মান জানাতেই এই দিবসের পত্তন।

 

ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় যে, মাদক কেবল মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে না, ওটা একটা গোটা সমাজ, রাষ্ট্র এবং তরতাজা প্রজন্মকে ভেতরে ভেতরে ফোঁকড় করে ফেলে। আজ এই দিবসের রাষ্ট্রীয় কাগুজে স্লোগানের পাশে দাঁড়িয়ে যখন আমাদের নিজেদের সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরার দিকে তাকাই, তখন মেরুদ- বেয়ে এক তীব্র আতঙ্কের গ্রোত নেমে যায়।

আমাদের সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদগুলোর বর্তমান চেহারা বড় রূঢ়, বড় নির্মম। যে গ্রামগুলো একসময় ফজরের আজানের পবিত্র সুর, মসজিদের মক্তবে শিশুদের সুমধুর কুরআন তেলাওয়াত, চ-ীম-পের আড্ডা আর জারি-সারির শান্ত স্নিগ্ধতায় এক পরম আত্মিক শান্তিতে বেঁচে থাকত, আজ সেখানে এক অদ্ভুত ও বিষাক্ত নৈঃশব্দ্য। ইসলামের যে অমোঘ শিক্ষা মানুষের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করত, যুবসমাজকে দেখাত নৈতিকতার সরল পথ, সেই চিরন্তন মূল্যবোধকে আজ ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আজ এমন এক জঘন্য পর্যায়ে ঠেকেছে যে, গ্রামের পর গ্রাম মেপে প্রতি একশোটি বসতবাড়ি পার হতেই কোনো না কোনো ঝোপের আড়ালে, কিংবা ভাঙা চায়ের দোকানের পেছনে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা বা আইসের মতো মরণনেশার কেনাবেচা চোখে পড়ে।

 

সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে একদল ফড়িয়া ও চোরাকারবারি এ দেশের চালিকাশক্তি যুবসমাজের মগজে এই বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমাদের স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে লোকদেখানো দুই-চারটে ঝটিকা অভিযান চালায়, কিছু চুনোপুঁটি ধরে বাহবা নেয়; কিন্তু এই লৌকিক তৎপরতা দিয়ে ব্যাধির আসল শেকড় উপড়ানো কোনোদিনই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও প্রশাসন যদি সত্যি এই সর্বনাশা খেলা বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের নজরদারি শহরকেন্দ্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের করে প্রান্তিক গ্রামের ধুলোবালিতে নামিয়ে আনতে হবে। মাদকের আসল গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদের রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার ঠাট ঠুংরো কাচের মতো ভেঙে তাদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোই এখন প্রধান জরুরি কাজ।

আইনের লাঠি দিয়ে কোনোদিন মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকে নেশার ভূত তাড়ানো যায়নি, যাবেও না। এর জন্য প্রয়োজন সমাজের একদম নিচ থেকে গড়ে ওঠা এক স্বতঃস্ফূর্ত ও গণমুখী প্রতিরোধ। ইসলামে নেশাজাতীয় সব দ্রব্যকে স্পষ্টাক্ষরে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা মানবজাতির বুদ্ধি ও আত্মাকে কলুষিত করে। এই ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার বোধকে আমাদের তরুণদের অন্তরে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। প্রতিটা গ্রামের তরুণদের নিজেদের তাগিদেই দলবদ্ধ হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে খাঁটি মাদকবিরোধী যুব সংগঠন। এই যুবকরা কোনো করপোরেট এনজিওর অনুদানে চলবে না, তারা হবে নিজ নিজ মাটির অতন্দ্র প্রহরী; তারা চোখ কান খোলা রেখে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং যেখানেই এই বিষের কারবার দেখবে, যৌথ শক্তিতে রুখে দাঁড়াবে।

 

তরুণের এই বিপথগামিতা তো আসলে আমাদের বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থারই এক চরম ব্যর্থতা; তাদের সুস্থ বিনোদন আর আধ্যাত্মিক বিকাশের জায়গা আমরা কেড়ে নিয়েছি। তাই প্রতিটি পাড়ায় খেলার মাঠগুলো উদ্ধার করা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো, লাইব্রেরি আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটানো ছাড়া এই অন্ধ কুয়ো থেকে ফেরার আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। এই আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের মুখে কোনো ফাঁপা স্লোগান নয়, একমাত্র কঠিন সত্য উচ্চারিত হওয়া উচিত যে রাষ্ট্রের সৎ সদিচ্ছা, ইসলামের সুমহান নৈতিক আদর্শ আর যুবসমাজের দ্রোহের যুগলবন্দিতেই কেবল এই উর্বর মাটিকে আমরা মেকি সুখের মরণব্যাধি থেকে মুক্ত করতে পারি। লেখক: উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা আসিফা