রথযাত্রা: বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্ত যাত্রা
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
আজ বৃহস্পতিবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালিত হবে। প্রতি বছরের আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে শুরু হওয়া এই রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়; হাজার বছরের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক দর্শন, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীক। রথের চাকা যেমন অবিরাম ঘুরে চলে, তেমনি ঘুরে চলে মানুষের বিশ্বাস, সভ্যতার ইতিহাস এবং আত্মশুদ্ধির পথ।
বর্তমান বিশ্বে মানুষ অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে একাকীত্ব, মানসিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সামাজিক বিভাজন এবং নৈতিক অবক্ষয়। এমন বাস্তবতায় রথযাত্রার মতো ধর্মীয় উৎসব কেবল ভক্তির নয়, মানবিক জাগরণেরও উপলক্ষ হয়ে ওঠে।স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত আছে, উৎকলের রাজা ইন্দ্রদ্যু¤œ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে একটি মহামন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
পরবর্তীতে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়ে বিশ্বকর্মার মাধ্যমে দেববিগ্রহ নির্মাণের আয়োজন করা হয়। শর্ত ছিল, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেউ দরজা খুলবেন না। কিন্তু রানীর কৌতূহলে সেই শর্ত ভঙ্গ হয়। ফলে অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই মূর্তি নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। সেই অসম্পূর্ণ রূপেই প্রতিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা।এই অসম্পূর্ণতাই রথযাত্রার অন্যতম গভীর দর্শন। সমাজে আমরা মানুষকে বিচার করি বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় দিয়ে। অথচ জগন্নাথদেবের মূর্তি যেন ঘোষণা করেÑপূর্ণতা বাহ্যিক নয়, অন্তরের। ঈশ্বর মানুষের বাহ্যিক রূপ নয়, হৃদয়ের ভক্তি দেখেন।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক সমাজে এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রথযাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার স্মৃতিও। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, গোপীদের মুখে কৃষ্ণের প্রেম ও লীলাকথা শুনে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা এমন এক ভাবাবেশে আপ্লুত হন যে তাঁদের চোখ বিস্ফারিত হয়, হাত গুটিয়ে যায় এবং শরীর এক বিশেষ ভঙ্গিমা ধারণ করে। সেই রূপই আজকের জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার প্রতীকী মূর্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এর প্রতীকী অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণÑঈশ্বরের প্রেম মানুষের চেতনাকে বদলে দিতে পারে।রথযাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সমতা। রথ টানার সময় সেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চবর্ণ-নি¤œবর্ণ কিংবা নারী-পুরুষের আলাদা কোনো পরিচয় থাকে না। সবাই একই দড়িতে হাত রাখে। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়; বরং সামাজিক সমতার এক জীবন্ত প্রতীক।আজ যখন বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বাড়ছে, তখন রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñসমাজের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সবাই একই লক্ষ্যে একসঙ্গে এগিয়ে যায়।
রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা পরিবারÑকোনো ক্ষেত্রেই বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি ও বহু ঐতিহ্যের দেশ। এখানে দুর্গাপূজা, রথযাত্রা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন, ঈদÑসবই জাতীয় জীবনের অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই রথযাত্রা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনারও প্রতীক।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষেরও সতর্ক থাকা জরুরি।রথের আরেকটি তাৎপর্য হলোÑঈশ্বর মানুষের কাছে আসেন। সাধারণত মানুষ মন্দিরে যায় ঈশ্বরের দর্শনে। কিন্তু রথযাত্রায় জগন্নাথদেব নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে মানুষের দ্বারে আসেন। এই প্রতীকী ঘটনা আমাদের শেখায়, ধর্ম মানুষের জন্য; মানুষ ধর্মের জন্য নয়। প্রকৃত ধর্ম মানুষের কষ্ট লাঘব করে, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, মানুষকে বিভক্ত নয়Ñঐক্যবদ্ধ করে।বিশ্বায়নের যুগে অনেকেই মনে করেন ধর্মের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।
বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই মানসিক শান্তির সন্ধান করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের ভোগ বাড়াতে পারে, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। রথযাত্রার মতো উৎসব মানুষকে সামষ্টিক আনন্দ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আত্মিক প্রশান্তির অনুভূতি দেয়।জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার এই সময়ে মানুষ নতুন করে আশা খুঁজছে। রথযাত্রা সেই আশারই প্রতীক। রথের চাকা যেমন থেমে থাকে না, তেমনি মানুষের সংগ্রামও থেমে থাকে না। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই মানুষ এগিয়ে যায়।
আজ আমাদের সমাজে নৈতিক সংকট স্পষ্ট। দুর্নীতি, প্রতারণা, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন, পরিবেশ ধ্বংসÑএসব সমস্যা কেবল আইন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, আত্মসংযম ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। ধর্মীয় উৎসবগুলো যদি মানুষকে আরও মানবিক হতে উদ্বুদ্ধ করে, তবেই সেগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হবে।রথযাত্রার দড়িতে হাজারো মানুষের সম্মিলিত টান আমাদের আরেকটি বড় শিক্ষা দেয়Ñসমষ্টিগত প্রচেষ্টাই বড় পরিবর্তনের শক্তি। একটি রথ একা কেউ টানতে পারে না। ঠিক তেমনি একটি দেশও একক কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগোতে পারে না।
প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি।রথযাত্রা সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গান, কীর্তন, শঙ্খধ্বনি, ঢাক, উৎসবমুখর পরিবেশÑসব মিলিয়ে এটি একটি লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। নগরায়ণ ও আধুনিকতার চাপে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রথযাত্রা এখনো মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সব ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদার সঙ্গে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদেরও উচিত সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। ধর্মকে যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিভাজন বা বিদ্বেষের হাতিয়ার হতে না দেওয়া হয়।রথের চাকা ঘোরে। সেই চাকার ঘূর্ণনে লুকিয়ে আছে সময়ের দর্শন। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, উত্থান-পতনÑসবই জীবনের অংশ। তাই অহংকার নয়, বিনয়; বিভাজন নয়, ঐক্য; ঘৃণা নয়, ভালোবাসাÑএই মূল্যবোধই আমাদের ধারণ করতে হবে। রথযাত্রা আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার মানবিকতা। যে সমাজে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সম্মান করে, অন্যের অধিকারকে নিজের দায়িত্ব মনে করেÑসেই সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য।
বৃহস্পতিবারের এই পবিত্র রথযাত্রা তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মশুদ্ধির আহ্বান, সামাজিক সংহতির বার্তা এবং মানবিকতার উৎসব। রথের চাকা যেমন অনন্ত গতির প্রতীক, তেমনি মানুষের বিবেকও যেন চিরজাগ্রত থাকে। বিশ্বাসের এই যাত্রা আমাদের নিয়ে যাক এমন এক সমাজের দিকে, যেখানে ধর্ম হবে সম্প্রীতির, মানুষ হবে মানুষের, আর বাংলাদেশ হবে বৈচিত্র্েযর মধ্যেও ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রথের দড়িতে হাত রাখা কেবল একটি আচার নয়; এটি প্রতীকীভাবে সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারই হোক এবারের রথযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
লেখক: সংবাদকর্মী









