শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা প্রয়োজন
প্রকাশ ঘোষ বিধান
শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। শব্দদূষণ মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শব্দদূষণের কারণে শুধু শ্রবণশক্তিই নয়, উচ্চরক্ত চাপ, মাথাধরা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, অনিদ্রাসহ নানা রকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত শব্দদূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা নষ্ট হয়, সন্তানসম্ভবা মায়েদের যেকোনো ধরনের উচ্চ শব্দ মারাত্মক ক্ষতিকর।
শব্দদূষণ স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি অন্যতম কারণ। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে ৩০টি কঠিন রোগ হতে পারে। শব্দদূষণে দুশ্চিন্তা, অবসাদ, উদ্বিগ্নতা, নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়। যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস। ১৯৯৬ সালে সেন্টার ফর হিয়ারিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য হল মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের উপর শব্দের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। শব্দ বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে প্রভাবিত করে। শব্দদূষণের কারণে মানুষের শ্রবণমতা কমে যায়। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে ৮৫ ডেসিবেল শব্দ যদি কোনো ব্যক্তির কানে প্রবেশ করে তাহলে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি নষ্ট হবে। ১২০ ডেসিবেল শব্দ সঙ্গেই সঙ্গে কান নষ্ট করে দিতে পারে। হঠাৎ উচ্চশব্দের কারণে হৃদরোগীদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুও হতে পারে।
শব্দদূষণ প্রচলিত আইনের পরিপন্থি। অথচ এ আইনের তোয়াক্কা কেউ করে না। আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে, ফলে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। শব্দদূষণ কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত শব্দদূষণের মাত্রা ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবলের কথা উল্লেখ থাকলেও ঢাকাসহ বড় বড় শহরে শব্দদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। মানুষের কানের স্বাভাবিক শ্রবণ ক্ষমতার চেয়ে কমপক্ষে ১০ গুণের বেশি শব্দ শোনা লাগছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত হয় মানুষের কান। শব্দদূষণ মানুষের কানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উচ্চ শব্দে মানুষ যদি বেশি সময় ধরে থাকে, সে সাময়িকভাবে বধির হয়ে যেতে পারে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ আমাদের দৈনন্দিন অনেক কাজ, অহেতুক হর্ন বাজানো বা উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার করার মতো অভ্যাসের মাধ্যমেই এই দূষণ বেশি ছড়ায়। আবাসিক এলাকায় ৪৫-৫৫ ডেসিবল এবং বাণিজ্যিক এলাকায় ৬০-৭০ ডেসিবলের বেশি শব্দ মানব স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধকরণ, আবাসিক এলাকায় উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার রোধ, এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
চালকদের অহেতুক বা উচ্চশব্দের হর্ন না বাজাতে সচেতন করা এবং হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার থেকে বিরত রাখা। বিয়ে, কনসার্ট, সভা-সমাবেশ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের পরিবর্তে কম শব্দের প্রযুক্তি ব্যবহার করা। গণমাধ্যম, বিলবোর্ড, লিফলেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সজাগ করা।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করা এবং নীরব এলাকা থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে শব্দ না করার নিয়ম মানতে উৎসাহিত করা। বিশেষ করে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো নীরব এলাকায় হর্ন না বাজানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে ড্রাইভার ও সাধারণ নাগরিকদের উৎসাহিত করতে হবে। শব্দদূষণ রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে তরুণদের সম্পৃক্ত করা।
উচ্চমাত্রার শব্দ শুধু কানের ক্ষতি করে না, এটি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং শিশুদের মানসিক বিকাশেও বাধা দেয়। এই বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে জানানো হলে তারা সচেতন হবে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন যথেষ্ট নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতাই প্রধান চাবিকাঠি। নিজের সুস্থতার স্বার্থেই শব্দ উৎপাদনকারী কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা ও মানসিক চাপের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবল শব্দসীমা মানা। গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ করা এবং নীরব এলাকায় হাসপাতাল, স্কুল এলাকায় শব্দ না করার বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস, যেমন অহেতুক হর্ন বাজানো বা উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার করা এই দূষণের প্রধান উৎস। এটি একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত, যা কেবল শ্রবণশক্তিই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অপরিহার্য। সঠিক সচেতনতা ও আইনের প্রয়োগ ছাড়া এই নিরব ঘাতক থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও পদক্ষেপ শব্দদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শুধুমাত্র হর্ন বাজানো কমানোর মাধ্যমেই শব্দদূষণ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে হর্ন বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বাড়িঘরে টিভি বা রেডিওর শব্দ সীমিত রাখা এবং সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে মাইক বা লাউড স্পিকার ব্যবহার না করা। শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রে সাইলেন্সার বা শব্দ নিরোধক ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত জেনারেটর বা গাড়ির নিয়মিত পরিচর্যা করা। রাস্তার দুই পাশে বা জনবহুল এলাকায় ঘন গাছপালা লাগানো শব্দ শোষণে সহায়তা করে এবং দূষণ কমায়।
শব্দদূষণ শুধু শ্রবণের ক্ষতিই করে না, বরং উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতাও তৈরি করে। তাই সুস্থ ও শান্তিময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রত্যেকের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশনা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংযমী হয়ে শব্দদূষণ প্রতিরোধে সাধারণ জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট






