সম্পাদকীয়/ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার ও কার্যকর সুরক্ষার তাগিদ
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের মতো নিত্যনৈমিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার সার্বিক জীবনযাত্রার ওপর গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ শহরের বস্তিগুলোতে মাথা গুঁজে কোনোরকমে বেঁচে থাকার আকুল চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), প্রান ও স্বদেশের যৌথ গবেষণায় যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অনভিপ্রেত। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের ৭৪.৯ শতাংশই তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি চরম খাদ্যাভাবের কারণে এসব পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি (৫২.২%) মানুষকে পুরো একদিন অনাহারে থাকতে হয়েছে।
উপকূলীয় সাতক্ষীরার লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার। দুর্যোগের মুখে এসব পরিবারের ৪১.১১ শতাংশ মানুষ আবাদি জমি হারিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, খাদ্য ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৭.৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল পাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র ২০২১’ গ্রহণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তার সুফল এখনো উপকূলের প্রান্তিক বস্তিবাসীদের দোড়গোড়ায় পৌঁছেনি। বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠী নিরাপদ আবাস, পুষ্টিকর খাবার, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে আজ বঞ্চিত।
জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির ফলে সৃষ্ট এই খাদ্য অনিরাপত্তা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়; এটি দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার স্পষ্ট ঘাটতি ও ব্যর্থতা নির্দেশ করে। সাতক্ষীরা শহরের বস্তিগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করা মানুষগুলোকে কেবল উন্নয়ন কর্মসূচির পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে নিরাপদ বাসস্থান, পুষ্টিকর খাদ্য ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
স্বস্তির বিষয় হলো, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা এই দুর্দশার বিষয়ে অবহিত হয়েছেন এবং বস্তিবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা ও নীতিগত সুবিধা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কেবল আমলাতান্ত্রিক আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে যোগ্য পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার তালিকা দ্রুত আপডেট করা, খাসজমি বণ্টন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বস্তি এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই সুব্যবস্থা করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের জীবিকা পুনর্গঠন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল অগ্রাধিকার। জাতীয় নীতি ও স্থানীয় বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান দূর করে একটি সমন্বিত, মানবিক ও সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন দুর্যোগে নিঃস্ব হওয়া প্রতিটি মানুষ খাদ্যের মৌলিক অধিকার ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা পায়।












