সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ও উপকূলবাসীর আতঙ্ক
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ সংস্কার একটি বার্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ৬৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে বছরজুড়ে মেরামতের কাজ চলাই স্বাভাবিক হলেও, বাস্তবতা হলো এক জায়গায় সংস্কার শেষ হতে না হতেই অন্য অংশে দেখা দিচ্ছে নতুন ভাঙন। জোয়ার-ভাটার নোনা পানির সঙ্গে জীবনযুদ্ধ চালানো উপকূলবাসীর জীবনের এমন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সম্প্রতি পাউবোর দুটি বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও পদ্মপুকুরসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বিশাল অংশ অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ। পাউবো কর্তৃপক্ষের দাবি, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত জোয়ারের চাপের কারণে বাঁধ ভেঙে যাওয়া একটি অবিনশ্বর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। প্রাকৃতিক কারণকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, স্থানীয়দের অভিযোগকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সংস্কারকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, প্রকৌশলগত ত্রুটি, জিওব্যাগ স্থাপনে গাফিলতি এবং সময়মতো যথাযথ তদারকির অভাবে টেকসই বাঁধ তৈরি হচ্ছে না—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সংস্কার শেষ হতে না হতেই বাঁধ ধসে পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, কেবল জরুরি বরাদ্দ এনে তড়িঘড়ি কাজ সারাই সমস্যার সমাধানের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় ঘটছে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষি, মৎস্যঘের ও বসতবাড়ি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। প্রতিনিয়ত ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোর আর্থসামাজিক জীবন স্থবির হয়ে পড়ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলকে টেকসই সুরক্ষার আওতায় আনতে হলে সাময়িক তালিযুক্ত সংস্কার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে কেবল বাঁধ উঁচু করা বা জিওব্যাগ ফেলাই নয়, ভৌগোলিক রূপরেখা ও নদীর গতিপথ বিশ্লেষণ করে মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে আধুনিক ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অপরিহার্য। উপকূলীয় লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পাউবো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দায়বদ্ধ পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।









