সাংবাদিকতা: আমরা কোমন সাংবাদিক চাই?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন সাংবাদিকের হাতে থাকে তথ্য, প্রশ্ন করার সাহস এবং জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব। কিন্তু যখন এই পেশার সঙ্গে নানা ধরনের স্বার্থ, পরিচয়, প্রভাব কিংবা অনৈতিক কর্মকা- জড়িয়ে পড়ে, তখন সাংবাদিকতার মূল চেহারাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়Ñকে প্রকৃত সাংবাদিক, আর কে কেবল সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছে?
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিচয়ের পরিধিও বেড়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অনলাইন গণমাধ্যমের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা সংবাদ প্রকাশকে গণতান্ত্রিক করেছে বটে, কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে এক নতুন সংকট। সাংবাদিকতার পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের চেয়ে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিক এবং নামধারী সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আজ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের মূল পরিচয় সাংবাদিকতা নয়, কিন্তু গলায় একটি পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে কিংবা একটি ছোট্ট অনলাইন পোর্টালের নাম ব্যবহার করে তারা সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে চান। কোথাও কোথাও সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, তদবির কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের অভিযোগও শোনা যায়। এ ধরনের কর্মকা- শুধু আইনবিরোধী নয়, এটি প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মানকেও ক্ষুণœ করে।
আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সাংবাদিকতার চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া। কেউ প্রেসক্লাবের পরিচয়কে সাংবাদিকতার সমার্থক মনে করেন, কেউ আবার বিভিন্ন সংগঠনের পদ-পদবি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি কোনো পদ নয়; মূল শক্তি হচ্ছে মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশের সাহস।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণও সাংবাদিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একটি অংশ প্রকাশ্যে বা নীরবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে ফেলছে। মতাদর্শ থাকা দোষের নয়; কিন্তু সংবাদ পরিবেশনে যদি নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়, তাহলে সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না, সেটি প্রচারণায় পরিণত হয়।
সংবাদ ও মতামতের এই সীমারেখা মুছে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ পাঠক। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আরেক ধরনের সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য প্রকাশ, গুজবকে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন কিংবা অনুমানকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দ্রুত হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় নির্ভুল হওয়ার দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হলো সত্যতা যাচাই। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে।
দেশে এখনো এমন বহু সাংবাদিক আছেন, যারা নীরবে কাজ করে চলেছেন। তারা প্রচারের আলোয় আসেন না, সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের প্রচারণায় ব্যস্ত থাকেন না। কিন্তু মানুষের সমস্যা তুলে ধরেন, দুর্নীতি উন্মোচন করেন, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করেন এবং ঝুঁকি নিয়েও সত্য প্রকাশ করেন। অনেক সময় তাদেরই হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়। তবুও তারা নীতি থেকে সরে যান না। প্রকৃত অর্থে তারাই সাংবাদিকতার প্রাণশক্তি। সাংবাদিকতার সংকট তাই কেবল ব্যক্তির সংকট নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, নীতিমালা ও পেশাগত সংস্কৃতিরও সংকট।
অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও দায়িত্বশীল করা, সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং নৈতিকতা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমাজকে ঠিক করতে হবে তারা কেমন সাংবাদিক চায়।
এমন সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতার কাছে নতজানু নন; যিনি ব্যক্তিস্বার্থের জন্য কলম বিক্রি করেন না; যিনি সত্যের সঙ্গে আপস করেন না; যিনি মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং তথ্যকে অস্ত্র নয়, দায়িত্ব হিসেবে ব্যবহার করেন। সাংবাদিকের পরিচয় কোনো আইডি কার্ডে সীমাবদ্ধ নয়, কোনো প্রেসক্লাবের সদস্যপদেও নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সততা, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থে নির্ভীক অবস্থান।
সমাজের প্রয়োজন সেই সাংবাদিক, যিনি খবরের আড়ালের সত্য খুঁজে বের করবেন, মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন এবং গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আজ যখন সাংবাদিকতার নানা রকম পরিচয় নিয়ে আলোচনা হয়, তখন শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেÑআমরা কি সংখ্যায় বেশি সাংবাদিক চাই, নাকি মানে বড় সাংবাদিক? কারণ একটি সমাজকে বদলে দিতে শত সাইনবোর্ডধারী সাংবাদিক নয়, একজন সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকই যথেষ্ট।
লেখক: সংবাদকর্মী









