সাংবাদিকতা কি ভয়মুক্ত?/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
যাঁরা কথায় কথায় বলেন, দেশে এখন স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ চলছে, সবাই নাকি মন খুলে কথা বলতে পারছেন, তাঁদের কাছে একটি সরল প্রশ্ন রাখা যায়-এই কি সেই স্বাধীনতা? স্বাধীন সাংবাদিকতার অর্থ শুধু সংবাদ প্রকাশের সুযোগ থাকা নয়। এর অর্থ হলো ভয়, চাপ, হুমকি কিংবা হামলার আশঙ্কা ছাড়াই একজন সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধান করতে পারবেন, প্রশ্ন করতে পারবেন এবং জনগণের সামনে তথ্য তুলে ধরতে পারবেন। সংবাদকর্মী যখন কোনো ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন, তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হুমকি পান কিংবা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তখন স্বাধীন সাংবাদিকতার বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
সাংবাদিকের হাতে অস্ত্র থাকে না। থাকে কলম, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব। তাঁর শক্তি কোনো পেশিশক্তি নয়; তথ্য ও জনস্বার্থ। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জানার অধিকার।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা জ্ঞান, যুক্তি, মতবিনিময় ও মুক্ত চিন্তার জায়গা। সেখানে সাংবাদিকেরা যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি শুধু ক্যাম্পাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন ওঠে, মতের ভিন্নতা ও সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে আমরা কী ধরনের আচরণ করছি? কোনো সংবাদ পছন্দ না হলে তার প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। কোনো তথ্য ভুল মনে হলে সংশোধনের দাবি তোলার অধিকার আছে।
সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে তার জবাব দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু হামলা, হুমকি বা ভয় দেখানো কোনোভাবেই সেই জবাবের বিকল্প হতে পারে না। সমস্যাটি এখানেই। আমরা অনেক সময় সংবাদকে নিজের পক্ষে বা বিপক্ষে হিসেবে দেখতে শুরু করি। যে সংবাদ নিজের পছন্দের, সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করি; আর যে সংবাদ অস্বস্তি তৈরি করে, সেটিকে সাংবাদিকের অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। এই মানসিকতা সাংবাদিকতার জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সমাজের জন্যও।
একজন সাংবাদিক যদি মনে করেন, একটি তথ্য প্রকাশ করলে তাঁর ওপর হামলা হতে পারে, কোনো পক্ষ তাঁকে হুমকি দিতে পারে কিংবা তাঁর ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হতে পারে, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন না। তখন তৈরি হয় আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি। সাংবাদিক হয়তো কিছু তথ্য জানেন, কিন্তু ঝুঁকি এড়াতে তা প্রকাশ করেন না। সংবাদ প্রকাশের আগে বারবার ভাবেন, কারও অসন্তোষ হবে কি না। এভাবে সরাসরি সেন্সরশিপ ছাড়াও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। এ কারণেই সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়। এটি নাগরিকেরও দাবি। কারণ সংবাদমাধ্যম দুর্বল হলে সাধারণ মানুষও তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।ক্যামেরাকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। ক্যামেরা কোনো অপরাধের হাতিয়ার নয়। ক্যামেরা একটি ঘটনার সাক্ষ্য ধারণ করে। কোনো সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, অনিয়ম, সহিংসতা কিংবা মানুষের দুর্ভোগ-সবকিছুর বাস্তব চিত্র ক্যামেরায় উঠে আসতে পারে।
সেই ছবি কখনো কারও জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু অস্বস্তিকর সত্যকে আড়াল করার জন্য ক্যামেরার ওপর হামলা করা হলে সত্যটি কি মুছে যায়? যায় না। বরং প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে। আমাদের মনে রাখা দরকার, সাংবাদিকতা কারও প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ নয়। এটি একটি পেশা এবং একই সঙ্গে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব। সংবাদকর্মীরও ভুল হতে পারে। কোনো প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকতার নামে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ থাকলে আইনগত ও পেশাগত প্রক্রিয়ায় তার প্রতিকার হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিকার কখনো হামলা বা ভয় দেখানো হতে পারে না।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই বলা নয়। তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, গুজব এড়িয়ে চলা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকাÑএসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা যত বাড়বে, তার স্বাধীনতার সামাজিক ভিত্তিও তত শক্ত হবে। তবে সাংবাদিকের ভুলকে অজুহাত বানিয়ে তাঁর ওপর হামলা বৈধ হয়ে যায় না। একজন চিকিৎসকের ভুলের অভিযোগ থাকলে চিকিৎসককে মারধর করা যায় না, একজন শিক্ষকের সঙ্গে মতবিরোধ হলে তাঁকে হুমকি দেওয়া যায় না। একইভাবে সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তার উত্তর দিতে হবে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় প্রায়ই কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তদন্তের দাবি ওঠে। এরপর বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। এতে অপরাধীর মনে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ বিচার না হলে পরবর্তী হামলার ঝুঁকি থেকেই যায়। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন, কাল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক হতে পারেন। তার পরদিন কোনো স্থানীয় সংবাদকর্মী, ফটোসাংবাদিক বা নাগরিক সাংবাদিকও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।
ভয় যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তার প্রভাব সংবাদকক্ষের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তখন প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তথ্য দিতে ভয় পায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই ভয় কমানো দরকার, বাড়ানো নয়। সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে শুধু একজন সংবাদকর্মীকে থামানোর চেষ্টা নয়; এর মাধ্যমে একটি ঘটনার সত্য প্রকাশের পথও সংকুচিত করা হয়। ক্যামেরায় হামলা মানে শুধু একটি যন্ত্র ভাঙা নয়; এর সঙ্গে জনগণের জানার অধিকারের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
কলম থামিয়ে দিলে কাগজ সাদা থাকে, কিন্তু সমাজের সমস্যাগুলো সাদা হয়ে যায় না। বরং অন্ধকারে থেকে যায়।তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ চলছে কি নাÑএমন দাবি করার আগে আমাদের দেখতে হবে সাংবাদিক কতটা নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারছেন, কতটা স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো দয়া নয়, কোনো বিশেষ সুবিধাও নয়। এটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা ভয়মুক্ত থাকলেই সমাজ নিজের বাস্তব চেহারাটি দেখতে পারে। অতীতে সাংবাদিক নির্যাতন অন্যায় ছিল, আজও অন্যায়, ভবিষ্যতেও অন্যায় থাকবে। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদ শুধু সাংবাদিকদের করতে হবেÑএমন ভাবার সুযোগ নেই। এটি প্রত্যেক নাগরিকের প্রশ্ন হওয়া উচিত: সত্য বলার জন্য যদি সাংবাদিককে ভয় পেতে হয়, তাহলে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি, সেই স্বাধীনতা আসলে কতটা স্বাধীন?
লেখক: সংবাদকর্মী









