বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

সাতক্ষীরা-যশোর সীমান্তে জমে উঠেছে সর্ববৃহৎ আমবাজার ‘বেলতলা’, দাম নিয়ে চাষিদের হতাশা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরা-যশোর সীমান্তে জমে উঠেছে সর্ববৃহৎ আমবাজার ‘বেলতলা’, দাম নিয়ে চাষিদের হতাশা

শেখ জিল্লু, কলারোয়া: সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার প্রবেশদ্বার কলারোয়া উপজেলার কিসমত ইলিশপুর এবং শার্শা উপজেলার বাগুড়ি (বেলতলা) এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ আমের বাজার ‘বেলতলা আমবাজার’। যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০০টি আড়ত নিয়ে ভিন্ন জেলা ও উপজেলার ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে মিলেমিশে এই বাজারটি পরিচালনা করে আসছেন। মধুমাসের এই মৌসুমে পাইকার ও বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে এখন জমজমাট পুরো এলাকা। এছাড়া কলারোয়া উপজেলার সিংগা গ্রামেও আমের আরেকটি পাইকারি বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততা দেখা গেছে।

শনিবার সরেজমিনে বেলতলা আমবাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের মানসম্মত আমের বিপুল সমাহার। বাজারে আসা আমের সিংহভাগই হিমসাগর। পাশাপাশি গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, গোপালভোগ, গোপালখাস ও বৈশাখীসহ স্থানীয় জাতের পুষ্ট ও পরিপক্ব আম পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাজারে আমের ভালো দাম না পাওয়ায় আম চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে।

কৃষি বিভাগের আম সংগ্রহের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আগামী ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া আম গাছ থেকে নামানোর কথা থাকলেও, বাজারে এখনই অল্প পরিমাণে এই আম দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সামনে ঈদুল আজহা থাকায় এবং ঈদের সময় কয়েকদিন বাজার বন্ধ থাকতে পারেÑএই আশঙ্কায় অনেক চাষি আগাম পরিপক্ব হওয়া ল্যাংড়া আম বাজারে নিয়ে আসছেন। ঈদের পর এই আম পুরোদমে বাজারে নামলে বেচাবিক্রি আরও জমজমাট হবে এবং সবশেষে আসবে আম্রপালি।

ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে প্রতিদিন এই বাজার থেকে ৫০ মেট্রিক টনেরও বেশি আম ট্রাকযোগে ঢাকা, কানসাট, চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে।

বেলতলা পাইকারি আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বাজারের বেচাকেনা শেষ হয়। আমের গুণগত মানকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”

সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার বলেন, “এবার ফলন ভালো হওয়ায় দাম কিছুটা কম। হিমসাগর আম মানভেদে প্রতি মণ ১,৪০০ থেকে ১,৮০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশি জাতের আম ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে যাতে কোনো রাসায়নিকযুক্ত বা অপরিপক্ব আম না ওঠে, সে বিষয়ে আড়তদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” কাজীরহাট ফল ভা-ার, মা এন্টারপ্রাইজ ও বিজয় এন্টারপ্রাইজসহ বেশ কিছু আড়তে এখন আমের উপচে পড়া ভিড়।

এদিকে কেমিক্যালযুক্ত ও অপরিপক্ব আম বাজারজাতকরণ রোধে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম নিয়মিত আড়তগুলো পরিদর্শন করছেন। তিনি বলেন, “কৃষি অধিদপ্তরের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে বলা হয়েছে। কেমিক্যাল মেশানো আম বিক্রির বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা অব্যাহত থাকবে।”

উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার কলারোয়ায় ৬৫৮ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭,২৩৮ মেট্রিক টন, যা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে।

উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা জিয়াউল হক জানান, আমের বাজারদর কম থাকায় মোট বেচাবিক্রির আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। তবে এখান থেকে বিদেশে আম রপ্তানি শুরু হলে চাষিদের হতাশা কেটে যাবে এবং তারা ভালো দাম পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Ads small one

সংস্কৃতি, অর্থনীতি, চিংড়ি শিল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার জেলা সাতক্ষীরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতি, অর্থনীতি, চিংড়ি শিল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার জেলা সাতক্ষীরা

শ্যামল শীল

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সাতক্ষীরা। খুলনা বিভাগের অন্তর্গত এই উপকূলীয় জেলা দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন ও সীমান্ত বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বিশাল অংশ, বিস্তীর্ণ নদ-নদী, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বনাঞ্চল, দেশের অন্যতম বৃহৎ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের কারণে সাতক্ষীরা আজ দেশ-বিদেশে সুপরিচিত।

জেলার উত্তরে যশোর, পূর্বে খুলনা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও ভোমরা স্থলবন্দরকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যে সাতক্ষীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হলেও এখানকার মানুষ সংগ্রাম করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছেন।

সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পরিচয় বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন। শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী ও নীলডুমুরসহ বিভিন্ন পর্যটন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, শুশুক, বানর এবং শত শত প্রজাতির পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এই বন শুধু জীববৈচিত্র্যের ভান্ডারই নয়, বরং উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে।

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি চিংড়ি শিল্প। বাগদা ও গলদা চিংড়ি উৎপাদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা “সাদা সোনার জেলা” নামে পরিচিত। জেলার হাজার হাজার কৃষক, মৎস্যচাষি ও উদ্যোক্তা এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এখানকার উৎপাদিত চিংড়ি ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কাঁকড়া, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ সম্পদের উৎপাদনও জেলার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।

কৃষিতেও সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এখানকার হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, আম্্রপালি ও ফজলি আম দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে সাতক্ষীরার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। এছাড়া সুন্দরবনের খাঁটি মধু, গোলপাতা, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, জমিদার বাড়ি, দিঘি ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ, দেবহাটার ঐতিহাসিক স্থাপনা, শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, কলারোয়ার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং ভোমরা স্থলবন্দর জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি মোজাফফর গার্ডেন, লেকভিউ, নদীবেষ্টিত প্রাকৃতিক পরিবেশ, সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।

শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নেও সাতক্ষীরার মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত অসংখ্য কৃতী ব্যক্তি এই জেলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা একটি সমৃদ্ধ জনপদ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় এই জেলায়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও এখানকার মানুষ কৃষি, মৎস্য ও জীবিকার নতুন নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, নিরাপদ সুপেয় পানি, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটনের সম্প্রসারণ, সীমান্ত বাণিজ্যের প্রসার এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সাতক্ষীরা প্রতিনিয়ত নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ও আধুনিক জেলায় পরিণত হবে।
প্রকৃতি, সুন্দরবন, চিংড়ি শিল্প, সুস্বাদু আম, খাঁটি মধু, নদ-নদী, উপকূলীয় সৌন্দর্য, সীমান্ত বাণিজ্য এবং সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র-সবকিছু মিলিয়ে সাতক্ষীরা সত্যিই বাংলাদেশের গর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র।

লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা।

 

মোবাইলের নানান দিক: উপকারের চেয়ে ক্ষতিই কি বেশি? ধ্বংসের পথে কিশোর-যুবসমাজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৭ অপরাহ্ণ
মোবাইলের নানান দিক: উপকারের চেয়ে ক্ষতিই কি বেশি? ধ্বংসের পথে কিশোর-যুবসমাজ

লেখকের পাঠানো ছবি

মোঃ নাজির হোসেন

 

প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। একসময় মোবাইল ছিল কেবল দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সেই মোবাইলই হয়ে উঠেছে ক্যামেরা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ব্যাংক, বাজার, পাঠশালা, অফিস ও বিনোদনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। একটি ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তথ্য মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এই প্রযুক্তির সুবিধা আমরা কতটা গ্রহণ করছি, আর এর অপব্যবহারে কতটা ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

বিশেষ করে কিশোর ও যুবসমাজের দিকে তাকালে বিষয়টি উদ্বেগজনক। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে মোবাইল নিজে সমস্যার মূল নয়; সমস্যার বড় অংশ তৈরি হয় অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যহীন ব্যবহারে।

প্রয়োজনের প্রযুক্তি যখন নেশায় পরিণত হয়:
প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচানোর কথা। অথচ মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক কিশোর-তরুণের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকলেও চোখ আটকে থাকে স্ক্রিনে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কয়েক মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভ্যাস কখন যে ঘণ্টায় পরিণত হয়, অনেকেই বুঝতে পারেন না।

একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট-এভাবেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ পিছিয়ে যায়। সময় ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে তৈরি হয় নির্ভরশীলতার প্রবণতা।

মোবাইল গেম: বিনোদন থেকে আসক্তি:
মোবাইল গেম শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সীমিত সময় বিনোদনের জন্য গেম খেলা ক্ষতিকর না হলেও দীর্ঘ সময় গেমিংয়ের অভ্যাস উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অনেক কিশোর পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেমে ব্যস্ত থাকে। রাত জেগে গেম খেলার কারণে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। পরদিন স্কুল-কলেজে মনোযোগ কমে যায়, পড়াশোনায় অনীহা তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন জীবনেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।

কখনো কখনো গেমের ভেতরের প্রতিযোগিতা, পুরস্কার ও অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ বাস্তব জীবনের লক্ষ্যকেও আড়াল করে দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: যোগাযোগ বাড়ছে, নাকি দূরত্ব?:
মোবাইলের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। বিদেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, খবর জানা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা শিক্ষামূলক তথ্য পাওয়া—এসব নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা।

কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের বাস্তব সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বলও করতে পারে। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত থাকেন-এ দৃশ্য এখন অস্বাভাবিক নয়।

‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, ‘শেয়ার’ ও অনুসারীর সংখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা অনেক তরুণের মধ্যে অন্যের জীবন ও নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অশিক্ষা ও ঝরে পড়ার পেছনে মোবাইল কতটা দায়ী?:
কিশোরদের শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার জন্য শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। দারিদ্র্য, পারিবারিক সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যালয় থেকে দূরত্ব এবং সামাজিক নানা কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এসব সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিনোদনমূলক কনটেন্ট, গেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে, তাহলে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
অতএব, মোবাইলকে একমাত্র কারণ না বানিয়ে মোবাইল ব্যবহারের ধরনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অশ্লীল ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ঝুঁকি:
ইন্টারনেটের বিশাল জগতে ভালো কনটেন্টের পাশাপাশি ক্ষতিকর কনটেন্টও রয়েছে। বয়স-অনুপযোগী ভিডিও, সহিংসতা, অশ্লীলতা, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ও নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য কিশোরদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারে।

কৌতূহলী বয়সে কোনো শিশু বা কিশোর যদি নিয়মিত অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসে, তার চিন্তাভাবনা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া সমাধান নয়; তাকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানোও জরুরি।

ভুয়া তথ্যের ভয়াবহতা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য পাওয়া সহজ, কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়। গুজব, ভুয়া সংবাদ, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক কিশোর-তরুণ যাচাই না করেই কোনো পোস্ট বিশ্বাস করে এবং অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেয়। এতে ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে সামাজিক অস্থিরতা পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে।
তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা-কোন তথ্য বিশ্বাস করতে হবে, কোনটি যাচাই করতে হবে এবং কোনটি শেয়ার করা উচিত নয়, তা শেখানো।

ঘুম হারাচ্ছে প্রজন্ম:
মোবাইল ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাত জাগার প্রবণতা। ঘুমের সময় মোবাইল হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা কিংবা গেম খেলার অভ্যাস অনেক কিশোর-তরুণের মধ্যে দেখা যায়।

পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিক্ষার্থী হলে পড়াশোনায়ও তার প্রভাব পড়ে।

বই থেকে স্ক্রিনে:
একসময় অবসর সময়ে কিশোরদের হাতে বই, পত্রিকা কিংবা গল্পের সংকলন দেখা যেত। মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ছিল বিনোদনের অংশ।এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করেছে স্ক্রিন।
বই পড়ার অভ্যাস কমে গেলে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও ভাষার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মোবাইলের পাশাপাশি বই ও বাস্তব অভিজ্ঞতার জগতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবারে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সেখান থেকেই দায়িত্ব শুরু।

অভিভাবকদের উচিত-
★ বয়স অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা;
★ পড়াশোনা ও ঘুমের সময় মোবাইল থেকে দূরে রাখা;
★শিশু কী ধরনের অ্যাপ ও কনটেন্ট ব্যবহার করছে, তা সম্পর্কে সচেতন থাকা;
★বয়স-অনুপযোগী কনটেন্ট থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা;
★সন্তানকে ভয় দেখানোর বদলে প্রযুক্তির ভালো-মন্দ বোঝানো;
★নিজেরাও পরিবারের সামনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার না করা;
★ সন্তানকে খেলাধুলা, বই পড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োজন সচেতনতা:
বিদ্যালয় ও কলেজে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও শিক্ষা দিতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার হয়রানি, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
মোবাইল নিষিদ্ধ নয়, ব্যবহার হোক নিয়ন্ত্রিত:

মোবাইল ফোনকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আধুনিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও যোগাযোগে মোবাইলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজন হলো সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার।
শিশু-কিশোরদের বোঝাতে হবে—মোবাইল হলো একটি হাতিয়ার; এটি যেন জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে।

প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের জন্য। বিনোদন থাকবে, কিন্তু সেটি যেন জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য না হয়ে যায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়:
কিশোর-যুবসমাজকে নিরাপদ রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র-সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষা এবং ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

শেষ কথা:
মোবাইল ফোন আমাদের শত্রু নয়। এটি একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও ঝুঁকির বাহন। আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপরই নির্ভর করে এটি আমাদের উন্নতির হাতিয়ার হবে, নাকি সময় ও সম্ভাবনা নষ্ট করার কারণ হবে।

আজকের কিশোরই আগামী দিনের নাগরিক, কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়—স্মার্ট চিন্তা, সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধও তুলে দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে—
“মোবাইল আমাদের জীবনকে পরিচালনা করবে না; আমরাই মোবাইলকে পরিচালনা করব।”
প্রযুক্তির ব্যবহার হোক জ্ঞানের জন্য, সৃজনশীলতার জন্য এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য। তাহলেই মোবাইল হবে আশীর্বাদ-অভিশাপ নয়।

মোঃ নাজির হোসেন, সোনাবাড়ীয়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা।

 

আশাশুনিতে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতা কারাগারে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:১৭ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতা কারাগারে

বিএম আলাউদ্দীন, আশাশুনি: আশাশুনিতে পুলিশের অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো। গ্রেপ্তারকৃতদের বুধবার দুপুরে আদালতে প্রেরণ করা হয়।

 

এদের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও শোভনালী ইউনিয়নের সরাফপুর গ্রামের মৃত কার্তিক চন্দ্র দাশের ছেলে রাজ্যেশ্বর দাশ (৫৮) কে আশাশুনি থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দায়ের করা মামলা নং ২৪ তারিখ ২৩/০৬/২০২৬ গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

 

গ্রেপ্তার অপরজন বড়দল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বড়দল গ্রামের হাবিবুর রহমান সানার ছেলে মোঃ আল নোমানকে আশাশুনি থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দায়ের করা মামলা নং ২২ তারিখ ২১/০৬/২০২৬ তে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাদেরকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ জাহাঙ্গির আরিফ এর নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার কর করা হয়।