সাতক্ষীরায় কুকুরের উপদ্রব
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
ভাদ্র মাস এলেই সাতক্ষীরা শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার কুকুরের উপদ্রব যেন নতুন করে চোখে পড়ে। দিনের ব্যস্ত সময় থেকে শুরু করে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, বাজার, আবাসিক এলাকা এবং গ্রামীণ পথে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অসংখ্য কুকুর। পথচারী দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করা, মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহীদের পিছু নেওয়া কিংবা নির্জন রাস্তায় দলবদ্ধভাবে অবস্থান করা এখন অনেকের কাছেই নিত্যদিনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সাতক্ষীরা শহরের অনেক সড়কে চলাচলকারী মানুষকে কুকুরের দল নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কেউ হেঁটে যাচ্ছেন, কেউ মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছেন, কেউবা রাতে জরুরি কাজে বের হয়েছেন-হঠাৎ কয়েকটি কুকুর একসঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে তাড়া শুরু করলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ভয়ে কেউ দৌড় দেন, কেউ মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে দেন। আর তখনই ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
কুকুরের তাড়া খেয়ে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে আহত হওয়া কিংবা পথচারী দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। শিশু ও বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। রাতের বেলায় যারা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরেন, তাদের অনেককেই কোনো কোনো এলাকায় কুকুরের দল এড়িয়ে চলাচল করতে হয়। শহরের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন রাস্তাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়।
সাতক্ষীরার মতো একটি জেলা শহরে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এটি শুধু বিরক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি।
রাস্তার কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। শহরের বাজার, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বাসাবাড়ির খাবারের উচ্ছিষ্ট যেখানে-সেখানে পড়ে থাকা তার অন্যতম কারণ। কোনো একটি স্থানে নিয়মিত খাবার পাওয়া গেলে সেখানে কুকুরের দল জমায়েত হয়। একসময় সেই জায়গা তাদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নতুন কোনো মানুষ বা যানবাহন সেখানে প্রবেশ করলে কুকুরগুলো অনেক সময় তেড়ে আসে।
সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন বাজার ও খাবারের দোকানের আশপাশে এ ধরনের দৃশ্য কমবেশি দেখা যায়। অনেক জায়গায় দিনের পর দিন ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। খাবারের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে থাকে রাস্তার পাশে। এসব জায়গা শুধু কুকুরের জন্য নয়, মাছি, মশা, ইঁদুরসহ বিভিন্ন রোগজীবাণু বহনকারী প্রাণীরও নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। ফলে বিষয়টি নগর পরিচ্ছন্নতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
কুকুরের উপদ্রব নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ কোনো সমাধান নয়। রাস্তার কুকুরকে নির্বিচারে হত্যা করা যেমন মানবিক নয়, তেমনি কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে সমস্যাটিকে বছরের পর বছর ফেলে রাখাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাণীর জন্যও মানবিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা-এই বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা দরকার। শুধু একদিন কুকুর তাড়িয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যে এলাকায় খাবার পাওয়া যাবে, সেখানে আবার নতুন কুকুরের সমাগম ঘটবে। তাই সমস্যার মূল কারণ দূর করার দিকেও নজর দিতে হবে।
সাতক্ষীরায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কারণ রয়েছে জলাতঙ্কের ঝুঁকি। কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের পর যথাসময়ে চিকিৎসা না নিলে জলাতঙ্কের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রোগটি একবার প্রকাশ পেলে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অথচ সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় কুকুরের কামড়ের পর জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগও দেখা গেছে। কোনো কোনো সময় সরকারি হাসপাতালে টিকার সরবরাহ নিয়ে সংকটের খবর এসেছে, আবার পরবর্তীতে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথাও জানা গেছে। ফলে টিকার প্রাপ্যতা সব সময় একই রকম থাকে না। তবে বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জেলার উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা শহরের আলী মেডিকেলসহ বড় বড় ওষুধের দোকান ও ফার্মেসিতেও কুকুরে কামড়ানোর পর ব্যবহৃত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ইনজেকশন পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের টিকা বা ইনজেকশন কখন পাওয়া যাবে, তার সরবরাহ সব সময় এক রকম নাও থাকতে পারে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কুকুর কামড়ানোর পর অনেকেই বিষয়টিকে সামান্য ঘটনা মনে করেন। কেউ ক্ষতস্থানে ঘরোয়া কিছু লাগান, কেউ পরিচিত কারও পরামর্শে চিকিৎসা নেন, আবার কেউ ভাবেন সামান্য আঁচড় হয়েছে বলে টিকার প্রয়োজন নেই। এসব অবহেলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। শিশুরা অনেক সময় কুকুর দেখলে ভয় পেয়ে দৌড় দেয়, আবার কেউ কেউ কুকুরের সঙ্গে খেলতে বা তাদের কাছে যেতে চায়। রাস্তার কুকুরকে বিরক্ত করা, ঢিল ছোড়া কিংবা খাবার খাওয়ার সময় কাছে যাওয়া থেকেও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবারের পাশাপাশি স্কুল পর্যায়েও শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।
রাতের সাতক্ষীরা নিয়েও ভাবতে হবে। শহরের অনেক সড়কে পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে। অন্ধকার রাস্তার পাশে কুকুরের দল থাকলে পথচারীরা আগে থেকে তা দেখতে পান না। ফলে হঠাৎ কুকুর সামনে চলে এলে আতঙ্ক তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকার প্রয়োজনীয় স্থানে পর্যাপ্ত সড়কবাতি থাকলে মানুষের নিরাপদ চলাচল অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব।
মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বিষয়টি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। কুকুর পিছু নিলে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে দ্রুতগতিতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। শহরের ব্যস্ত সড়কে কুকুরের দল একদিকে যেমন যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, অন্যদিকে চালকদের আকস্মিকভাবে গতি পরিবর্তনে বাধ্য করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে নিয়মিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। শহরের কোন এলাকায় কুকুরের সংখ্যা বেশি, কোথায় পথচারীদের বেশি তাড়া করা হয়, কোথায় কামড়ের ঘটনা ঘটছে এবং কোথায় খাবারের উচ্ছিষ্ট বেশি জমে-এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
পাশাপাশি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও কার্যকর করা জরুরি। বাজার ও খাবারের দোকান থেকে উৎপন্ন উচ্ছিষ্ট নির্দিষ্ট স্থানে রাখার ব্যবস্থা না করলে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা ও বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। নাগরিকদেরও যেখানে-সেখানে খাবারের বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
প্রশাসন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, প্রাণী কল্যাণে কাজ করা সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মানুষ ও প্রাণী-দুই পক্ষের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।
সাতক্ষীরার মানুষ নিশ্চয়ই এমন একটি শহর চান, যেখানে দিনের ব্যস্ত সময় কিংবা রাতের নির্জন রাস্তায় কুকুরের দল দেখে আতঙ্কিত হয়ে চলাচল করতে হবে না। একই সঙ্গে তারা এমন একটি মানবিক সমাজও চান, যেখানে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা থাকবে না। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সঠিক পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা, কুকুরের টিকাদান ও বৈজ্ঞানিকভাবে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উভয় দিকই রক্ষা করা সম্ভব।
ভাদ্র মাসে কুকুরের উপদ্রব নিয়ে মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। আজকের ছোট একটি সমস্যা আগামী দিনে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে। আবার সামান্য অসতর্কতার কারণে একটি পরিবারকে হারাতে হতে পারে তাদের প্রিয় মানুষকে।
সাতক্ষীরার জনজীবন নিরাপদ রাখতে এখনই বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। কুকুরের উপদ্রবকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না দেখে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি নগর ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাণীর প্রতিও মানবিক আচরণ বজায় রেখে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাবেক ব্যাংকার, কবি ও সাহিত্যিক।









