সাতক্ষীরার সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের ফাঁদ!
গাজী মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ
একটি দেশের সীমান্ত কেবল ভৌগোলিক বিভাজনরেখা নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রহরী। অথচ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের জেলা সাতক্ষীরার দীর্ঘ সীমান্ত ঘিরে চোরাচালান, মাদক পাচার এবং সীমান্তকেন্দ্রিক নানা অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অপরাধ শুধু সীমান্তের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং স্থানীয় সমাজ, অর্থনীতি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি করছে গভীর উদ্বেগ। সাতক্ষীরা সীমান্তের বাস্তবতা চোরাচালানকারীদের জন্য নানা সুযোগ তৈরি করে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা, নদী-খাল, জনবসতির কিছু অংশকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য অবৈধভাবে পারাপারের অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে মাদক পাচারের বিষয়টি আরও ভয়াবহ। সীমান্তপথে কোনো মাদক বা নিষিদ্ধ পণ্য দেশে প্রবেশের পর তা শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের অপরাধে শুধু সীমান্তের অপরাধী চক্রই নয়, স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে কিছু তরুণ ও এই অবৈধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে চোরাচালান একদিকে যেমন অপরাধের অর্থনীতি তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে সীমান্ত নিরাপত্তার আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি। জীবিকার তাগিদে কিংবা অসচেতনতার কারণে কেউ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করলে তার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যারা পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, তাদের শনাক্ত করাও জরুরি। সীমান্তে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, আটক বা নির্যাতনের অভিযোগ যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি দেশের ভেতরে বসে যারা এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে অর্থ, যোগাযোগ ও সংগঠন জোগান দেয়, তাদের আইনের আওতায় আনা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন হচ্ছে একজন বাহক ধরা পড়লেই কি চোরাচালান বন্ধ হবে? নাকি প্রয়োজন সেই নেটওয়ার্কের মূল হোতা, অর্থদাতা, সরবরাহকারী ও স্থানীয় সহযোগীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল বিজিবির টহল বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা, কোনো কিছুই যেন অপরাধীদের আইনের ঊর্ধ্বে যাওয়ার সুযোগ না দেয়। তবে ব্যবস্থা হতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে, যাতে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন।
সাতক্ষীরার সীমান্তকে শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এখানে যেমন নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার পর্যাপ্ততার প্রশ্ন। তাই সীমান্ত নিরাপত্তাকে মানবিক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেই দেখতে হবে। লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা









