হজ এজেন্সির ফাঁদে সর্বস্বান্ত হাজিরা
সারা জীবনের সঞ্চয় আর আল্লাহর ঘর বা পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে হজে যান হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ। কিন্তু সেই পবিত্র যাত্রাই অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে প্রতারণা, হয়রানি ও আর্থিক শোষণের তিক্ত অভিজ্ঞতায়। উন্নত হোটেল, কাবার নিকটবর্তী আবাসন, মানসম্মত খাবার কিংবা কোরবানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলেও বাস্তবে মিলছে না কাঙ্খিত সেবা। শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং কোরবানির নামে প্রতারণার মতো অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে একাধিক হজ এজেন্সি।
চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমেও নানা অনিয়ম, শর্ত লঙ্ঘন এবং হজযাত্রীদের হয়রানির অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে একাধিক এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, আগামী ২০২৭ সালের হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে চার মাস আগেই হজের নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার।
মন্ত্রণালয় ও হাব সূত্রে জানা গেছে, এজেন্সিগুলোর প্রতারণার ধরণ এখন বহুমুখী। সরকার নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্যকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন কৌশলে হজযাত্রীপ্রতি ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে একাধিক চক্র। যেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ-১ এর খরচ ৬,১৫,২৬৩ টাকা এবং প্যাকেজ-২ এর খরচ ৫,০৫,৬৪৮ টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ) এর খরচ ৭ লাখ ৯১ হাজার ৬০ টাকা, প্যাকেজ-২ (সাধারণ) ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮০ টাকা এবং প্যাকেজ-৩ (সাশ্রয়ী) খরচ ৫ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে নুসুক মাসার প্ল্যাটফর্মে ভুয়া এন্ট্রি, হোটেলের মান উন্নত করার মিথ্যা আশ্বাস এবং কোরবানির ভুয়া রসিদ দেখিয়ে শত শত হাজির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কিছু এজেন্সি। বিশেষ করে প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য এজেন্সিতে স্থানান্তর, চুক্তি অনুযায়ী এয়ার টিকিট না দিয়ে শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত খরচে টিকিট কাটতে বাধ্য করা এবং সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আবাসন ও খাবার না দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
তদন্তে দেখা গেছে, গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস এবং এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হজযাত্রীপ্রতি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে লিখিত জবাবের মুখে পড়েছে। প্রতারণার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও তিনটি অসাধু এজেন্সি বেআইনিভাবে হজযাত্রীদের প্রায় ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে চম্পট দিয়েছে। পরে ধর্ম মন্ত্রণালয় তাদের চাপ দিয়ে এই অর্থ উদ্ধার এবং ভুক্তভোগীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। একইভাবে আনসারি ওভারসিজ, রিলেশন ট্রাভেলস এবং নর্দার্ন ট্যুরসের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত হাজিদের ক্ষতিপূরণ ও হজের সার্বিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ অনুযায়ী এসব এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
চলতি বছর হজের অন্যতম আলোচিত অনিয়ম ধরা পড়ে কোরবানির অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে। সৌদি সরকারের নিবন্ধিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে হাজিদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায় করা হলেও বাস্তবে কোনো কোরবানিই করা হয়নি। অনেক এজেন্সি আবার সাধারণ ছাগল কেনার ভুয়া রসিদ ধরিয়ে দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এই গুরুতর অনিয়মে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে প্রত্যাশা ট্রাভেলস, দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, গ্লোবাল ট্রাভেলস, মিডিয়া ট্রাভেলস এবং দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনালকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া লাগেজ হারানো, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং অননুমোদিত উপায়ে টিকিট কেটে হাজিদের বিমানবন্দরে আটকে রাখার অপরাধে লাকি ট্রাভেলস ও খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতারণার শিকার হওয়া নারায়ণগঞ্জের হাজি মো. রফিকুল ইসলাম কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘পবিত্র হজ পালনের জন্য সারা জীবনের সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলাম এজেন্সির হাতে। নির্ধারিত প্যাকেজের বাইরে ভালো হোটেল ও কাবা শরীফের কাছে আবাসনের কথা বলে আমার এবং আমার স্ত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩ লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি। কিন্তু মক্কায় গিয়ে দেখি আমাদের রাখা হয়েছে জরাজীর্ণ এক বাসায়, যেখানে পানি ও এয়ারকন্ডিশনার ঠিকমতো চলত না। কোরবানি বাবদ আলাদা ৩৫ হাজার টাকা নিয়েও আমাদের ভুয়া রসিদ দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা এই প্রতারক এজেন্সিগুলোর মালিকদের ফাঁসি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
একইভাবে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা হাজি আবদুল মালেক বলেন, ‘আামদের এজেন্সি শেষ মুহূর্তে বলে ফ্লাইট মিস হবে, তাই নতুন করে জনপ্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা না দিলে ভিসা ও টিকিট হবে না। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে টাকা দিয়েছি। সেখানে গিয়ে খাবারের যে কষ্ট পেয়েছি তা মুখে বলা যায় না। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা মানুষের সাথে এমন প্রতারণা করে, তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করা উচিত।’
তবে অভিযুক্ত একটি এজেন্সির সত্ত্বাধিকারী ও হজ এজেন্সি মালিক প্রতিনিধি আলহাজ্ব মো. কামরুল হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে কোনো অনিয়ম করিনি। সৌদি আরবের নুসুক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সার্ভার জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে অনেক ডেটা এন্ট্রি আটকে যায়। এছাড়া স্থানীয় সৌদি মোয়াল্লেমরা সময়মতো আবাসন ও কোরবানির কুপন না দেওয়ায় এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ এজেন্সি নিজেদের পকেট থেকে দিয়েছে। মন্ত্রণালয় যেসব শোকজ করেছে, তার বস্তুনিষ্ঠ ও দাপ্তরিক প্রমাণ আমরা জমা দেব।’
এ বিষয়ে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার দায় পুরো হাব নেবে না। যেসব এজেন্সি হাজিদের টাকা আত্মসাৎ করেছে বা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে আমরা তাদের বিচার চাই। তবে একই সাথে সরকারকে মনে রাখতে হবে সৌদির নতুন রোডম্যাপ ও আধুনিক কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থার সাথে অনেক ছোট এজেন্সি এখনো অভ্যস্ত নয়। আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষ শেষ মুহূর্তে হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আগাম নিবন্ধনের মানসিকতা তৈরিতে সরকারি প্রচার বাড়ানো দরকার। অসাধু এজেন্সি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সৎ এজেন্সিগুলোকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।’
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও হজের স্বচ্ছতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, ‘হজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক রুকন। ইবাদতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া পরহেজগার মানুষদের ধোঁকা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া জঘন্যতম অপরাধ ও হারাম কাজ। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে হাজিদের পকেট কাটে, তারা ইহকাল ও পরকালে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী এদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার যাতে কেউ আর বায়তুল্লাহর মেহমানদের সাথে প্রতারণা করার সাহস না পায়।’
সুশাসনের দিকটি তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে হজ খাতে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কেবল কার্যকর শাস্তির অভাবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি বা সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়ে এই অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন’ প্রয়োগ করে প্রতারকদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে। এছাড়া সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ভুক্তভোগী হাজিদের অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এ বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম বলেন, ‘সৌদি সরকার পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে অনলাইন ই-ওয়ালেট ও সেন্ট্রাল ‘নুসুক মাসার’ সিস্টেমে নিয়ে এসেছে। নিষ্ক্রিয় ও প্রতারক এজেন্সিগুলোর পথ চিরতরে বন্ধ করতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করা এবং চলতি ২০২৬ সালে একটিও নিবন্ধন না করা নিষ্ক্রিয় এজেন্সিকে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রম থেকে সরাসরি বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি এজেন্সিকে অন্তত ৪৬ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করতেই হবে। এছাড়া এজেন্সিগুলোকে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন শেষ করতে হবে।’
নতুন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য হজের জন্য ১৫ জুলাই থেকে আগামী ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি খরচের অর্থ নুসুক ই-ওয়ালেটে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া ৮ নভেম্বরের মধ্যে এয়ারলাইন্স চুক্তি এবং ২৮ জানুয়ারি থেকে ভিসা ইস্যু শুরু হয়ে ৮ এপ্রিল থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট শুরু হবে।







