আজ বিশ্ব শ্রবণ দিবস: নিস্তব্ধতার মাঝেও শব্দ আছে, শোনার শিল্প ও আমাদের সংকট
সাকিবুর রহমান বাবলা
ভ্রুণাবস্থা থেকেই মানুষ শব্দের প্রতি সংবেদনশীল। জন্মের পর পৃথিবীকে চেনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে শ্রবণ। আমরা শব্দ শুনি, ভাষা শিখি ও সম্পর্ক গড়ি। অথচ প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহের এই যুগে মানুষ কথা বলছে বেশি, কিন্তু শুনছে কম। কোলাহল বাড়ছে, কমছে মনোযোগী শ্রবণ। এমন বাস্তবতায় ১৮ জুলাই পালিত ‘বিশ্ব শ্রবণ দিবস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-শোনা কেবল কানের কাজ নয়; এটি মানুষ, প্রকৃতি ও স্্রষ্টার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরির এক অনন্য মানবিক অনুশীলন।
২০১০ সাল থেকে পালিত এই দিবসটি কানাডীয় ধ্বনি-পরিবেশবিদ আর. মারে শেফারের জন্মদিন স্মরণে নির্ধারিত। তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, একটি সমাজকে বুঝতে হলে তার ‘সাউন্ডস্কেপ’ বা শব্দজগতকে বুঝতে হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “অনুশীলন হিসেবে শ্রবণ” আমাদের শেখায় যে, শোনা কোনো নিষ্ক্রিয় কাজ নয়; বরং সচেতনতার একটি চর্চা।
বিশ্ব শ্রবণ দিবসের লক্ষ্য হলো শব্দদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা ও শ্রবণ-পরিবেশের গুরুত্ব অনুধাবন। মানুষের শ্রবণসীমা সাধারণত ২০ থেকে ২০,০০০ হার্জ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, কিন্তু প্রকৃতির শব্দজগৎ এর বাইরেও বিস্তৃত।
বিজ্ঞানীরা পরিবেশের শব্দজগৎকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন: প্রাণীকুলের শব্দ ‘বায়োফোনি’, প্রকৃতির জড় উপাদানজাত ‘জিওফোনি’ এবং মানুষের সৃষ্টি ‘অ্যানথ্রোপোনি’। ইকোলজিস্ট বার্নি ক্রাউসের মতে, একটি সুস্থ পরিবেশে এই শব্দগুলো মিলে এক অপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করে। কিন্তু বর্তমানে মানবসৃষ্ট শব্দদূষণে প্রকৃতির সেই ভারসাম্য বিঘিœত হচ্ছে। মূলত, প্রকৃতির এই অগোচরে থাকা শব্দতরঙ্গ ও নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অপার রহস্য, যা আমাদের অস্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই অদৃশ্য শব্দতরঙ্গ প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্যোগ পূর্বাভাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছে। প্রকৃতির এই বিশাল শব্দবিশ্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যা আমরা শুনি না, তার মধ্যেও নিহিত রয়েছে অপার রহস্য।
বাংলাদেশের নদী, পাখি ও প্রকৃতির অকৃত্রিম সুর আমাদের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, যা আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও যান্ত্রিক শব্দদূষণের কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম কোলাহলপূর্ণ নগরী হওয়ায় আমরা বৃষ্টির শব্দ বা পাখির ডাকের মতো প্রকৃতির সূক্ষ্ম সুরগুলো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, যা মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এর বিপরীতে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর শব্দ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবেশের স্বাভাবিক ছন্দ টিকিয়ে রাখতে সফল হয়েছে। আন্টার্কটিকা বা হালেয়াকালোর মতো শান্ত অঞ্চলগুলো বিশ্ববাসীকে শেখায় যে, নীরবতা মানে শব্দের অভাব নয়, বরং প্রকৃতির সূক্ষ্ম সুরগুলো শোনার সক্ষমতা। এরইমধ্যে আমাদের উপকূলীয় সাতক্ষীরার শান্ত প্রকৃতি এবং সুন্দরবনের নিস্তব্ধতার যে ভাষা, তা যেন আমরা আধুনিক কোলাহলে হারিয়ে না ফেলি।
বিশ্ব শ্রবণ দিবস তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া সংযোগকে নতুনভাবে উপলব্ধি ও পুনর্গঠনের একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শ্রবণ কেবল শব্দ শোনা নয়, বরং বোঝা, পর্যবেক্ষণ করা, চিন্তা করা এবং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সচেতন সম্পর্ক গড়ে তোলা।
তাই কোলাহলময় এই সময়ে কিছুটা সময় প্রকৃতির স্বাভাবিক ধ্বনি, পরিবেশের সূক্ষ্ম পরিবর্তন এবং মানুষের কথাকে মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা আরও সচেতন, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আজ আমাদের প্রয়োজন প্রকৃতির সুর, পরিবেশের ভাষা এবং মানুষের কথাকে আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার শিল্প সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

































