শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

আশাশুনির বাওচাষে শিশুর শ্লীলতাহানির লিখিত অভিযোগ ছাড়াই দপ্তরী বরখাস্ত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ
আশাশুনির বাওচাষে শিশুর শ্লীলতাহানির লিখিত অভিযোগ ছাড়াই দপ্তরী বরখাস্ত

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী বিকাশ চন্দ্র বাছাড়কে ছুটির দিনে বহিরাগত এক প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে বাড়ি থেকে তুলে এনে আটক রেখে তিন দফায় নির্যাতন চালানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগ ছাড়া ওই নৈশ প্রহরীর বিরুদ্ধে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে রাজী না হওয়ায় প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জিম্মি করে সাময়িক বরখাস্ত করতে বাধ্য করানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ঘটনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ঠাদের লোকজনের নিকট থেকে ভিন্ন ভিন্নরূপ বক্তব্য পাওয়া গেছে। গত পহেলা ও ২ জুন এ হামলার ঘটনার পর বিকাশ সস্ত্রীক আত্মগোপনে রয়েছে। আতঙ্কে রয়েছে তার পরিবার ও স্বজনরা।

সরেজমিনে বৃহষ্পতিবার আশাশুনি উপজেলার বাঁকড়া গ্রামে যেয়ে দেখা গেছে, বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী বিকাশ চন্দ্র বাছাড়ের বাড়িতে তার বাবা সন্তোষ বাছাড়া, মা উর্মিলা বাছাড় ও ছোট ভাই সুভাষ বাছাড়ের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। বিকাশের কথা জানতেই মা উর্মিলা বাছাড় কেঁদে ফেললেন। উপস্থিত প্রতিবেশিসহ মা ও বাবা পহেলা জুন সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাল উদ্দিনের বাড়িতে বিকাশকে বহিরাগত এক প্রথম শ্রেণীর ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ মারপিট করার বর্ণনা দেন। পরদিন সকাল ১০টায় ও দুপুর ১২টায় দুই বার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারতে মারতে ইয়াছিনের দোকানে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন মা উর্মিলা। সাবেক ইউপি সদস্য সাহেব আলীসহ কয়েকজন না থাকলে বিকাশকে মব সৃষ্টিকারিদের হাতে জীবন দিতে হতো বলে অভিযোগ করেন তারা।

বাওচাষ গ্রামের এক দিনমুজুরের বাড়িতে গেলে তার ছেলে আব্দুল কাদের বলেন, তার দুলা ভাই আশাশুনি উপজেলার বলাডাঙা গ্রামের বাসিন্দা। এক বছর যাবৎ তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করায় বোন ও ভাগ্নি মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে আসেন। ভাগ্নি রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। পহেলা জুন তার দুই ভাগ্নি বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দোলনা খেলতে গেলে প্রথম শেণীতে পড়–য়া (বলাডাঙা) ওই ভাগ্নির শ্লীলতাহানি করে বিকাশ। বিষয়টি জানতে পেরে তারা বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলালউদ্দিনকে জানান। কয়েকজন বিকাশকে মারপিট করেছেন স্বীকার করে কাদের বলেন, তারা কোথাও কোন লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।

আত্মগোপনে থাকা বিকাশ বাছাড় জানান, পহেলা জুন সোমবার বিদ্যালয় ছুটি থাকলেও প্রতিদিনের ন্যায় তিনি বিকেলে প্রতিষ্ঠানের গাছ গাছালিতে পানি দিতে যান। এ সময় বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী এক ব্যক্তির দুই নাতনি (সাত থেকে আট বছর বয়সী) বিদ্যালয়ে বেড়াতে আসেন। বেড়াতে আসেন বিদ্যালয়ের পাশ^বর্তী আব্দুল কাদেরের ছেলে মোহিন, তুহিন, আহছানের ছেলে তবিবুর, ইউনুসের ছেলে হানজানা, মহিদুলের ছেলে শামীম ও ইয়াকুবের ছেলে বাদশাসহ কয়েকজন। সোয়া ছয়টার দিকে ওই দুই মেয়ে চলে যায়। এরপরপরই মোহিন, তুহিনসহ তাদের দুই ভাইপোসহ মাঠে উপস্থিত সকলকে নিয়ে তিনিও বিদ্যালয় থেকে চলে আসেন। সন্ধ্যায় সাতটার দিকে বাওচাষ গ্রামের আব্দুল কাদের বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাউল তাকে যেতে বলেছে বলে ডাকতে আসে। তিনি আলাউলের বাড়িতে চলে আসার পর তাকে কিছুক্ষণ আগে বিদ্যালয়ে বেড়াতে যাওয়া এক শিশুকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করে গালে থাপ্পড় মারেন ওই মেয়েটির মা। এ সময় জমি দাতা আলাউল বিষয়টি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিনকে অবহিত করলে তার কাছ থেকে বিদ্যালয়ের চাবি নিয়ে নিতে বলা হয়। তিনি চাবি দিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। রাত ১১টার দিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা ইয়াসমিনকে একটি মহল জোরপূর্বক বিদ্যালয়ে আসতে বাধ্য করেন।

বিকাশ বাছাড় অভিযোগ করে বলেন, ২ জুন মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তিনি বাড়িতে অবস্থান করাকালে গতদিনের ভিকটিমের মামা আব্দুল কাদের, বাওচাষ গ্রামের রহমতের ছেলে হাফিজুল ইসলাম, একই গ্রামের আব্দুর রব এর ছেলে ঈদুল আযহা’র পরদিন ভারত থেকে পালিয়ে আসা হযরত আলীসহ কয়েকজন তার ঘরে ঢুকে একমাত্র শিশু সন্তানকে কোল থেকে মাটিতে আঁছড়ে ফেলে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সামনে মারতে মারতে বিদ্যালয়ের পাশে নিয়ে যায়। স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় তিনি বাড়ি ফিরে আসলে কাদের, হাফিজুল ও হযরতসহ বাওচাষ, বাঁকড়া ও হাজিপুর গ্রামের ৭০ থেকে ৮০ জন তাকে আবারো বাড়ি থেকে মারতে মারতে ইয়াছিনের দোকানে নিয়ে আটকে রাখে। সেখানে তাকে নির্যাতনের ফলে ডান কানের শ্রবন শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য সাহেব আলী, ভুট্টো ও প্রতিবেশি হাফেজ সাহেব প্রতিবাদ করে রুখে দাঁড়িয়ে তাকে মব সৃষ্টিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করে বাড়িতে পৌঁছে দেন। রাতে আবারো তাকে ডেকে নিয়ে শালিস করা হয়। শালিসে তাকে ওই শিশুর শ্লীলতাহানির বিষয়ে স্বীকার করতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। সেখান থেকে বাড়ি ফিরে জীবন বাঁচাতে তিনি স্ত্রী ও একমাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে মর্মে তিনি অভিযোগ করেন।

সরেজমিনে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজির হলে সহকারি শিক্ষক শাহজাহান শামীম, রামপ্রসাদ বাছাড় ও রুবনা ইয়াসমিন জানান, তাদের বিদ্যালয়ে ২৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নয়জনের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য। একজন মাতৃত্বকালিন ছুটিতে। ছয়জন শিক্ষক বর্তমানে কর্মরত। ১৯২১ সালে ওই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। মনোরম পরিবেশ ও উন্নতমানের পড়াশুনার জন্য ২০২৪ সালে বিদ্যালয়টি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে।

দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী বিকাশের বিরুদ্ধে ছুটির দিনে এক বহিরাগত শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির বিষয়টি সিসি ক্যামরা, সেই সময়ে উপস্থিত ওই বহিরাগত শিক্ষার্থীর নিজের খালাত বোনসহ স্থানীয় আটজনের কাছে ঘটনার সত্যতা মেলেনি বলে জানান ওই বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় কয়েকজন। বিষয়টি যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে শুধু তাদের নয়, বিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট হয়েছে। বিকাশের কারণে বিদ্যালয়ের বাগান পরিচর্যায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি ঘটেছে বলে তারা দাবি করেন।

জানতে চাইলে বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা মোহিন ও তুহিন জানান, বিদ্যালয় থেকে বিকাশের সঙ্গে তারা একসাথে বেরিয়ে যাওয়া ও শ্লীলতাহানি সম্পর্কে ঘটনার কোন সত্যতা না থাকার বিষয়টি তারা সকলের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করেন। ঘটনা ঠিক নয় বলে জানায় ওই ভিকটিমের নিজের খালাত বোন। এরপরও ওই ভিকটিমের পরিবার কোন লিখিত অভিযোগ না করায় কিভাবে বিকাশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো তা তাদের বোধগম্য নয়।

বিদ্যালয়ের জমি দাতা আলাউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিদালয় পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দাবিকৃত ঘটনার সময় ওই ভিকটিমের খালাত বোনসহ উপস্থিত আটজন ঘটনা সঠিক নয় বলে দাবি করেন। সিসি ক্যামেরায় ও ঘটনার সত্যতা মেলেনি। এরপরও স্থানীয় একটি মহলের আগ্রাসী মনোভাব তাকে ও প্রধান শিক্ষককে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। একপর্যায়ে তারা ভিকটিম পরিবারের লিখিত অভিযোগ ছাড়াই বিকাশকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার বর্মণের সঙ্গে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি।

বাউচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। লিখিত অভিযোগ, কোন যৌতিক কারণ ও প্রমান ছাড়া বিকাশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না চাইলে তাকে বিভিন্ন ভাবে অপমান অপদস্ত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

 

 

Ads small one

সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ছয় লক্ষাধিক টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৫:০৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ছয় লক্ষাধিক টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক

পত্রদূত রিপোর্ট: শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এর অধীনস্থ কাকডাঙ্গা , মাদরা ও চান্দুরিয়া বিওপি এর টহলদল দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় চোরাচালান বিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, ঔষধ এবং শাড়ী আটক করে।

সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, কাকডাঙ্গা বিওপির পৃথক দুইটি আভিযানে কলারোয়া থানার কেড়াগাছি ও রাজ্জাকের মোড় হতে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ, ঔষধ এবং শাড়ী আটক করে। মাদরা বিওপির আভিযানে কলারোয়া থানার ভাদিয়ালি হতে ৯০ হাজার টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আটক করে।

এছাড়াও চান্দুরিয়া বিওপির আভিযানে কলারোয়া থানার কাদপুর হতে ২ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকার ভারতীয় মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ এবং ঔষধ আটক করে। আটক পন্যের সর্বমোট মূল্য ৬ লাখ ০৮ হাজার ৭০০ টাকা।

বিজিবি আরো জানায়, চোরাকারবারী কর্তৃক বর্ণিত মালামাল শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ভারত হতে বাংলাদেশে পাচার করায় জব্দ করা হয়। এভাবে ভারতীয় দ্রব্য সামগ্রী মাদকসহ অন্যান্য মালামাল চোরাচালানের কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হবার পাশাপাশি দেশ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

 

দেশের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করে স্থানীয় শিল্প বিকাশে বিজিবি’র এরূপ দেশপ্রেমিক ও জনস্বার্থে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত স্থানীয় জনগন সাধুবাদ জ্ঞাপন করে এ ধরণের অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধ করেন।

সুখের শুরু দৃষ্টিভঙ্গিতে/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৮ অপরাহ্ণ
সুখের শুরু দৃষ্টিভঙ্গিতে/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

মানুষের জীবন কখনোই সরলরেখায় চলে না। আনন্দের পাশাপাশি আসে বেদনা, সাফল্যের পাশে থাকে ব্যর্থতা, প্রাপ্তির সঙ্গে থাকে অপ্রাপ্তি। জীবনের এই বৈচিত্র্যই মানুষকে অভিজ্ঞ করে, পরিণত করে এবং বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলোÑএকই পরিস্থিতিতে মানুষের প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। কেউ সামান্য সমস্যায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ বড় সংকটের মধ্যেও আশার আলো খুঁজে পান। এই পার্থক্যের মূল জায়গাটি হলো মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি।

 

আমাদের জীবনে কতটা সুখ থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমরা জীবনকে কীভাবে দেখি তার ওপর। কারণ বাইরের সব পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বাধা, মানুষের আচরণ কিংবা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাÑএসব অনেক কিছুই আমাদের ইচ্ছার বাইরে ঘটে। কিন্তু এসব ঘটনার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, সেটি অনেকটাই আমাদের নিজের হাতে। একই বৃষ্টিকে কেউ দুর্ভোগ মনে করেন, আবার কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য হিসেবে উপভোগ করেন। একই ব্যর্থতাকে কেউ অপমান মনে করেন, আবার কেউ সেটিকে শিক্ষা ও নতুন শুরুর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। অর্থাৎ বাস্তবতা এক হলেও মানুষের উপলব্ধি ভিন্ন হতে পারে। আর এই উপলব্ধির পার্থক্যই একজন মানুষকে সুখী কিংবা অসুখী করে তোলে।

 

বর্তমান সময়ে মানুষের অসুখী হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলোÑঅন্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, প্রত্যেক মানুষের জীবনযাত্রার পথ আলাদা। কারও সাফল্য দ্রুত আসে, কারও আসে দীর্ঘ সংগ্রামের পর। কেউ অল্প বয়সে প্রতিষ্ঠিত হন, আবার কেউ জীবনের পরবর্তী সময়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করলে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই সমস্যা আরও বেড়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই তুলে ধরে। সেখানে হাসি আছে, সাফল্য আছে, অর্জন আছে; কিন্তু সেই হাসির আড়ালের কষ্ট, ব্যর্থতা ও সংগ্রামের গল্প খুব কমই দেখা যায়। ফলে আমরা অন্যের জীবনের একটি অংশ দেখে নিজের পুরো জীবনকে বিচার করতে শুরু করি। এই ভুল তুলনা মানুষের মনে অপ্রাপ্তির অনুভূতি বাড়ায়।

 

মনে হয়, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমিই পিছিয়ে আছি। অথচ বাস্তবতা হলোÑপ্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। যাকে আমরা সফল মনে করি, তার জীবনেও থাকতে পারে অজানা চাপ, দুশ্চিন্তা ও কঠিন লড়াই। অন্যের সাফল্যে হিংসা করা সহজ, কিন্তু সেই সাফল্যকে সম্মান করা এবং নিজের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা একটি পরিণত মানসিকতার পরিচয়। কারণ হিংসা প্রথমে অন্যকে নয়, নিজের মনকেই অশান্ত করে। অন্যের ভালো দেখে আনন্দিত হতে পারলে নিজের মধ্যেও তৈরি হয় ইতিবাচক শক্তি। সমাজে অনেক সময় একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়Ñঅন্যের এগিয়ে যাওয়া মানেই নিজের পিছিয়ে পড়া। এটি সত্য নয়। একজনের সাফল্য আরেক জনের ব্যর্থতার কারণ নয়।

 

পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই অন্যের অর্জন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের পথ তৈরি করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। সুখের আরেকটি বড় বাধা হলো অতিরিক্ত প্রত্যাশা। আমরা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার জগতে বেশি বসবাস করি। চাই সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটুক। কিন্তু জীবন সব সময় আমাদের ইচ্ছামতো চলে না। তাই বাস্তবতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতাও জীবনের বড় শিক্ষা। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ স্বপ্ন দেখবে না বা উন্নতির চেষ্টা করবে না। বরং স্বপ্ন, লক্ষ্য ও পরিশ্রম মানুষের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। তবে সেই সঙ্গে প্রয়োজন ধৈর্য ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা।

 

অযৌক্তিক প্রত্যাশা মানুষকে হতাশ করে, আর বাস্তবসম্মত লক্ষ্য মানুষকে সফলতার পথে এগিয়ে নেয়। ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে ব্যর্থতাকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। পরীক্ষায় ভালো ফল না হলে, চাকরি না পেলে কিংবা ব্যবসায় ক্ষতি হলে অনেকে মনে করেন সব শেষ। অথচ ব্যর্থতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। পৃথিবীর বহু সফল মানুষ জীবনে একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা ব্যর্থতাকে নিজেদের পরিচয় বানাননি; বরং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে গেছেন। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের কিছু না কিছু শেখায়।

 

কোনো ব্যর্থতা শেখায় নতুন পরিকল্পনা করতে, কোনো সংকট শেখায় নিজের শক্তি চিনতে, কোনো সম্পর্কের ভাঙন শেখায় মানুষকে বুঝতে। তাই কঠিন সময়কে শুধু দুর্ভাগ্য হিসেবে না দেখে শিক্ষার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ একজন মানুষের চিন্তাভাবনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। কারণ আত্মবিশ্বাসী মানুষই জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা ও মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

একজন শিক্ষার্থীর সফলতা শুধু নম্বরে সীমাবদ্ধ নয়; তার চরিত্র, চিন্তা ও মানবিক গুণাবলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে তখনই, যখন মানুষ শুধু নিজের সাফল্য নিয়ে ব্যস্ত থাকে না; অন্যের সুখ-দুঃখকেও গুরুত্ব দেয়। অন্যের সাফল্যে অভিনন্দন জানানো, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং ব্যর্থ মানুষকে উৎসাহ দেওয়াÑএসব ছোট ছোট মানবিক আচরণ সমাজকে আরও সুন্দর করে। মানসিক শান্তি কোনো বাহ্যিক সম্পদের বিষয় নয়। অনেক অর্থবান মানুষও অশান্তিতে থাকেন, আবার সীমিত সামর্থ্যের মানুষও সুখী জীবন যাপন করেন। কারণ সুখের সঙ্গে মানুষের চিন্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের প্রাপ্তির মূল্য বুঝতে পারেন, তিনি সীমিত সুযোগের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে পারেন। সবশেষে বলা যায়, জীবনের সব সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। প্রতিকূলতা থাকবে, ব্যর্থতা আসবে, অপ্রাপ্তিও থাকবে। কিন্তু এসবের মধ্যেও ভালো থাকার ক্ষমতাই হলো জীবনের বড় প্রজ্ঞা।

 

অন্যের সাফল্যে হিংসা নয়, অনুপ্রেরণা; ব্যর্থতায় হতাশা নয়, শিক্ষা; অপ্রাপ্তিতে আফসোস নয়, প্রাপ্তির প্রতি কৃতজ্ঞতাÑএই মানসিকতাই মানুষকে সত্যিকারের সুখী করে। জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, সুখ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পাওয়া যায় না। সুখের শুরু আমাদের নিজের ভেতর থেকে, আমাদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।ঘটনা নয়, ঘটনার ব্যাখ্যাই অনেক সময় আমাদের সুখ বা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই পৃথিবীকে বদলানোর আগে বদলাতে হবে নিজের দেখার চোখ। কারণ সুখের শুরু বাইরের কোনো অর্জনে নয়, সুখের শুরু আমাদের নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে পরিত্যাক্ত পাটকেলঘাটা অডিটরিয়াম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫০ অপরাহ্ণ
কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে পরিত্যাক্ত পাটকেলঘাটা অডিটরিয়াম

এমএম জামান মনি, পাটকেলঘাটা: পাটকেলঘাটা একমাত্র অডিটরিয়াম এখন নেশাখোরদের আড্ডাখানা। সরকারি এই জরাজীর্ণ ভবনটি এখনো কালের স্বাক্ষী হিসেবে স্রণ করিয়ে দেয় পাটকেলঘাটা বানিজ্য কেন্দ্রে ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। রাজনৈতিক মঞ্চে এই অডিটরিয়াম সংস্কারে নেতারা বিভিন্ন সময়ে ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কেউ কথা রাখেনি।

জানা গেছে, ১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. আফতাবুজ্জামান-এমপি পাটকেলঘাটা হাই স্কুলের মধ্যে একটি অডিটরিয়াম নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেন। তৎকালীন সময়ের স্কুলে জমিদাতা তালা উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত এবিএম আলতাফ হোসেন, তৎকালীন সময়ের সাধারণ সম্পাদক জমিদাতা প্রয়াত মফিদুল ইসলাম, জমিদাতা প্রয়াত আবু বক্কার, তৎকালীন সময়ের প্রধান শিক্ষক পশুপতিসহ ১০সদস্যের একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেন। এক হাজার মানুষের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়। একই বিল্ডিংয়ে একটি উঁচু বিশাল স্টেজ তৈরি করা হয়। দক্ষিণ পাশে বিশাল দুটি রেস্ট রুম করা হয়।

উপরে টিনের ছাউনি তৈরি করা হয়। গরমের দিনের কথা চিন্তা করে বড় বড় জানালা তৈরি করা হয়। এক বছর সময় লাগে। ১৯৮০ সালের আনুষ্ঠানিকভাবে বিশাল আয়োজনে ঐতিহাসিক অডিটরিয়ামটি উদ্বোধন করা হয়। এরপর সেটি সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

সেই থেকে রাজনৈতিক দলের সভা, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষকদের ট্রেনিং, দর্জি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সভা সমাবেশ অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে পাটকেলঘাটা অডিটরিয়াম। অডিটরিয়াম এর রক্ষাণাবেক্ষণ, তত্ত্বাবধায়ন ও নিয়ন্ত্রণ ছিল স্কুলের হাতে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে অডিটরিয়ামের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে। তখন থেকে অডিটরিয়ামে কোন অনুষ্ঠান করতে হলে তালায় অবস্থিত ইউএনও অফিসের অনুমতি নেওয়ার বিধান চালু হয়।

 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অডিটরিয়াম থেকে ইউএনও অফিসের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় ধীরে ধীরে অডিটরিয়াম ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হতে থাকে ব্যবহারকারীরা। বিকল্প হিসেবে খোলামেলা স্থানে অনুষ্ঠান করার প্রচলন শুরু হয়। ফলে অডিটরিয়াম ব্যবহার কমতে কমতে এক সময় সেটা পরিত্যাক্ত ভবনে পরিণত হয়।

এমন অবস্থায় ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাটকেলঘাটার কৃতি সন্তান ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরে অডিটরিয়ামটির সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ২০১১ সালের দিকে সংস্কারের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দও দেন। কিন্তু জরাজীর্ণ এই ভবনের সংস্কারে সেই অর্থ খুবই অপ্রতুল হওয়ায় নামমাত্র সংস্কার হলেও তা ব্যবহার উপযোগী করা হয়নি। অন্যান্য সময়ে জনপ্রতিনিধিরা অডিটরিয়ামটির সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউ তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি।

পাটকেলঘাটা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, অডিটরিয়াম সংস্কার করার কোন অর্থ আমাদের ফান্ডে নেই।

তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফেরদৌসী আফরোজা স্বর্ণা বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের কাছে সরকারি কোন অর্থ নেই। যদি পাই তাহলে বিষয়টি দেখব।

যুগীপুকুর গ্রামের রেজাউল বিশ্বাস, জাসদ নেতা আবুল কালাম আজাদ মিলন, পাটকেলঘাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল মমিন, সাবেক সভাপতি শেখ জহুরুল হক বলেন পাটকেলঘাটা অডিটরিয়ামটি এখন জরাজীর্ণ। এই ভবনই পাটকেলঘাটা বানিজ্য কেন্দ্রের ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। তারা অডিটরিয়ামটি দ্রুত সংস্কারের দাবী জানান।