বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উলাশী খাল: ইতিহাসের পথে নতুন পুনর্জাগরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪৮ অপরাহ্ণ
উলাশী খাল: ইতিহাসের পথে নতুন পুনর্জাগরণ

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর খাল বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসে একটি বিশেষ নাম। এটি কেবল একটি জলপথ নয়-বরং একটি সময়, একটি রাজনৈতিক দর্শন এবং একটি সামাজিক অংশগ্রহণের প্রতীক। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে যে খাল খননের সূচনা করেছিলেন, সেটি পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গভীর পরিবর্তন আনে। প্রায় পাঁচ দশক পর সেই খাল আবার আলোচনায় এসেছে। কারণ, দীর্ঘদিন অবহেলা ও পলি জমে এটি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

 

এখন পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সম্পৃক্ততা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই গল্প কেবল রাজনীতির নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন দর্শনেরও গল্প। একটি খালের জন্ম: সময়ের প্রয়োজনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ১৯৭০-এর দশকে শার্শা অঞ্চল ছিল ভৌগোলিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত। অঞ্চলটির উত্তরাংশে বিস্তৃত বিল এলাকা-প্রায় ২২ হাজার একর কৃষিজমি-বছরের বড় অংশ পানিতে ডুবে থাকত। এর ফলে-একফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, কৃষকরা ঋণগ্রস্ত থাকত, খাদ্য ঘাটতি ছিল নিয়মিত, দারিদ্র্য ছিল কাঠামোগত এই বাস্তবতায় একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেই প্রয়োজন থেকেই উল্লাশী-যদুনাথপুর খাল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

 

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত হন-যা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তিনি সরাসরি মাঠে উপস্থিত হয়ে খনন কাজের সূচনা করেন। স্থানীয় মানুষ, কৃষক, শ্রমিক এবং স্বেচ্ছাসেবীরা একত্রিত হয়ে শুরু করেন এক অভূতপূর্ব শ্রমযজ্ঞ। উলাশী খালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন মডেল। সেখানে-হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেয়, কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক ছিল না, কাজের বিনিময়ে সামান্য রুটি ও গুড় দেওয়া হতো, শ্রমকে দেখা হতো দায়িত্ব হিসেবে-এই ধরনের অংশগ্রহণ আজকের উন্নয়ন কাঠামোতে বিরল।

 

স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই সময়-যখন রাষ্ট্রপ্রধান নিজে কোদাল হাতে মাটি কাটছেন, আর সাধারণ মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। এই দৃশ্য শুধু প্রতীকী ছিল না; এটি ছিল একটি সামাজিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। খাল খননের পরবর্তী সময়টি ছিল শার্শার জন্য এক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যুগ। প্রধান পরিবর্তনগুলো ছিল-বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় জমি চাষযোগ্য হয়। সেচ সুবিধা তৈরি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমেও ধান চাষ শুরু হয়। একসময় অনাবাদি থাকা জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়। কৃষকরা ঋণমুক্ত হয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থায় আসে। এই পরিবর্তন শুধু কৃষি নয়, স্থানীয় বাজার, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।

 

উলাশী খাল শুধু কৃষি নয়, সমাজকেও বদলে দিয়েছিল কর্মসংস্থান বৃদ্ধিগ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা, স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পরোক্ষ উন্নতি গ্রামীণ সমাজে তখন একটি নতুন আশাবাদ জন্ম নেয়-“পানি নিয়ন্ত্রণ মানেই জীবন নিয়ন্ত্রণ।” যে অবকাঠামো একসময় উন্নয়নের প্রতীক ছিল, তা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ে। খালের বর্তমান অবস্থার পেছনে প্রধান কারণগুলো- পলি জমে ভরাট হওয়া, নদী ও বৃষ্টির পানি থেকে আসা পলি ধীরে ধীরে খাল ভরাট করে ফেলে। নিয়মিত খনন বা ড্রেজিং না হওয়ায় প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। খালের কিছু অংশ ব্যক্তিগত ব্যবহারের আওতায় চলে যায়।

 

স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করেনি। ফলে যে খাল একসময় জীবনদায়ী ছিল, তা ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বর্তমানে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নেতৃত্ব ও উপস্থিতির বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হলেও মূল গুরুত্ব থাকা উচিত এর বাস্তব প্রয়োগে। মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর মাধ্যমে এই পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধনের ঘোষণা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল উদ্বোধন নয়, বরং-দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন,টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা।

 

উলাশী-যদুনাথপুর খাল শুধু একটি কৃষি অবকাঠামো নয়, এটি একটি পরিবেশগত ব্যবস্থা। তাই এর পুনঃখননকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি একটি নদী-খাল-জলাভূমি সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থার পুনর্গঠন হিসেবে দেখা জরুরি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই ভূখ-, বিশেষ করে যশোর এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত দুই দশকে এই অঞ্চলে তিনটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে-বৃষ্টি কখনও অতি বেশি, আবার কখনও দীর্ঘ খরা।

 

এই অনিশ্চয়তা কৃষি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। অপরিকল্পিত সড়ক, বাঁধ এবং ভরাট হওয়া খালগুলো পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বর্ষায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বাড়ায় পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এই তিনটি সংকট একসাথে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ অবস্থায় উলাশী খালের মতো একটি জলপথ পুনরায় সচল করা কেবল ঐতিহ্য নয়, বরং একটি পরিবেশগত প্রয়োজন। বর্তমান উন্নয়ন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-প্রাকৃতিক খাল ব্যবস্থা কি আধুনিক অবকাঠামোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে?

 

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে-রাস্তা নির্মাণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা খালের সঙ্গে সমন্বিত নয়, নগরায়ন ও কৃষিজমি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় নেই, ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। উলাশী খালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসময় যে খাল ছিল জীবন্ত জলপথ, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বিচ্ছিন্ন জলাশয়ে। খাল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রযুক্তি নয়, বরং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার অভাব। প্রধান সমস্যা-একবার খনন করে দায়িত্ব শেষ মনে করা হয়।

 

নতুন প্রকল্পে অর্থ থাকলেও পুরোনো প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রাম পর্যায়ে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি অনেক জায়গায় নিষ্ক্রিয়। খাল দখল বা ভরাট এই কাঠামোগত দুর্বলতা গুলোই উলাশী খালকে ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় অবস্থায় নিয়ে গেছে। উলাশী খালের পরিবেশগত ভূমিকা বহুমাত্রিক-বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে কৃষিজমি রক্ষা করা। খাল পানির প্রাকৃতিক রিচার্জ সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। খাল ও এর আশপাশে মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও পাখির আবাস তৈরি হয়। জলাধার স্থানীয় মাইক্রোক্লাইমেট নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অর্থাৎ, খাল কেবল কৃষির জন্য নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

মাননীয প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপস্থিতিতে উলাশী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বাস্তব শর্তের ওপর-খালের গভীরতা, ঢাল ও সংযোগ নদীর সঙ্গে সঠিকভাবে পরিকল্পিত হতে হবে। বেতনা নদী-এর প্রবাহ ঠিক না থাকলে খাল কার্যকর হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন জরুরি। প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময় পর খনন ও পলি অপসারণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। খালের দুই পাশ দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা: সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রামীণ মানুষের প্রত্যাশা খুব সহজ-খাল সচল হোক, পানি জমে ফসল নষ্ট না হোক, সেচ সহজলভ্য হোক, উৎপাদন বাড়ুক, তাদের কাছে উন্নয়ন মানে জটিল নীতি নয়, বরং মাঠে বাস্তব পরিবর্তন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা তাদের শেখায়-উদ্বোধন অনেক হয়েছে, কাজ কম টেকসই হয়েছে।

 

উলাশী খালের পুনঃখনন প্রকল্প কেবল একটি অবকাঠামো উদ্যোগ নয়; এটি একটি পরীক্ষা-আমরা কি ইতিহাস থেকে শিখতে পারি? জলবায়ু পরিবর্তন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ-এই তিনটি বিষয় যদি একসঙ্গে সমাধান না করা হয়, তাহলে যে কোনো খাল খনন প্রকল্প কাগজে সফল হলেও বাস্তবে ব্যর্থ হতে পারে। উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন এখন আর কেবল একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং উন্নয়ন-দর্শনের প্রতীকে। পাঁচ দশক আগে যে খালকে ঘিরে একটি কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল, আজ তা আবার আলোচনায় এসেছে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-এটি কি কেবল উন্নয়ন প্রকল্প, নাকি উন্নয়নের ভাষায় রাজনৈতিক বার্তাও? বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ইতিহাসে প্রায় সব বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে রাজনীতি গভীরভাবে যুক্ত।

 

উলাশী খালের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরাসরি মাঠে নেমে যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, তা ছিল রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণের এক প্রতীকী রূপ। আজ আবার যখন সেই খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে তারেক রহমান-এর উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা আলোচনায় এসেছে, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন বিশ্লেষণের প্রশ্ন হলো-এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কি উন্নয়নকে শক্তিশালী করে, নাকি কখনও কখনও তা প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে? ১৯৭৬ সালের খাল খনন ছিল এই ধারার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

 

যেখানে-পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো শক্তিশালী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাইরে টেকসই ব্যবস্থা থাকে, বর্তমান সময়ে উলাশী খালের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই দ্বিতীয় ধারার ওপর। উলাশী খাল পুনঃখনন সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে-পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হলে-একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হবেবোরো ধানের আবাদ আরও বিস্তৃত হবে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে। খাল পুনঃখনন ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ কাজে-স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বাড়বে, মৌসুমি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অতিরিক্ত উৎপাদন-চালকল, কৃষি-প্রসেসিং, বাজার সম্প্রসারণ, এসব খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। অর্থনীতির ভাষায়, একটি খাল পুনঃখনন শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।

 

এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে-পরিবহন খাতে, স্থানীয় বাজারে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়, এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও। যখন কৃষকের আয় বাড়ে, তখন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, যা পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিকে সক্রিয় করে। বাংলাদেশের বহু উন্নয়ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বলে-প্রকল্প শুরু হওয়া সহজ, কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন। উলাশী খালের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে-নতুন সরকার এলে অনেক প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে। প্রথম খননের পর নিয়মিত পরিচর্যা না হলে খাল আবার ভরাট হবে। খালের জায়গা ধীরে ধীরে দখল হয়ে যেতে পারে। বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী বাজেট না থাকলে প্রকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

উলাশী খালকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন-শুধু উলাশী খাল নয়, পুরো বেতনা নদী-নির্ভর পানি ব্যবস্থাকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। প্রবাহ, পলি ও পানি স্তর পর্যবেক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে জনগণকে সরাসরি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে। খাল দখল বা দূষণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উলাশী খালের ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়-উন্নয়ন কি কেবল উদ্বোধনের ছবি, নাকি ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া? ১৯৭৬ সালে খাল খনন ছিল অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

 

আজকের চ্যালেঞ্জ হলো সেই অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। উলাশী খাল পুনঃখনন প্রকল্প সফল হলে এটি হতে পারে-কৃষি পুনর্জাগরণের প্রতীক, জলবায়ু অভিযোজনের মডেল, গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকা শক্তি, কিন্তু ব্যর্থ হলে এটি যোগ করবে আরেকটি অধ্যায়-যেখানে ইতিহাসের একটি উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অবহেলায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর। উলাশী খাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়-উন্নয়ন কোনো একক ঘটনার নাম নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোদাল দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু শেষ হয় ব্যবস্থাপনা, নীতি এবং মানুষের অংশগ্রহণে। ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হয় দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

Ads small one

জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় নিয়মিত একটি মামলার আসামি হিসেবে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেনÑসাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শহরের সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা শেখ জাহাঙ্গীর কবির (৪৭) এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ও ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দা এস এম তুহিনুর রহমান (৩৬)।
সাতক্ষীরা সদর থানা-পুলিশ জানায়, জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেতৃত্বে উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল্লাহিল আরিফ নিশাত ও সমীর গাইনসহ পুলিশের একটি দল এই অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই নেতার বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকালই তাঁদের পুলিশ প্রহরায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: বিপন্ন গ্রামীণ সড়ক ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার শঙ্কা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: বিপন্ন গ্রামীণ সড়ক ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার শঙ্কা

যশোরের কেশবপুর উপজেলায় মৎস্য ঘের নীতিমালা অমান্য করে সরকারি রাস্তা ও পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে মাছ চাষের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উপজেলায় ৪ হাজার ৬৫৮টি মৎস্য ঘেরের একটি বড় অংশই গড়ে উঠেছে সরকারি আইন ও পরিবেশগত বিধিমালাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। অনেক প্রভাবশালী ঘের মালিক সরকারি পাকা ও কাঁচা সড়কগুলোকে তাঁদের ঘেরের বেড়িবাঁধ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর ফলে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শতাধিক গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন ধ্বংসের মুখে পড়েছে, তেমনি সরকারি খাল ও পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নব্বইয়ের দশক থেকে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিল, খাল ও নদীর অববাহিকা দখল করে মাছ চাষ শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে এই প্রবণতা গ্রামীণ সড়কের বুক পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। গণমাধ্যম জানাচ্ছে, যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের একাংশসহ কেশবপুরের বহু গুরুত্বপূর্ণ পাকা ও কাঁচা রাস্তার শোল্ডার ও পিচের অংশ ঘেরের পানির কারণে ধসে যাচ্ছে। ফলে যানবাহন ও জনসাধারনের চলাচলের সাধারণ পথগুলো এখন বিপজ্জনক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী, যেকোনো সড়ক থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পৃথক বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়েছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল করে দেওয়ায়। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা খাল ও কালভার্টের মুখ বন্ধ করে ব্যক্তিগত মৎস্য ঘের তৈরি করায় বৃষ্টির পানি নামার পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে কাদার বিল, মহাদেবপুর বিল, পাঁচপোতার বিলসহ ওই অঞ্চলের অন্তত এক ডজন বিশাল বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ এখন হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থারই ক্ষতি হবে না, বরং কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং বিল এলাকার হাজার হাজার নি¤œআয়ের মানুষ ও মৎস্যজীবী দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা সংকটে পড়বেন।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় মৎস্য বিভাগ মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সচেতনতামূলক সভা করলেও তা প্রভাবশালী ঘের মালিকদের থামাতে পারছে না। নামমাত্র জরিমানা বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এই কাঠামোগত ক্ষতি রোধে কোনো স্থায়ী সমাধান আনছে না। সরকারি সম্পদ ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা জিম্মি করে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের এই অতি-মুনাফালোভী বৈরী আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আমরা মনে করি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষা করতে হলে মৎস্য ঘের নীতিমালার কঠোর ও আপসহীন বাস্তবায়ন জরুরি। যেসব ঘের মালিক সরকারি রাস্তা বাঁধ হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেবল জরিমানা নয়, বরং ফৌজদারি আইনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে অবৈধভাবে দখলকৃত খাল ও কালভার্টের মুখ অবিলম্বে উন্মুক্ত করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক উন্নয়ন টেকসই হতে পারে নাÑসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অনুধাবন করে দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ নেবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

আশাশুনিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ
আশাশুনিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা

আশাশুনি প্রতিনিধি: আশাশুনি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অংশ গ্রহণে ক্লাস্টারভিত্তিক মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বেলা ১১টায় উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউআরসি ট্রেনিং সেন্টারে ৪টি ক্লাস্টারের এই পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার বর্মনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপজেলার ১০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা অংশ নেন। সভায় আলোচনায় অংশ নেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান, ঝংকর ঢালী, সোহাগ আলম ও আশেকুজ্জামান।
আশাশুনি সদর, শ্রীউলা, চম্পাখালী ও বুধহাটা ক্লাস্টারের শিক্ষকদের নিয়ে আয়োজিত এই সভায় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষকদের হাজিরা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও শিক্ষার মান উন্নয়ন, চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের তদারকি, জুন ক্লোজিংয়ের বিবিধ ভাউচার জমা এবং বিদ্যালয়গুলোতে ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) গঠনের সার্বিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক বিষয়ে আলোচনা করা হয়।