কোর্ট ফি জালিয়াতি: সেই পিওন সিরাজুল অবশেষে গ্রেপ্তার
নিজস্ব প্রতিনিধি: কোর্ট ফি জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মূল হোতা সাতক্ষীরা যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের অফিস সহায়ক (পিওন) মো. সিরাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের সামনে থেকে সদর থানা-পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার হওয়া সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি জেলা শহরের ফুড অফিস মোড় এলাকায় বসবাস করছেন।
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল কালিগঞ্জ সহকারী জজ আদালতে একটি মামলায় ছয় হাজার টাকার দুটি ভুয়া কোর্ট ফি দাখিল করা হয়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে আদালতের সেরেস্তাদার মমতাজ বেগম জেলা ট্রেজারি অফিসে প্রতিবেদন তলব করেন। ট্রেজারি অফিস থেকে জানানো হয়, ওই কোর্ট ফি তাদের অফিস থেকে ইস্যু করা হয়নি, অর্থাৎ সেটি জাল। এই ঘটনায় ২০২১ সালের ১ জুলাই সদর থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করা হয়।
মামলার পর পুলিশ আইনজীবী সহকারী কেরামত আলীকে গ্রেপ্তার করে। কেরামত আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানান, তিনি স্ট্যাম্প ভেন্ডর রাজীবুল্লাহর কাছ থেকে এই কোর্ট ফি কিনেছিলেন। আর রাজীবুল্লাহ তাঁর দুলাভাই ও জজ কোর্টের পিওন সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে এই জাল কোর্ট ফি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে রাজীবুল্লাহও গ্রেপ্তার হন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ফরিদ আহম্মদ ২০২৩ সালের ৩০ মে এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এতে সিরাজুল ইসলাম, কেরামত আলী ও রাজীবুল্লাহকে আসামি করা হলেও সিরাজুলকে ‘পলাতক’ দেখানো হয়। অথচ সিরাজুল এক বিচারকের নাম ভাঙিয়ে নির্বিঘেœ তাঁর কর্মস্থলে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন এবং গত ৩০ এপ্রিল সিরাজুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই আজ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো।
সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. মঈনউদ্দিন পিওন সিরাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিরাজুল ইসলাম গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিপুল সম্পদের খতিয়ান নিয়ে আদালত পাড়ায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, ২০০৪ সালের ৭ অক্টোবর গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নৈশপ্রহরী হিসেবে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা স্কেলের বেতনে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন সিরাজুল। বর্তমানে অফিস সহায়ক হিসেবে তাঁর মূল বেতন ১৯ হাজার ৩২০ টাকা।
অথচ এই বেতনের চাকরি করেই চার বছর আগে তিনি সাতক্ষীরা শহরের ফুড অফিস মোড় এলাকায় ৪৫ লাখ টাকায় আড়াই কাঠা জমি কিনে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছেন। এ ছাড়া মাছখোলা এলাকায় ২৫ কাঠা জমি কেনাসহ নিজের ও স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ টাকা সঞ্চয় করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। একজন সামান্য পিওনের এমন আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে সিরাজুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালত পাড়ার আইনজীবী ও আইনজীবী সহকারীদের একাংশের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, সিরাজুলের কাছ থেকে সরল বিশ্বাসে কোর্ট ফি কিনে অনেক আইনজীবী ও সহকারী বিপাকে পড়েছিলেন। মূল হোতা গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন প্রকৃত জালিয়াতি চক্রের গোমর ফাঁস হবে।












