ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস চিকিৎসায় নতুন আশা: আন্তর্জাতিক গবেষণায় কলারোয়ার বিজ্ঞানী সুভাষ সাহা
নিজস্ব প্রতিনিধি: বায়ুদূষণ, ধূমপান ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে বিশ্বজুড়ে ফুসফুসের রোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট (সিওপিডি) এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে মানব ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে পুনরুদ্ধার করার এক অভিনব গবেষণা প্রকল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আর এই যুগান্তকারী বহুজাতিক গবেষণা দলের অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের সাতক্ষীরার সন্তান ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির (ইউটিএস) সিনিয়র লেকচারার ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা।
সম্প্রতি তাঁর এই আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পটি ভারতের মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক ও গবেষণা সহযোগিতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি রুপিরও বেশি গবেষণা অনুদান (গ্র্যান্ট) লাভ করেছে।
কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি: বিজ্ঞানী ড. সুভাষ চন্দ্র সাহার এই গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো—মানুষের ফুসফুসে ক্ষতিগ্রস্ত ‘সিলিয়া’র পরিবর্তে কৃত্রিম সিলিয়া ব্যবহার। সিলিয়া হলো শ্বাসনালীর অভ্যন্তরে অবস্থিত অতি সূক্ষ্ম চুলের মতো এক ধরনের গঠন, যা ফুসফুস থেকে ধূলিকণা, জীবাণু এবং মিউকাস (শ্লেষ্মা) অপসারণে প্রাকৃতিক ঝাড়ু হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন জটিল রোগের কারণে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে মানুষ তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগে। গবেষকদের আশা, কৃত্রিম সিলিয়া প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এই সমস্যার একটি স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দেবে।
প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও এআই-এর সমন্বয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ড. সুভাষ সাহা জানান, ভবিষ্যতের চিকিৎসা প্রযুক্তিতে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যৌথ সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এই প্রকল্পে উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন এবং বায়োমেডিক্যাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃত্রিম সিলিয়ার কার্যকারিতা ও রোগাক্রান্ত ফুসফুসে এর আচরণ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি (ইউটিএস) ও কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি) রায়পুর ও মতিলাল নেহরু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং আন্তর্জাতিক বিখ্যাত স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘রেজমেড’-এর গবেষকেরা যৌথভাবে কাজ করছেন।
ড. সুভাষ চন্দ্র সাহার জন্ম সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার ১ নং জয়নগর ইউনিয়নের খোর্দবাঁটরা গ্রামে। কম্পিউটেশনাল বায়োফ্লুইড মেকানিক্স এবং শ্বাসনালীতে প্লাস্টিক কণা, সিগারেটের ধোঁয়া ও ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিকবার বিশ্বখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ‘বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ’ বিজ্ঞানীর মধ্যে স্থান পেয়েছেন।
এছাড়াও তিনি অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় সিপিএপি (ঈচঅচ) থেরাপির কার্যকারিতা মূল্যায়ন, ড্রাই পাউডার ইনহেলারের নকশা উন্নতকরণ এবং নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য হাই-ফ্রিকোয়েন্সি অসিলেশন থেরাপি নিয়ে কাজ করছেন।
চিকিৎসা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পটিকে অত্যন্ত যুগান্তকারী ও উদ্ভাবনী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মানব ফুসফুসে কৃত্রিম সিলিয়া সংযোজনের ধারণাটি এখনও বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে, এই গবেষণার সফল সমাপ্তি ঘটলে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী নতুন জীবন ফিরে পাবেন।









