শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
সোহাগ হোসেন
শিশুরা একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষানির্ভর পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো সমাজের একটি অংশের শিশু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত থেকে। এবারের প্রতিপাদ্যÑ “শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করি”— আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। যে বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার, খেলাধুলা করার এবং নিজের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের কথা, সে বয়সে অনেক শিশু জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে এবং স্বাভাবিক শৈশব হারাচ্ছে।
শিশু শ্রমের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্যকে চিহ্নিত করা হলেও বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং সস্তা শ্রমের চাহিদাও এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু শ্রম সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় সমস্যাটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার প্রতিটি শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে। শিশু শ্রমের কারণে একটি শিশু যেমন নিজের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি দেশও হারায় একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে। ফলে শিশু শ্রম নিরসনকে শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
শিশু শ্রম রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ সমূহ:
প্রথমত, শিশু শ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো সন্তানদের শ্রমে পাঠাতে বাধ্য না হয়।
দ্বিতীয়ত, সকল শিশুর জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় ত্যাগকারী শিশুদের পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনা এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও আকর্ষণীয় ও বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশু শ্রম সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চতুর্থত, শিশু শ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবার, নিয়োগকর্তা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পঞ্চমত, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে শিশু শ্রম প্রতিরোধে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিশু শ্রমে জড়িত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ষষ্ঠত, ইতোমধ্যে শ্রমে জড়িত শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে শ্রম থেকে সরিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শিশু শ্রম নির্মূল কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি উন্নত ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। তাই শিশুদের হাতে শ্রমের সরঞ্জাম নয়, শিক্ষা ও স্বপ্নের আলো তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা












