খেলার জন্য জীবন বিসর্জন-ক্ষতি কার/ এম.এম হায়দার আলী
এম.এম হায়দার আলী
ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি। এই খেলাকে ঘিরে মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস, উদযাপন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই আবেগ একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ ক্ষতি কার? একটি ফুটবল দলের পরাজয় কি কখনও একজন মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে? কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ব্রাজিলের এক তরুণ সমর্থক রতনের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের পরাজয়ের পর প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের উপহাস ও নেতিবাচক ট্রল সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদি তদন্তে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে এটি কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।
রতনের বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। জীবনের স্বপ্ন তখনও শুরুই হয়েছিল। পেছনে রেখে গেলেন বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী এবং মাত্র দুই মাসের একটি নিষ্পাপ সন্তান। একটি পরিবারের হাসি মুহূর্তেই পরিণত হলো আজীবনের কান্নায়। একটি ফুটবল ম্যাচ শেষ হয়েছে, কিন্তু এই পরিবারের দুঃখের কোনো শেষ নেই। আমাদের সমাজে খেলাকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ঠাট্টা-মশকরা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই ঠাট্টা অপমান, মানসিক নির্যাতন, সামাজিক হেনস্তা কিংবা অনলাইন ট্রলে রূপ নেয়, তখন তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা প্রায়ই ভাবি, এ তো মজা করলাম। কিন্তু সেই ‘মজা’ অন্য একজনের কাছে অসহনীয় যন্ত্রণা হয়ে উঠতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ফুটবল একটি খেলা। আজ ব্রাজিল হারবে, কাল আর্জেন্টিনা হারবে, অন্যদিন অন্য কোনো দল। জয়-পরাজয় খেলারই অংশ। কিন্তু একজন মানুষ হারিয়ে গেলে তিনি আর কখনও ফিরে আসেন না। কোনো ট্রফি, কোনো জয়, কোনো তর্ক একটি মানুষের জীবনের সমান নয়। এই ঘটনার জন্য শুধু ব্যক্তিকে দায়ী করলে চলবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সবারই দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে সন্তানদের শেখাতে হবে, খেলা বিনোদনের বিষয়; কোনো দলের জয়-পরাজয় ব্যক্তিগত সম্মান বা জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার পাশাপাশি সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও সংযত হতে হবে। কাউকে হেয় করা, অপমান করা বা দলবদ্ধ ভাবে ট্রল করা কখনোই সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ নয়। মতভেদ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে গেলে সেই সমর্থনের কোনো মূল্য থাকে না।
প্রশাসন, ক্রীড়া সংগঠন এবং সামাজিক সংগঠনগুলোও এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারে। খেলা হোক আনন্দের, বিদ্বেষের নয়, এই বার্তাটি সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি, মানসিক চাপে থাকা মানুষ যেন সহজেই পরামর্শ ও সহায়তা পেতে পারেন, সে ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা প্রত্যেকে নিজের আচরণের দিকে তাকাই। একটি কটূক্তি, একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য বা একটি ট্রল কারও মনে কতটা আঘাত দিতে পারে, তা আমরা জানি না। তাই কথা বলার আগে ভাবা উচিত, আমার এই কথায় যদি একজন মানুষের জীবন অন্ধকার হয়ে যায়, তবে সেই কথার কোনো মূল্য নেই। রতনের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে। এটি হোক আমাদের বিবেক জাগ্রত করার একটি উপলক্ষ।
ফুটবল ভালোবাসি, খেলাকে ভালোবাসি, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি মানুষকে। কারণ খেলার আসল সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করা নয়, প্রতিযোগিতার মধ্যেও মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সম্মান বজায় রাখা। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ ড়ে তুলি যেখানে কোনো ফুটবল ম্যাচের ফল, কোনো ট্রল বা উপহাস আর কোনো রতনের জীবন কেড়ে নিতে না পারে। খেলার আনন্দ থাকুক মাঠে, আর মানবতার জয় হোক প্রতিটি হৃদয়ে সেই আশায়…।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট











