গর্ভে সন্তান নিয়ে নদীর নোনাজলে মায়ের জীবন সংগ্রাম
এমএ হালিম, উপকূলীয় অঞ্চল (শ্যামনগর): শরীরে হিমোগ্লোবিন আশঙ্কাজনক হারে কম। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও দুই ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। কিন্তু রক্তের দাম জোগাড় করবেন কোত্থেকে? নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে রক্তের টাকা জোগাড় করা যেন হিমালয় জয়ের সমান। তাই অসুস্থ শরীর আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নদীতে নামছেন এই লড়াকু মা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালী গ্রামের এক মুন্ডা দম্পতির ঘরে এখন একদিকে অনাগত সন্তানের অপেক্ষা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আর মাত্র দেড় মাসের মাথায় তাঁদের কোলজুড়ে আসবে নতুন অতিথি। কিন্তু প্রসূতি ওই নারী এখন মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। তিন ব্যাগ রক্তের মধ্যে এক ব্যাগ জোগাড় সম্ভব হলেও বাকি দুই ব্যাগের খরচ নিয়ে পরিবারটি দিশেহারা।
তবুও জীবন থেমে নেই। শরীরের দুর্বলতা আর মনের আতঙ্ককে সঙ্গী করেই প্রতিদিন নদীর তীরে কাদা-জলে নামেন ওই নারী। হাতে জাল নিয়ে নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে খুঁজে ফেরেন বাগদার পোনা। প্রতিটি পোনা যেন তাঁর অনাগত সন্তানের বেঁচে থাকার একেকটি আশার আলো।
তাঁর স্বামী একজন সাধারণ জেলে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি নদীতে পাড়ি জমান। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো মতে আধপেটা খেয়ে সংসার চলে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোই যেখানে বিলাসিতা, সেখানে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাঁদের কাছে পাহাড়সম বাধা।
পরিবারটির চোখেমুখে এখন একটাই স্বপ্ন-তাঁদের সন্তান যেন এই অভাবের চক্র ভেঙে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পায়। সেই আশাতেই তাঁরা প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রাম শুরু করেন।
উপকূলীয় জনপদে এই মুন্ডা দম্পতির জীবন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি এই জনপদের হাজারো মানুষের নিত্যদিনের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়রা মনে করছেন, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটু সাহায্যের হাত বাড়ালে হয়তো সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে একটি নতুন প্রাণ।






