বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাক বাজুক, বাঁচুক লোকঐতিহ্য/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৫৪ অপরাহ্ণ
ঢাক বাজুক, বাঁচুক লোকঐতিহ্য/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শরতের আকাশে সাদা মেঘের খেলা। কাশফুলের দোল। শিউলির ঘ্রাণ। আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। এই শব্দই যেন জানিয়ে দেয়Ñউৎসব আসছে। দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে ঢাকের বাদ্য ছাড়া বাঙালির শারদীয় উৎসবের কল্পনাই অসম্পূর্ণ। কিন্তু যে ঢাকের শব্দে আমাদের উৎসব প্রাণ পায়, সেই ঢাকি মানুষটির জীবন কেমনÑআমরা কি কখনো তা ভেবে দেখি? যশোরের ঝিকরগাছা, শার্শা, মনিরামপুর কিংবা ঢাকা, খুলনা-সাতক্ষীরার গ্রামীণ জনপদে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু হলেই কোথাও কোথাও ঢাকের আওয়াজ শোনা যায়। ম-পে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে, বাঁশের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, আলোকসজ্জার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যেই কোনো ম-পের এক কোণে ঢাক নিয়ে বসেন একজন শিল্পী। তাঁর হাতের তালে তালে উৎসব যেন ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়।

 

এই ঢাকিরা অধিকাংশই পেশাদার শিল্পী হলেও সারা বছর ঢাক বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন না। কৃষিকাজ, দিনমজুরি, ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা অন্য পেশার সঙ্গে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়। দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন তাঁদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ। কেউ কেউ দূরের জেলা থেকে এসে একাধিক ম-পে ঢাক বাজান। কয়েক দিনের উপার্জন দিয়ে চলে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা। অথচ তাঁদের শ্রমের মূল্য অনেক সময় উৎসবের অন্যান্য আয়োজনের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। একটি পূজাম-প সাজাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। গেট, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, মাইক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানÑসবকিছুর জন্য আলাদা বাজেট থাকে। কিন্তু ঢাকির পারিশ্রমিকের বিষয়টি অনেক সময় শেষের দিকে আসে। অথচ ম-পে ঢাক না বাজলে উৎসবের আবহই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

 

এখানেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নটি সামনে আসে। ঢাকি কি কেবল কয়েক দিনের জন্য ভাড়া করা একজন মানুষ, নাকি তিনি একজন লোকশিল্পী? উত্তরটি দ্বিতীয়টিই হওয়া উচিত। কারণ ঢাক বাজানো কেবল শব্দ তৈরি করা নয়। এর সঙ্গে তাল, ছন্দ, প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ অনুশীলন জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন পূজার আচার অনুযায়ী ঢাকের বাদ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। বিশেষ করে সন্ধিপূজার সময় ঢাকের তালে যে আবেগ তৈরি হয়, তা কোনো রেকর্ড করা সংগীত দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না। কিন্তু আধুনিকতার চাপে সেই ঐতিহ্যই আজ সংকুচিত হচ্ছে। ম-পে এখন মাইক, সাউন্ড সিস্টেম, ডিজে ও রেকর্ড করা গানের ব্যবহার বেড়েছে। এতে উৎসবের শব্দ হয়তো বেড়েছে, কিন্তু ঢাকের স্বাভাবিক আবেদন অনেক জায়গায় চাপা পড়ে যায়।

 

একসময় সন্ধ্যা নামলেই যে ঢাকের শব্দ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত, এখন তা অনেক সময় মাইকের উচ্চ শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যায়। আরও বড় সমস্যা নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। একজন ঢাকির ছেলে যদি দেখে, তার বাবাকে সারা বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে, পূজার কয়েকটি দিনের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তাহলে সে কেন এই পেশায় আসবে? ফলে অনেক পরিবারের ঢাক শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে। বাবার হাতে থাকা ঢাক হয়তো আর ছেলের হাতে উঠছে না। এটি শুধু একটি পেশার সংকট নয়; এটি লোকঐতিহ্যের সংকট। যশোরের গ্রামাঞ্চল থেকে সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর কিংবা খুলনার বিভিন্ন এলাকার পূজাম-পÑসব জায়গাতেই উৎসবের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির এই যোগ রয়েছে।

 

এসব অঞ্চলে পূজা মানেই শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এর সঙ্গে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ মানুষের মিলন এবং বহু পুরোনো লোকাচারও জড়িয়ে আছে। ঢাক, ঢোল, কাঁসি ও বাঁশি সেই সাংস্কৃতিক পরম্পরারই অংশ। তাই লোকবাদ্যকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে বর্তমানের উৎসবেও জায়গা দিতে হবে।প্রথম দায়িত্ব পূজা কমিটিগুলোর। পূজার বাজেটে ঢাকি ও অন্যান্য লোকশিল্পীর জন্য ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করা দরকার। একই শিল্পীকে বছরের পর বছর ডেকে এনে সম্পর্কের কথা বলে কম পারিশ্রমিক দেওয়া কোনোভাবেই ঐতিহ্য রক্ষার পথ নয়। শিল্পীর শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হবে।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে লোকশিল্পীদের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। তাঁদের সম্মাননা, প্রশিক্ষণ ও বাদ্যযন্ত্র কেনার জন্য সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয় পর্যায়ে লোকবাদ্য শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই শিল্পের সংযোগ তৈরি হবে। পূজা ম-প গুলোতেও হতে পারে একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ উদ্যোগÑ‘স্থানীয় লোকশিল্পীর সন্ধ্যা’। সেখানে ঢাক, কাঁসি, বাঁশি, ঢোলসহ স্থানীয় বাদ্যশিল্পীদের পরিবেশনা থাকবে। এতে উৎসবের আনন্দ যেমন বাড়বে, তেমনি শিল্পীরাও পাবেন সম্মান ও পরিচিতি। আমরা প্রযুক্তিকে অস্বীকার করছি না। আধুনিক আলোক সজ্জা থাকবে, মাইক থাকবে, ডিজিটাল আয়োজনও থাকবে। সময়ের সঙ্গে উৎসব বদলাবেÑএটাই স্বাভাবিক।

 

কিন্তু পরিবর্তনের নামে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে বাদ দেওয়া কোনো অগ্রগতি নয়। শরতের সন্ধ্যায় যখন দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসে, তখন শুধু একটি পূজাম-পের খবর আসে না; ফিরে আসে আমাদের শৈশব, গ্রামবাংলার স্মৃতি, মেলা, উৎসব আর মানুষের মিলনের গল্প। সেই শব্দ হারিয়ে গেলে ক্ষতি হবে আমাদেরই। তাই এবারের দুর্গোৎসবে শুধু বড় আয়োজন নয়, বড় করে ভাবাও প্রয়োজন। ঢাকির ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হোক। লোকবাদ্যের চর্চা বাড়–ক। নতুন প্রজন্ম ঢাক হাতে তুলে নিক। মাইকের শব্দের ভিড়েও ঢাকের নিজস্ব সুর যেন হারিয়ে না যায়।ঢাক বাজুকÑউৎসবের জন্য। ঢাকি বাঁচুকÑসম্মানের সঙ্গে। আর বেঁচে থাকুক আমাদের লোকঐতিহ্য।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

তারিক ইসলাম

‎‘সুন্দরবন’—নামটির সঙ্গে গভীর রক্তের টান যেন ‘সুন্দরী’ গাছের। যে বৃক্ষের সমৃদ্ধি আর বিশালতায় টিকে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মূল সৌন্দর্য ও পরিচয়, সেই সুন্দরী গাছই আজ আক্রান্ত এক মরণব্যাধিতে। বনজুড়ে চলছে গাছগুলোর নীরব বিদায়ের করুণ সুর। কেবল পাতা আর ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া নয়, মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে মূল কাণ্ড পর্যন্ত। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নতুন চারা গজানোর হারও। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র যে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সুন্দরী গাছের এই অসুস্থতা তারই এক মারাত্মক বার্তা।

‎সম্প্রতি সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০২৪–২৫ সালে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবীক্ষণ’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন ‘আগামরা’ বা ‘টপ-ডাইং’ (Top-Dying) রোগে আক্রান্ত। সব মিলিয়ে আক্রান্ত গাছের আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি গাছ গুরুতরভাবে মরে যাওয়ার মুখোমুখি।

‎পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ পরিচালনায় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারসহ বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণায় এই ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে।

‎সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রধান বৃক্ষ যখন একযোগে রোগাক্রান্ত হয়, তখন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমস্যা থাকে না; পুরো বনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের নোনা পানির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব মিলেই সুন্দরী গাছের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সুন্দরবনের মিষ্টি পানি ও মৃদু লবণাক্ত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকায় মাটির বায়ুসঞ্চালন কমছে, যা গাছগুলোর গোড়া ও কাণ্ডকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও পলি জমার কারণে বন নিজের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে।

‎

‎সুন্দরবন কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে বছরের পর বছর বুক দিয়ে বাংলাদেশকে আড়াল করে রেখেছে এই ম্যানগ্রোভ বন। আর সেই বনের মূল কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ সুন্দরী গাছ যদি একে একে উজাড় হয়ে যায়, তবে গোটা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ দুর্লভ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

‎

‎সুন্দরবনের এই নীরব আর্তনাদ আর উপেক্ষা করার সময় নেই। সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার:

‎

‎১. মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার: উজান থেকে সুন্দরবনমুখী নদ-নদীগুলোতে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আন্তঅঞ্চলীয় ও জাতীয় পানিসম্পদ নীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

‎

‎২.পলি নিরসন ও নদী-খাল খনন: বনের অভ্যন্তরীণ যে নদ-নদী ও খালগুলো পলি ভরাট হয়ে মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।

‎

‎৩.রোগ প্রতিরোধে জোরালো গবেষণা: আগামরা রোগের সঠিক জীবাণু বা অণুজীব শনাক্ত করে তা থেকে সুন্দরী গাছকে রক্ষায় বন অধিদপ্তর এবং বিজ্ঞানীদের সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

‎

‎৪.সুরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা ও নজরদারি: বনের যেসব এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নতুন চারা উৎপাদন ও বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

‎

‎সুন্দরবন ছাড়া আমাদের মানচিত্রের এক বিরাট অংশকে কল্পনা করা যায় না, আর সুন্দরী গাছ ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির বিপন্নতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে হয়তো মানচিত্রে ‘সুন্দরবন’ নামটি থেকে যাবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার আসল রূপকার—আমাদের ‘সুন্দরী’।

‎লেখক : তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট
পত্রদূত ডেস্ক: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় দেশের প্রথম বর্জ্য রিসাইকেল প্ল্যান্টের পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে সবঠিক থাকলে ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে চালু হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে একইসঙ্গে মিলবে সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এটি পরিচালনার জন্য দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি এলজিইডি এবং কেসিসির যৌথ সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফাস্ট ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, এটি চলমান থাকবে।
তিনি বলেন, এটি চালাবে প্রফেশনাল প্রাইভেট অপারেটর। ইতোমধ্যে কোম্পানি নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি থেকে সার, জ্বালানি তেল ও বায়োগ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ, প্লান্টের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে চালু করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টের কম্পোস্ট ও পাইরোলাইসিস প্লান্টের যন্ত্রকৌশল ম্যাটারিয়ালস এ্যান্ড ম্যাটালোজিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে কারিগরি সহায়তার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিজ্ঞ পাঁচ প্রকৌশলীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি টিম। টিমের সদস্যরা প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণে গত ১ অক্টোবর খুলনায় আসেন। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরীক্ষা শেষে তারা ঢাকায় ফিরে যান।
টিমের সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. ইনসানুল করিম, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী একেএম শামসুল হুদা, প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী, সানইয়ার্ড গ্রুপ বর্তমানে ন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানুফাকচারিং কোঃ লিঃ-এর ডিএমডি প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল জব্বার, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী মোঃ আশরাফ উদ্দিন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) প্রাক্তন চিফ সাইন্টিফিক অফিসার ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল গফুর। প্রতিনিধি দলের চারজন বুয়েট এবং বাকি একজন চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। যারা সবাই শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট মেশিনারি ডিজাইনার।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করে মতামত প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প ম্যানেজার প্রকৌশলী পিন্টু মন্ডল। তিনি বলেন, প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি দল এসেছিলেন। তারা ২/৩ দিন এখানে ছিলেন। তাদের ক্লান্তির কারণে ৩৬ ঘণ্টা পাইরোলাইসিস করা হয়নি।
পাইরোলাইসিসের প্রসেস অনুযায়ী ৬ ঘণ্টা পর তেল আসা শুরুর ২/৩ ঘণ্টা মেশিন চালানোর পর বন্ধ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে পলিথিন এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের মধ্য থেকে ১০ লিটার তেল পরীক্ষার জন্য স্যারেরা ঢাকায় নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা করে মিটিং করে মতামত প্রকল্পের পরিচালক স্যারকে জানাবেন। প্রকল্পের পরীক্ষামূলক ফলাফল সফল হয়েছে বলা যায়।
এর আগে গত ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এরপর মেশিনারিজ সম্পূর্ণ সেট আপের পর শনিবার সকালে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যায়।
বিগত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শলুয়া বাজার-সংলগ্ন ১৭ একর জমিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তা। দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (সিআরডিপি-২)’র আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এটিতে অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, তিন ধরনের বর্জ্য থেকে তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হবে। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হবে জৈব সার, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক রিসাইকেল করে উৎপাদন করা হবে জ্বালানি তেল এবং কাঁচাবাজার থেকে সংগৃহীত বর্জ্য থেকে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ। অত্যাধুনিক পাইরোলাইসিস প্রযুক্তি ব্যবহারে বায়ু দূষণের কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন ২০ টন জৈব সার, ৪ হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং উৎপাদিত বায়োগ্যাস থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। উৎপাদিত তেল ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হবে। প্রতি ব্যাচ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগবে এক সপ্তাহ।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় স্থাপিত বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট আগামী ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে। একইসঙ্গে বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গায় আরও একটি বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ডে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার প্লান্টও শিগগিরই চালু হচ্ছে। এই তিনটি রিসাইক্লিং প্লান্ট চালু হলে মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার কয়রা উপজেলায় ভাগবা গ্রামের ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। ১২ অক্টোবর বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন ভাগবা গ্রামের  মোঃ আব্বাস গাজীর পুত্র ,মোঃ জিয়ারুল ইসলাম (২২), মোঃ মাসুদ সরদারের পুত্র মোঃ জাহিদুল ইসলাম (২০), মোঃ কেনা গাজীর পুত্র, মোঃ আব্দুল আলিম গাজী (২১), মোঃ শহিদুল গাজীর পুত্র মোঃ আলী হোসেন (২১),মোঃ আয়ুব আলী মোড়লের  পুত্র, মোঃ সিফাত হোসাইন (২৪), মোঃ নজরুল শেখের পুত্র মোঃ জাকারিয়া শেখ।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ রাশেদুল আলম জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া খেলায়  ১২ অক্টোবর ভাগবা গ্রাম থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। অনলাইন জুয়া মামলায় আসামিদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।