ঢাক বাজুক, বাঁচুক লোকঐতিহ্য/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
শরতের আকাশে সাদা মেঘের খেলা। কাশফুলের দোল। শিউলির ঘ্রাণ। আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। এই শব্দই যেন জানিয়ে দেয়Ñউৎসব আসছে। দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে ঢাকের বাদ্য ছাড়া বাঙালির শারদীয় উৎসবের কল্পনাই অসম্পূর্ণ। কিন্তু যে ঢাকের শব্দে আমাদের উৎসব প্রাণ পায়, সেই ঢাকি মানুষটির জীবন কেমনÑআমরা কি কখনো তা ভেবে দেখি? যশোরের ঝিকরগাছা, শার্শা, মনিরামপুর কিংবা ঢাকা, খুলনা-সাতক্ষীরার গ্রামীণ জনপদে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু হলেই কোথাও কোথাও ঢাকের আওয়াজ শোনা যায়। ম-পে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে, বাঁশের কাঠামো তৈরি হচ্ছে, আলোকসজ্জার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যেই কোনো ম-পের এক কোণে ঢাক নিয়ে বসেন একজন শিল্পী। তাঁর হাতের তালে তালে উৎসব যেন ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়।
এই ঢাকিরা অধিকাংশই পেশাদার শিল্পী হলেও সারা বছর ঢাক বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন না। কৃষিকাজ, দিনমজুরি, ছোটখাটো ব্যবসা কিংবা অন্য পেশার সঙ্গে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়। দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন তাঁদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ। কেউ কেউ দূরের জেলা থেকে এসে একাধিক ম-পে ঢাক বাজান। কয়েক দিনের উপার্জন দিয়ে চলে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা। অথচ তাঁদের শ্রমের মূল্য অনেক সময় উৎসবের অন্যান্য আয়োজনের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। একটি পূজাম-প সাজাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। গেট, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, মাইক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানÑসবকিছুর জন্য আলাদা বাজেট থাকে। কিন্তু ঢাকির পারিশ্রমিকের বিষয়টি অনেক সময় শেষের দিকে আসে। অথচ ম-পে ঢাক না বাজলে উৎসবের আবহই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এখানেই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নটি সামনে আসে। ঢাকি কি কেবল কয়েক দিনের জন্য ভাড়া করা একজন মানুষ, নাকি তিনি একজন লোকশিল্পী? উত্তরটি দ্বিতীয়টিই হওয়া উচিত। কারণ ঢাক বাজানো কেবল শব্দ তৈরি করা নয়। এর সঙ্গে তাল, ছন্দ, প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ অনুশীলন জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন পূজার আচার অনুযায়ী ঢাকের বাদ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। বিশেষ করে সন্ধিপূজার সময় ঢাকের তালে যে আবেগ তৈরি হয়, তা কোনো রেকর্ড করা সংগীত দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা যায় না। কিন্তু আধুনিকতার চাপে সেই ঐতিহ্যই আজ সংকুচিত হচ্ছে। ম-পে এখন মাইক, সাউন্ড সিস্টেম, ডিজে ও রেকর্ড করা গানের ব্যবহার বেড়েছে। এতে উৎসবের শব্দ হয়তো বেড়েছে, কিন্তু ঢাকের স্বাভাবিক আবেদন অনেক জায়গায় চাপা পড়ে যায়।
একসময় সন্ধ্যা নামলেই যে ঢাকের শব্দ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত, এখন তা অনেক সময় মাইকের উচ্চ শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যায়। আরও বড় সমস্যা নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। একজন ঢাকির ছেলে যদি দেখে, তার বাবাকে সারা বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে, পূজার কয়েকটি দিনের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তাহলে সে কেন এই পেশায় আসবে? ফলে অনেক পরিবারের ঢাক শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে। বাবার হাতে থাকা ঢাক হয়তো আর ছেলের হাতে উঠছে না। এটি শুধু একটি পেশার সংকট নয়; এটি লোকঐতিহ্যের সংকট। যশোরের গ্রামাঞ্চল থেকে সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর কিংবা খুলনার বিভিন্ন এলাকার পূজাম-পÑসব জায়গাতেই উৎসবের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির এই যোগ রয়েছে।
এসব অঞ্চলে পূজা মানেই শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এর সঙ্গে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ মানুষের মিলন এবং বহু পুরোনো লোকাচারও জড়িয়ে আছে। ঢাক, ঢোল, কাঁসি ও বাঁশি সেই সাংস্কৃতিক পরম্পরারই অংশ। তাই লোকবাদ্যকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। তাকে বর্তমানের উৎসবেও জায়গা দিতে হবে।প্রথম দায়িত্ব পূজা কমিটিগুলোর। পূজার বাজেটে ঢাকি ও অন্যান্য লোকশিল্পীর জন্য ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করা দরকার। একই শিল্পীকে বছরের পর বছর ডেকে এনে সম্পর্কের কথা বলে কম পারিশ্রমিক দেওয়া কোনোভাবেই ঐতিহ্য রক্ষার পথ নয়। শিল্পীর শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হবে।
স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে লোকশিল্পীদের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। তাঁদের সম্মাননা, প্রশিক্ষণ ও বাদ্যযন্ত্র কেনার জন্য সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয় পর্যায়ে লোকবাদ্য শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এই শিল্পের সংযোগ তৈরি হবে। পূজা ম-প গুলোতেও হতে পারে একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ উদ্যোগÑ‘স্থানীয় লোকশিল্পীর সন্ধ্যা’। সেখানে ঢাক, কাঁসি, বাঁশি, ঢোলসহ স্থানীয় বাদ্যশিল্পীদের পরিবেশনা থাকবে। এতে উৎসবের আনন্দ যেমন বাড়বে, তেমনি শিল্পীরাও পাবেন সম্মান ও পরিচিতি। আমরা প্রযুক্তিকে অস্বীকার করছি না। আধুনিক আলোক সজ্জা থাকবে, মাইক থাকবে, ডিজিটাল আয়োজনও থাকবে। সময়ের সঙ্গে উৎসব বদলাবেÑএটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু পরিবর্তনের নামে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে বাদ দেওয়া কোনো অগ্রগতি নয়। শরতের সন্ধ্যায় যখন দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসে, তখন শুধু একটি পূজাম-পের খবর আসে না; ফিরে আসে আমাদের শৈশব, গ্রামবাংলার স্মৃতি, মেলা, উৎসব আর মানুষের মিলনের গল্প। সেই শব্দ হারিয়ে গেলে ক্ষতি হবে আমাদেরই। তাই এবারের দুর্গোৎসবে শুধু বড় আয়োজন নয়, বড় করে ভাবাও প্রয়োজন। ঢাকির ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হোক। লোকবাদ্যের চর্চা বাড়–ক। নতুন প্রজন্ম ঢাক হাতে তুলে নিক। মাইকের শব্দের ভিড়েও ঢাকের নিজস্ব সুর যেন হারিয়ে না যায়।ঢাক বাজুকÑউৎসবের জন্য। ঢাকি বাঁচুকÑসম্মানের সঙ্গে। আর বেঁচে থাকুক আমাদের লোকঐতিহ্য।
লেখক: সংবাদকর্মী






