দর্শনার্থীর ভিড়ে জমজমাট গুড়পুকুর মেলা, সন্ধ্যার সময়টুকু চান ব্যবসায়ীরা
0-0x0-0-0#
মিলন বিশ্বাস: দুই বছর পর ফিরে আসা সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা প্রতিদিনই জমে উঠছে। দুপুরের পর থেকে বাড়ছে দর্শনার্থীর আনাগোনা। বিকেল গড়াতেই শহীদ আবদুর রাজ্জাক পার্কের মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠছে প্রাণচঞ্চল। শিশুদের খেলনা, নাগরদোলা, নৌকা ও নানা বিনোদনের পাশাপাশি চলছে কেনাকাটা ও খাবারের আয়োজন। তবে দর্শনার্থীর উপস্থিতি ভালো হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেচাকেনা না হওয়ায় মেলার সময় আরও কিছুটা বাড়ানোর প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) মেলার সপ্তম দিনে দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিকেল থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় আসেন অনেকে। কেউ শিশুদের নিয়ে ঘুরছেন, কেউ কিনছেন পোশাক, প্রসাধনী, মেলামাইন, খেলনা ও গৃহস্থালি পণ্য। খাবারের দোকানগুলোতেও দেখা যায় ক্রেতাদের আনাগোনা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যার পরই মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। অথচ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রাত ৮টার মধ্যেই মেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক দর্শনার্থী মেলায় পৌঁছানোর পর কেনাকাটার সুযোগ খুব কম সময় পাচ্ছেন। এতে দর্শনার্থীর ভিড় থাকলেও সেই অনুপাতে বেচাকেনা হচ্ছে না বলে দাবি তাঁদের।
ঢাকা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকার মেলামাইন পণ্য নিয়ে মেলায় এসেছেন ব্যবসায়ী মো. সিরাজ। তাঁর দোকানে নয়জন কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের খাওয়া, দোকান পরিচালনা ও অন্যান্য খাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
সিরাজ বলেন, “বেচাকেনা খুব একটা ভালো হচ্ছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরের সময়টা আমাদের ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাত ৮টার মধ্যে মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সময়টুকু পাচ্ছি না। আমার পাঁচ সদস্যের পরিবার, আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মেলায় যে আয় হবে, তা দিয়েই সারা বছর চলতে হবে। এভাবে বেচাকেনা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হব।”
গাজীপুর থেকে গার্মেন্টসের পণ্য নিয়ে আসা ব্যবসায়ী বেলায়েত বলেন, তাঁর দোকানে বেচাকেনা প্রত্যাশার তুলনায় কম। প্রতিদিন দোকান ও খাবারসহ প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হলেও এখনো সেই অনুপাতে বিক্রি হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “সন্ধ্যার পরই কাস্টমার বেশি আসে। কিন্তু সন্ধ্যা হতে না হতেই মেলা বন্ধ হয়ে গেলে ক্রেতা কমে যায়। সময়টা একটু বাড়ানো হলে বেচাকেনা বাড়তে পারে।”
গাজীপুর থেকে শিশুদের খেলনার দোকান নিয়ে আসা মামুন বলেন, তাঁর বেচাকেনা মোটামুটি হলেও খরচ বাদ দিয়ে খুব বেশি থাকছে না। সারা বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলায় দোকান করেন তিনি। তাঁর পরিবারের তিন সদস্যের সংসার এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
মামুন বলেন, “মেলা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। বেচাকেনা একটু বাড়লে আমাদের জন্য ভালো হয়। দর্শনার্থী ভালো আছে, আশা করছি সামনে বিক্রি আরও বাড়বে।”
বগুড়া থেকে শিশুদের খেলনা নিয়ে আসা আরাফাত বলেন, টুকটাক বেচাকেনা হচ্ছে। দর্শনার্থীর সংখ্যা ভালো থাকায় সামনে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
তবে সব দোকানে বেচাকেনা কম নয়। সাতক্ষীরার সুলতানপুর থেকে খাবারের দোকান নিয়ে আসা মেহেদী হাসান বলেন, তাঁর দোকানে ভালোই বিক্রি হচ্ছে। ছোলা, বাদাম, পাপড়, কদমা ও গজাসহ বিভিন্ন খাবারের চাহিদা রয়েছে।
ভাবির সংসারের মালিক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “সন্ধ্যার পরই মেলায় মানুষের ভিড় বাড়ে। কিন্তু যে সময় বেচাকেনা হওয়ার কথা, সেই সময়ই মেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মেলা আরও কিছু সময় চললে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।”
দর্শনার্থীর উপস্থিতি বাড়লেও মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে স্বস্তির কথা জানিয়েছেন দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা। যশোরের কেশবপুর থানায় কর্মরত উপপরিদর্শক মেজবা উদ্দিন মেলায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, “মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ভালো। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসছেন, কেনাকাটা করছেন, ঘুরে দেখছেন। আশা করি কোনো সমস্যা হবে না। মেলার বাকি দিনগুলোতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা দায়িত্ব পালন করব।”
সাতক্ষীরার মেলায় যশোরের কেশবপুর থেকে বাড়তি নিরাপত্তার দায়িত্বে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার জানামতে, দীর্ঘদিন মেলাটি বন্ধ ছিল। নতুন করে মেলাটি চালু হয়েছে। কোনো দুষ্কৃতিকারী যাতে নতুন করে সমস্যা তৈরি করতে না পারে, সে জন্য বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
দুই বছর পর ফিরে আসা গুড়পুকুর মেলাকে ঘিরে সাতক্ষীরার মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে থাকছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। শিশুদের বিনোদন থেকে শুরু করে কেনাকাটা ও খাবারÑসব মিলিয়ে প্রতিদিনই উৎসবমুখর হয়ে উঠছে মেলা।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, সামনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে এবং বেচাকেনাও জমে উঠবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়টুকু বাড়ানো হলে সেই সুযোগ আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
১ অক্টোবর শুরু হওয়া গুড়পুকুর মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। ফলে সামনে আরও কয়েক দিন দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উপভোগের সুযোগ থাকছে। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ ও উপস্থিতি আরও বাড়বে এমন প্রত্যাশা ব্যবসায়ী ও আয়োজকদের।









