বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩

‎দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেলের প্রয়োজনীয়তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ
‎দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেলের প্রয়োজনীয়তা

মো. মামুন হাসান
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। বন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ছয় লাখ এক হাজার সাতশ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এই বন দেশের মোট আয়তনের চার দশমিক তেরো শতাংশ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা এই তিন জেলার মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও পরিচয়ের সঙ্গে এই বন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রসার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে, আর এই প্রবণতা যতটা সম্ভাবনার, ঠিক ততটাই ঝুঁকিরও। তাই দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখন আর নিছক একটি নীতিগত আলোচনা নয়, বরং জরুরি বাস্তবতা।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুন্দরবনে ভ্রমণ করেছেন দুই লাখ ষোলো হাজার একশ তেতাল্লিশ জন পর্যটক, যাদের মধ্যে দেশি পর্যটক দুই লাখ চোদ্দ হাজারের বেশি এবং বিদেশি পর্যটক মাত্র দুই হাজার একশ তেতাল্লিশ জন। এই ভ্রমণ থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে তিন কোটি চুরানব্বই লাখ টাকার বেশি। ব্যাপক পরিসরে হিসাব করলে সুন্দরবনের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবদান বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যেখানে মৎস্য, কাঠ, মধু ও পর্যটন সব খাত অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যাগুলো স্পষ্ট করে দেয়, সুন্দরবন কেবল একটি সংরক্ষিত বন নয়, এটি একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক ইঞ্জিনও বটে। তবে এখানেই একটি বৈষম্য চোখে পড়ে, বনের অর্থনৈতিক অবদান আর তার সংরক্ষণে বরাদ্দকৃত সম্পদের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
পর্যটন স্পটের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঐতিহ্যবাহী কটকা, কচিখালি, দুবলার চর, হিরণ পয়েন্ট, হাড়বাড়িয়া, কলাগাছিয়া ও করমজলের পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে শরণখোলার আলীবান্ধা, চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক, খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কৈলাশগঞ্জ। মোট এগারোটি পর্যটন স্পট আজ পর্যটকদের গ্রহণ করছে। তবে স্পট সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো, নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষার সম্প্রসারণ একই গতিতে হয়নি, যা উদ্বেগের একটি বড় কারণ।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সুন্দরবনের নদী ও খাল ঘেঁষে জোয়ারভাটার প্লাবনভূমিতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, যা পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। গবেষকদের মতে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতি। আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবন ঘিরে অন্তত পঁয়ত্রিশটি রিসোর্ট কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। বনভূমির সংরক্ষিত এলাকায় বিনিয়োগ যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে যে ক্ষতি হবে, তা কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
পরিবেশ দূষণ সুন্দরবনের জন্য আরেকটি জরুরি সমস্যা। নীলডুমুর বাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে যান, যা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নদীতে গিয়ে পড়ে। এই বছরের চার থেকে ছয় মে তারিখে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের উদ্যোগে কটকা, জামতলা, কচিখালি, ডিমের চর ও আন্দারমানিক এলাকায় তিন দিনের পরিষ্কার অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে প্লাস্টিক বোতল, কাচের বোতল, পরিত্যক্ত জাল ও সোলার প্যানেলের ভাঙা অংশ সংগ্রহ করা হয়। বন বিভাগও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। তবে এ ধরনের পর্যায়ক্রমিক অভিযান দিয়ে প্রতিদিনের বর্জ্য উৎপাদনের গতি সামাল দেওয়া কঠিন, যদি না পর্যটকের আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আসে এবং প্রবেশদ্বারেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো শক্তিশালী করা হয়।
ইতিবাচক দিক হলো, বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় সুন্দরবন সুরক্ষায় টাইগার রেসপন্স টিম, ডলফিন টিম ও পেট্রোল ইউনিটের কার্যক্রমের পাশাপাশি ইকো ট্যুরিজম গাইডলাইন এবং সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ী ও বনজীবীদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যাতে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশকারীদের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে ইকোট্যুরিজম সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় হরিণের বেষ্টনী ও নতুন অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, যা সঠিক দিকনির্দেশনার একটি উদাহরণ। তবে অভিজ্ঞতা বলে, নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে তার বাস্তবায়নের মধ্যে সাধারণত বড় একটি ব্যবধান থেকে যায়। এই ব্যবধান দূর করতে না পারলে সুন্দরবনের সংকট কেবল কাগজে কলমেই সমাধান হবে, বাস্তবে নয়।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বড় একটি অংশ এই জেলাকে সড়কপথে সুন্দরবন দর্শনের বিরল সুযোগ দিয়েছে, যা দেশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। এই ভৌগোলিক সুবিধা সাতক্ষীরার স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সম্ভাবনা, তবে একই সঙ্গে এটি একটি দায়ও বটে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সুযোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই সাতক্ষীরার স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও বন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো কঠিন হবে।
দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি পর্যটন স্পটের বহন ক্ষমতা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করে দৈনিক পর্যটক সংখ্যা সীমিত রাখা। দ্বিতীয়ত, প্রবেশদ্বারেই প্লাস্টিকমুক্ত ভ্রমণ নীতি বাধ্যতামূলক করা এবং বর্জ্য ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, প্রতিটি রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরকে পরিবেশগত সনদায়নের আওতায় আনা, যাতে অনুমোদনহীন স্থাপনা তৈরির সুযোগ না থাকে। চতুর্থত, স্থানীয় গাইড, নৌকা মালিক ও বনজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আয়ের সংস্থান নিশ্চিত করা, যাতে সংরক্ষণ কার্যক্রমে তাদের প্রকৃত অংশীদারিত্ব তৈরি হয়। শেষত, ঘোষিত নীতিমালা ও গাইডলাইনের বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা।
সুন্দরবন যে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য বহন করে, তার তুলনায় তার সংরক্ষণে বিনিয়োগ এখনও যথেষ্ট নয়। পর্যটন যদি পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে যে সম্পদ আজ অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আগামী দিনে তা হয়ে উঠতে পারে অপরিবর্তনীয় ক্ষতির উৎস। দায়িত্বশীল ইকো ট্যুরিজম মডেল তাই কেবল একটি নীতিগত সুপারিশ নয়, এটি সুন্দরবন এবং তার ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি অপরিহার্য শর্ত। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা

Ads small one

সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণনগর-সেনেরগাঁতী খালের সুুইসগেট বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে পাট পচানো হচ্ছে। এতে খালের পানি বিষাক্ত ও দূষিত হয়ে যেমন ব্যাপক হারে মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর—যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য বহু বছর ধরে এই জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় আজ তাঁরা কর্মহীন, ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর ঋণ ও দেনার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
কৃষিপ্রধান আমাদের এই অঞ্চলে পাট উৎপাদন ও পাট পচানো কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষির একটি খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন খালের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ ধ্বংস করা হয় এবং অন্য একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ নিস্ব ও উপবাসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই বা গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন হতে পারে না।
প্রভাবশালী মহলের সুবিধার্থে খালের ওপর নির্মিত কপোতাক্ষের পানির কপাট বা সুইচগেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করে, অথচ তা সামগ্রিক জনস্বার্থ ও সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির পরিপন্থী। উন্মুক্ত জলাধারে এভাবে পানিপ্রবাহ আটকে রাখা এবং পরিবেশদূষণ ঘটানো পরিবেশ আইন ও মৎস্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষ্ণনগর খালের সুইচগেটটি খুলে দিয়ে দ্রুত কপোতাক্ষের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দূষিত পানি সরে গিয়ে পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেনাগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। জলাশয় সবার, একে ব্যক্তিস্বার্থে জিম্মি করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন করার সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

 

 

 

শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আয়োজিত সালিস বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযোগকারীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. মোকসেদ আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ২৬ আগস্ট বিকেলে শ্যামনগর সদরে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজা মাহমুদ জানান, তাঁদের কেনা ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমিতে গত ২৫ আগস্ট চাষাবাদ করতে গেলে মোকসেদ আলীসহ কয়েকজন বাধা দেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগকারীর দাবি, সালিসে মোকসেদ আলী জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো সালিস চলাকালেই তিনি সুজা মাহমুদকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. মোকসেদ আলী নিজেকে ‘ভূমিহীন নেতা’ দাবি করে বলেন, জমিটি সরকারি খাসজমি এবং তা ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, জমিটি খাস নাকি বন্দোবস্ত দেওয়াÑতা সরকারি খতিয়ান ও নথি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হুমকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

 

শ্যামল শীল
১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয়। সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় ১৮৮২-৮৪ সালে । এ সময় নাভারনে রেলওয়ে স্টেশনও নির্মাণ করা হয়। ১৯১৪ সালে ভাইসরয় অব বৃটিশ ইন্ডিয়া কলকাতা থেকে নাভারণ হয়ে সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত রেল লিংক স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং সেটি অনুমোদনও করেন। ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়েও রেলের জায়গা রেখে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা শোনা যায়। কালেক্রমে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কি. মি. রেল লাইন নির্মাণ করা হয়। রেল নেটওয়ার্কে দেশের ৪৪টি জেলা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে যায় অবহেলিত।
দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বাণিজ্য নির্ভর ও অর্থনীতির সুতিকাগার হিসেবে সাতক্ষীরা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেছে। জেলার বিশলক্ষাধীক মানুষের যাতায়াত এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম সড়ক পথ আর তাই জেলাবাসির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা আর বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ প্রত্যাশা রেলপথ, রেল যোগাযোগ। এই মাধ্যমটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেকাংশে কম, সাতক্ষীরা বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। এবং অভ্যন্তরীন বানিজ্য নির্ভর। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী বিশ্ব বাজারে রপ্তানীর মাধ্যমে দেশ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে, এই চিংড়ী পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ, রেলপথ কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারে বিশেষত পণ্য পরিবহনে খরচ কম সহ হিমায়িত বিষয় গুলোতে সুবিধা পাবে। দেশের অন্যতম স্থল বন্দর সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহারে বিশেষ উৎসাহিত হতো যদি জেলায় রেলপথ থাকতো। আর এ ক্ষেত্রে আমদানী ও রপ্তানী কৃত পণ্য সামগ্রী ট্রাকের পরিবর্তে রেলে নিলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেনাপোল সহ দেশের অপরাপর বন্দর গুলো রেলযোগাযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। সাতক্ষীরা কৃষি প্রধান এলাকা এই জেলাকে শস্য ভান্ডার বলা হয়। কৃষক তার ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য ট্রাকের পরিবর্তে রেলে আনা নেওয়া করলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমবে। অন্যদিকে সাধারন ব্যবসায়ীরা আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য শহর হতে পণ্য সামগ্রী ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আনা নেওয়া করে থাকে যা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময় গুলোতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রী আনা নেওয়া ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল খুশি মত মূল্য নির্ধারন করে গ্রাহকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। রেলগাড়ী দৃশ্যতঃ বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং ব্যাপক ভিত্তিক পণ্য সামগ্রী বহনে ও পরিবহনে প্রস্তুত বিধায় যাতায়াত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেল গাড়ীর বিকল্প কেবলই রেলগাড়ী। সাতক্ষীরা মুন্সিগঞ্জ টু বেনাপোল, যশোর, খুলনা রেল যোগাযোগের বিষয়টি যেমন সময়ের দাবী অনুরুপ ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবীর যৌক্তিকতার সাথে সহমত ও পোষন করেছে। সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ একনেকের বৈঠকেও রেল যোগাযোগ তথা সাতক্ষীরা রেলপথে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত দৃশ্যতঃ কোন কাজ শুরু হইনি। জেলাবাসি আশা অবিলম্বে রেললাইন নির্মান কাজ শুরু হোক। সাতক্ষীরার অর্থনীতি এবং ব্যবসা বানিজ্যের নবদিগন্তের ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে রেলপথ অন্যদিকে রেলপথের অভাব হেতু সাতক্ষীরার কাঙ্খিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াত যোগাযোগ এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বিনির্মান করবে তা নয় নগরায়ন, সভ্যতা, নতুন নতুন হাট বাজার ও মোকাম সৃষ্টি করবে, গ্রামের মেঠো পথ নগরায়নের ছোয়া পাবে, আলোকিত হবে গ্রামীন জনপথ সব মিলে রেলপথ সংযুক্ত সাতক্ষীরা হবে আধুনিক, উন্নয়ন নির্ভর ব্যবসা সফল আর অর্থনীতির আলোকিত সাতক্ষীরা। কিন্তু সেই সুসময় সম্ভব কেবল মাত্র রেল পথের মাধ্যমেই। সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক মানুষের আশার প্রতীক রেল পথ কতদূর?
১১১ বছর পূর্ব থেকে সাতক্ষীরার মানুষ রেলের স্বপ্ন দেখছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, সুন্দরবন ও পর্যটন, ভারতের সাথে ব্যবসা—বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানকার মোট কৃষি জমির এক—তৃতীয়াংশের বেশি জমিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ হয়। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন মাছের এর একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ হয়। সাতক্ষীরার আম এখন বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়, কুল, ধানসহ শাক সবজির ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যার একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্নস্থান ছাড়াও দেশের বাইরে রপ্তানী হয়। সড়ক পথে সুন্দরবন ভ্রমনের একমাত্র সুযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে যে কোন যানবাহনে সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ পৌছালেই চুনকড়ি নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। পর্যটনে কক্সবাজারের পরেই সুন্দরবন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পট। বাংলাদেশ—ভারতের মধ্যকার ২৭২কি.মি. সীমান্ত রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এখানকার ভোমরা স্থল বন্দর থেকে মাত্র ৮০কি.মি. দূরত্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা শহর অবস্থিত। কোলকাতা সমুদ্র বন্দরের সবচেয়ে নিকটে রয়েছে অধুনালুপ্ত সাতক্ষীরার বসন্তপুর নৌবন্দর। এটিই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার ব্যবসা—বানিজ্যের সেতুবন্ধনকারী একমাত্র নৌবন্দর। এবছর সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম কুরিয়ারে ঢাকায় পাঠাতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির খরচ ২০ টাকার কম নয়। একই আম চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে প্রতি কেজির খরচ হয়েছে ১টাকা ৩১ পয়সা। রেলে ঝুক্কি—ঝাকি কম হওয়ায় প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ কম। ফলে রেলে আম পরিবহনে প্যাকিংসহ খরচ গড়ে ৫টাকার বেশি নয়। সাতক্ষীরা এবং চাপাইনবাবগঞ্জের এই আম পরিবহনের খরচের পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরার আম তুলনামূলক সুস্বাদু হওয়া সত্বেও পরিবহন ব্যয়ের এই পার্থক্যের কারনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পন্য পরিবহনের সিংহভাগ ছিল নদী কেন্দ্রীক। তখন সড়ক পথে খুলনায় যেতে হতো যশোর হয়ে এবং সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১৫/২০ ঘন্টা। নৌপথ বন্ধ হওয়ার পর সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন সড়ক পথ। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগন্তরকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাতক্ষীরায় সড়ক উন্নয়ন হয়েছে কম। এর অন্যতম প্রধান কারন মনে করা হয় সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা।
প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইল কোম্পানি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়। নাভারণ—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেললাইনের সম্ভাব্যতা ম্যাপে নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ পর্যন্ত ৯৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এলাকায় মোট আটটি স্টেশনের কথা বলা হয়। স্টেশনগুলোর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয় নাভারণ, বাগআচড়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, পারুলিয়া, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ম্যাপে বাঁকাল, লাবণ্যবতী, সাপমারা খাল ও কাকশিয়ালী নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নাভারন থেকে বাগআচড়া স্টেশনের দূরত্ব ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, বাগআচড়া থেকে কলারোয়া ১২ দশমিক ৬৮, কলারোয়া থেকে সাতক্ষীরা ১৪ দশমিক ২৩, সাতক্ষীরা থেকে পারুলিয়া ১৫ দশমিক ১১, পারুলিয়া থেকে কালিগঞ্জ ১৮ দশমিক ৩৭, কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর ১৩ দশমিক ৮২ ও শ্যামনগর থেকে মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের দূরত্ব হবে ১১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। প্রকল্পটি মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে আরও ১০ কি.মি. বাদ দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ গ্যারেজ বাজার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিরই পিডিপিপি প্রণয়ন করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কন্সট্রাকশন অব নিউ বিজি ট্র্যাক ফর্ম নাভারন টু সাতক্ষীরা’ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীনের কাছে থেকে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা—ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়ও রেললাইনের জায়গা ধরে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তখনও রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। কিন্তু সে প্রক্রিয়া বেশিদুর যায়নি।
এই পরিস্থিতির অবসানে জরুরিভাবে নাভারন—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর সেজন্য প্রয়োজন সাতক্ষীরার রাজনীতিবীদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা