খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ‘সম্ভাব্য’ কারণ বর্ণনা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। ল্যাব পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফলের বরাতে সংস্থাটি বলছে, রান্নার সময় উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসার কারণে মাংসের মায়োগ্লোবিন বা হিম-রঞ্জক (এক ধরনের আয়রন ও প্রোটিনযুক্ত উপাদান, যা পেশিকোষে অক্সিজেন জমা রাখে এবং এর জন্য মাংসের লাল বা গোলাপি রঙের দেখায়) পদার্থের রাসায়নিক রূপান্তরের কারণে মাংস সবুজ রঙ ধারণ করেছে।
গত ২৭ অগাস্টের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিএফএসএ। সেখানে বলা হয়, নমুনায় কোনও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা পিগমেন্ট উৎপাদনকারী সিউডোমোনাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে মাংসে কোনও পচনশীল দুর্গন্ধ বা আঠালো ভাবও ছিল না। যা নিশ্চিত করে, এই রঙ পরিবর্তন কোনও ব্যাক্টেরিয়াঘটিত বা পচনের কারণে ঘটেনি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, রেফ্রিজারেটরে রাখা মাংস স্বাভাবিক তাপমাত্রায় না এনে হঠাৎ বেশি তাপের সংস্পর্শে এলে মাংসের লাল রং তৈরির উপাদান পরিবর্তন হয়ে সবুজ রং হয়ে থাকতে পারে। তবে মাংসে ক্ষতিকারক কোনও ব্যাকটেরিয়া বা পচনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাইকগাছায় রান্নার পর সবুজ হয়ে যাওয়া মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
ল্যাবরেটরি থেকে পাওয়া পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিএফএসএর খাদ্য বিশ্লেষণ শাখার প্রতিবেদন বলছে, স্পেক্ট্রোফোটোমেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে রান্নার সময় উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসার কারণে মাংসের মায়োগ্লোবিন বা হিম-রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক রূপান্তর বা গাঠনিক পরিবর্তনের কারণে সবুজ রঙ ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএফএসএর খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘আজকেই এ প্রতিবেদন আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে এই নমুনা মাংসগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। আমাদের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে মাংসগুলো সবুজ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।’
গত ২২ জুলাই কুলনার পাইকগাছা পৌরসভার মডার্ন বেকারির কর্মচারীরা কর্মস্থলে একসঙ্গে ভোজের আয়োজন করেন। সেজন্য বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে আনেন তারা। তবে রান্নার সময় গরুর মাংসের রং বদলে সবুজ হয়ে যেতে শুরু করে। এমন দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে স্থানীয় থানায় হাজির হন রান্নার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
বেকারির কর্মচারীদের ভাষ্য, তেল-মশলা দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে রান্না শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং বদলে নীলচে-সবুজ হতে থাকে। যতই নাড়াচাড়া করা হচ্ছিল, পরিবর্তিত রং ততই গাঢ় হচ্ছিল। বিষয়টি দেখে তারা চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে অন্যদের ডাকেন। পরে রান্না করা মাংসসহ কড়াই নিয়ে প্রথমে যান তারা মাংস বিক্রেতার দোকানে। তিনিও এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হন। পরে তারা মাংসসহ কড়াই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। সেখান তাদের থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে কড়াইসহ তারা থানায় যান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবুজ মাংসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয় আলোচনা। এর প্রেক্ষিতে মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার কারণ জানতে পরীক্ষার জন্য নমুনা ২৬ জুলাই বিএফএসএর ল্যাবে পাঠানো হয়।
মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘গরুর মাংসের লালচে রঙের উপাদানকে মায়োগ্লোবিন বলা হয়। ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা মাংস হঠাৎ করে অনেক বেশি তাপের সংস্পর্শে এলে ওই উপাদানের পরিবর্তন হতে পারে। তখন মাংসের লাল রং সবুজ হয়ে যেতে পারে।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য বিশ্লেষক নাজিয়া সুলতানার স্বাক্ষরিত পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাংসের নমুনায় কোনও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা রং তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়নি। মাংসে পচা গন্ধ বা আঠালো ভাবও ছিল না। তাই মাংস পচে যাওয়ার কারণে বা কোনও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে রং পরিবর্তন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোকলেছুর রহমান বলেন, ফলাফলে ‘ধারণা করা হচ্ছে’ বলা হয়েছে। কারণ, এ ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা করা হয়। তাই সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত কারণ হিসেবে না বলে ‘ধারণা করা হচ্ছে’ বলা হয়েছে।
মাংস বিক্রেতা ইসমাইল শুরু থেকেই মাংসে কোনও সমস্যা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। তার ভাষ্য, একই মাংস থেকে আরও কয়েকজন ক্রেতার কাছে মাংস বিক্রি করা হয়েছিল। শুধু মডার্ন বেকারির কর্মচারীরাই অভিযোগ করেছিলেন।
মডার্ন বেকারির কর্মচারী লিটন হোসেন বলেন, ‘আমরা ওই মাংস খাইনি। প্রশাসনকে জানিয়ে ফিরে এসে মাংস ফেলে দিয়েছিলাম। এখন পরীক্ষার ফল পাওয়া গেছে। ওই মাংসে নাকি ক্ষতিকর কিছু ছিল না।’