মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন ও বৈশাখের সাহিত্য উৎসব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ণ
পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন ও বৈশাখের সাহিত্য উৎসব

শেখ সিদ্দিকুর রহমান
পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের সেই উজ্জ্বল সকালে, যখন প্রকৃতির বুক জুড়ে বয়ে যায় নতুন দিনের উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই সাহিত্যের আঙিনায় জন্ম নেয় এক রঙিন স্বপ্নÑ ‘পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন’। নামের মধ্যেই যেন আছে বৈশাখের উন্মাদনা, ঝড়ো হাওয়ার দোলা, আর নবজাগরণের এক অনিবার্য স্পন্দন।
এই নান্দনিক ফোল্ডারটির সম্পাদক ছিলেন বরেণ্য ছড়াকার আহমেদ সাব্বির, যার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি পুরো সংকলনটিকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। সম্পাদনা পর্ষদে ছিলেন সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রাসেল, কবি ও গল্পকার বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী এবং সুলতান মাহমুদ রতনÑযাদের সম্মিলিত প্রয়াসে ফোল্ডারটি হয়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ সাহিত্যভা-ার। নামলিপিতে কবি স ম তুহিনের সুনিপুণ ছোঁয়া এবং গ্রাফিক্সে শেখ মোস্তফার শিল্পনৈপুণ্য ফোল্ডারটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ রোদসীর চিত্রকল্পÑযা কেবল একটি অলংকরণ নয়, বরং নবপ্রজন্মের সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ফোল্ডারটির শুরুতেই স্থান পেয়েছে জাতীয় কবি, কবিতার রাজপুত্র শামসুর রাহমানের ‘বৈশাখের গান’ যেন পুরো সংকলনের জন্য এক সুরময় দরজা উন্মোচন। এরপর গদ্যে বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর ‘বৈশাখের শক্তি’ আমাদের নিয়ে যায় চিন্তার গভীরে। রোমেল রহমানের ‘বাঘ’ এবং সুলতান মাহমুদ রতনের ‘লাল দরজা’ গল্পে জীবনের নানা প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে।
ছড়া ও কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বৈশাখের রং, মাটির গন্ধ আর মানুষের আবেগ। সুপদ বিশ্বাস, নাজমুল হাসান ও আবুল হোসেন আজাদের ছড়ায় ফুটে উঠেছে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য। অন্যদিকে পল্টু বাসার, আমিরুল বাসার, মনিরুজ্জামান মুন্না, শুভ্র আহমেদ, দিলরুবা, সায়েম ফেরদৌস মিতুল, শিরিন সাদী, সৌহার্দ সিরাজ, মো. বাকি বিল্লাহ, প্রাণকৃষ্ণ সরকার, মনিরুল বারী এবং স ম তুহিনের কবিতাগুলো যেন একেকটি আলাদা অনুভবের দরজা খুলে দেয়Ñকখনো প্রেম, কখনো বেদনা, কখনো সমাজচেতনার গভীর অনুরণন।
ফোল্ডারটির আরেকটি আকর্ষণ হলো এর রঙিন তিনটি বিজ্ঞাপন, যা পুরো প্রকাশনাকে দিয়েছে বাড়তি সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা।
‘একটি গোলপাতা প্রকাশনা’Ñএই প্রকাশনা সংস্থার উদ্যোগে এমন একটি নান্দনিক সাহিত্য ফোল্ডার প্রকাশ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বর্ষবরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাদের এই প্রয়াস কেবল একটি প্রকাশনা নয়, বরং বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারাকে আরও বেগবান করার এক আন্তরিক পদক্ষেপ।
বৈশাখ মানেই নতুন করে শুরু, নতুন স্বপ্ন বোনা। সেই স্বপ্নেরই এক রঙিন প্রতিফলন ‘পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন’। নববর্ষের এই আনন্দঘন মুহূর্তে, এমন একটি সাহিত্য ফোল্ডারের প্রকাশ নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিকেলে সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদ ও অধ্যাপক আশুতোষ সরকারের সৌজন্যে আর একটি সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়, যা এই নববর্ষ উদযাপনকে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তোলে।
গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাতক্ষীরার কাটিয়া লস্করপাড়ায় সব্যসাচী আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান ছট্টুর বাসভবন প্রাঙ্গণে এক প্রাণবন্ত সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদের আয়োজনে এটি ছিল তাদের ২৭তম সাহিত্য সভা।
কবি শুভ আহমেদের সভাপতিত্বে এবং মনিরুজ্জামান ছট্টুর সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিশিষ্ট কবি, লেখক ও গবেষকদের এক মিলনমেলা বসেছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, কণ্ঠশিল্পী ও কবি মঞ্জুরুল হক, কবি শহিদুর রহমান, গীতিকার প্রাণকৃষ্ণ সরকার, তৃপ্তি মোহন মল্লিক, কবি কাজী গুলশান আরা, মনিরুজ্জামান মুন্না, লেখক ও গবেষক শেখ সিদ্দিকুর রহমানসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে লেখক ও কবিরা তাঁদের স্বরচিত লেখা পাঠ করেন এবং সেই পাঠের ওপর গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংগঠন ও সাহিত্য, কবিতার শৈল্পিক রূপ, স্মৃতিচারণ ও আবেগ এবং লেখকদের মূল্যায়ন।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিষয়ে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেন। সংগঠন ও সাহিত্য প্রসঙ্গে শেখ সিদ্দিকুর রহমান সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদের পথচলা ও এর সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। কবিতার শৈল্পিক রূপে কাজী গুলশান আরার কবিতার সংক্ষিপ্ততা ও গভীর অভিব্যক্তি এবং কবি শহিদুর রহমানের দীর্ঘ কবিতার বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা প্রশংসিত হয়।
স্মৃতিচারণ ও আবেগের জায়গায় মঞ্জুরুল হকের ‘হারানো সুর’ কবিতায় কৈশোর ও যৌবনের ফেলে আসা দিনগুলোর আকুলতা ফুটে ওঠে। এছাড়া শেখ আমিনুর রহমান কাজল তাঁর লেখায় মনিরুজ্জামান ছট্টুর স্নেহসিক্ত শৈশবের স্মৃতিগুলো প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেন।
লেখকদের মূল্যায়নে সভায় প্রাণকৃষ্ণ সরকার, তৃপ্তি মোহন মল্লিক এবং কবি সাদ্দাম হোসেনকে সফল লেখক হিসেবে অভিহিত করা হয়। পাশাপাশি শিরিন সাদীর ছোটগল্পের বিষয়বস্তু চমৎকার হলেও পাঠশৈলী নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
সব্যসাচী আবৃত্তি পরিষদের এই আয়োজনটি ছিল সাহিত্যের আড্ডায় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস। দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাত সাড়ে নয়টায় আয়োজক মনিরুজ্জামান ছট্টুর সৌজন্যে নৈশভোজের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে।
শব্দে, ছড়ায়, গল্পে আর কবিতায়—এভাবেই বৈশাখ বয়ে আনে নতুন প্রাণ, নতুন সম্ভাবনা।
সাহিত্যের এই সম্মিলিত উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, আর রেখে যায় অনুপ্রেরণার এক অমলিন ছাপ। লেখক: সাবেক ব্যাংকার

Ads small one

সুমন হত্যা মামলায় রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫২ অপরাহ্ণ
সুমন হত্যা মামলায় রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

পত্রদূত ডেস্ক: ইসলামিক বক্তা মনোয়র হোসেন মোমিনের ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালক সুমন হুসাইন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামী হাবিবুর রহমান রুবেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমা- মঞ্জুর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম বিলাস ম-ল মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেনের সাত দিনের রিমা- আবেদন শুনানী শেষে এ আদেশ দেন। গ্রেপ্তারকৃত হাবিবুর রহমান ওরফে রুবেল (২৯) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের কৈখালি গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে।

নিহত সুমন হুসাইনের চাচা ইকবাল হোসেন জানান, গত ১৯ জুলাই রবিবার রাতে আর্জেন্টিনা ও তুরস্কের মধ্যে বিশ^কাপ ফুটবলের চুড়ান্ত প্রতিযোগিতা চলছিল। রাত ১১টার দিকে ভাইপো সুমন হুসাইনকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে যায় অজ্ঞাতনামা লোকজন। পরদিন সকালে কৈখালি গ্রামের কেসমত দাই এর মাছের ঘের থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ লাশের পাশ থেকে ৩৩ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তার, দুটি লোহা কাটা ব্লেড ও সিমবিহীন একটি বাটাম ফোন উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তার (ইকবাল) ভাই আব্দুল হামিদ সরদার বাড়ি হয়ে কারো নাম উল্লেখ করে ২০ জুলাই সাতক্ষীরা সদর থানায়( জিআর-৩২৭/২৬ সদর) একটি হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টার মামলা করেন।

 

১৯ জুলাই রাতে ফোন কলের সূত্র ধরে ১৮ সেপ্টেম্বর নিজ বাড়ি থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন রুবলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমা- আবেদন করেন।
আসামীপক্ষে রিমা- শুনানীতে অংশ নেন সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাড. আব্দুল মজিদ (২)। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানীতে অংশ নেন আদালতের পুলিশ উপপরিদর্শক (সিএসআই ) মাজেদুর রহমান।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর হোসেন আসামী রুবেলের দুই দিনের রিমা- মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর তাকে কখন পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হবে তা বলা যাবে।

ভালোবাসা, বয়স, নিরাপত্তা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
ভালোবাসা, বয়স, নিরাপত্তা

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ভালোবাসার কোনো ক্যালেন্ডার নেই। নেই নির্দিষ্ট কোনো বয়সও। কখনো সমবয়সী দুজন মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক, কখনো বয়সের ব্যবধান পেরিয়েও দুটি মানুষ খুঁজে নেয় একে অপরের সঙ্গ। সেখানে বয়সের অঙ্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও মানসিক পরিপক্বতা। তবে ভালোবাসার স্বাধীনতার পাশাপাশি আছে দায়িত্বেরও একটি অদৃশ্য সীমারেখা। সেই সীমারেখার নামÑনিরাপত্তা, সম্মতি ও মর্যাদা। জীবনের পথে মানুষ কখন যে কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। পরিচয়ের পরতে পরতে জন্ম নেয় মায়া, মায়া থেকে টান, আর সেই টান কখনো কখনো পরিণত হয় ভালোবাসায়। বয়স সেখানে একটি সংখ্যা মাত্রÑএমন কথা অনেকেই বলেন। কথাটি সব ক্ষেত্রে সত্য না হলেও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক, স্বাধীন ও সম্মত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধান একাই কোনো সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে না।

 

একজন বয়সে বড় মানুষ হয়তো জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে সম্পর্কের কাছে আসেন। অন্যজন হয়তো তুলনামূলক তরুণ, কিন্তু তার অনুভূতি, চিন্তা ও জীবনবোধ গভীর হতে পারে। আবার সমবয়সী দুজন মানুষও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারেন। তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু জন্মতারিখের হিসাব নয়, বরং মানুষ দুজন কীভাবে একে অপরকে বোঝেন, সম্মান করেন এবং স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেনÑসেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম তখনই সুন্দর, যখন সেখানে অধিকারবোধের চেয়ে সম্মান বড় হয়। ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন আরেকজনকে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ দেন। সম্পর্কের সৌন্দর্য কেবল পাশাপাশি হাঁটার মধ্যে নয়; কখনো কখনো প্রিয় মানুষটির নিজস্ব পথ, নিজস্ব মত ও নিজস্ব সিদ্ধান্তকেও সম্মান করার মধ্যেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা স্পষ্ট করা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা আর শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ককে জড়িয়ে কোনো রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্ক-এক বিষয় নয়।

 

শিশুর ক্ষেত্রে বয়স কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; সেটি তার বিকাশ, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার একটি মৌলিক বিষয়। একটি শিশু আবেগ বুঝতে পারে, কাউকে পছন্দ করতে পারে, কারও প্রতি গভীর টানও অনুভব করতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতিকে প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের সমতুল্য ধরে নেওয়া নিরাপদ বা দায়িত্বশীল নয়। কারণ শিশুর মানসিক, সামাজিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এখনও বিকাশমান। তাই শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়Ñ‘সে কাকে ভালোবাসে?’ প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিতÑ‘সে কতটা নিরাপদ?’ একজন শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা, স্বাভাবিক বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতা রক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তার বয়স, ক্ষমতা, প্রভাব, অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিংবা সামাজিক অবস্থান ব্যবহার করে কোনো শিশুর ওপর আবেগগত বা অন্য কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করলে সেটিকে ভালোবাসার রোমান্টিক ভাষায় আড়াল করা যায় না। শিশুর সরলতা, বিশ্বাস বা নির্ভরশীলতাকে কখনোই সম্পর্কের বৈধতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

 

এখানে নৈতিকতার পাশাপাশি আইন ও সুরক্ষার প্রশ্নও রয়েছে। শিশুর ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব আরও বেশি। তার ‘না’কে সম্মান করতে হবে, তার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং এমন যেকোনো পরিস্থিতি থেকে তাকে রক্ষা করতে হবে, যেখানে সে ভয়, চাপ, প্রলোভন, গোপনীয়তা বা ক্ষমতার অসমতার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। কারণ শিশুর পৃথিবী এখনও তৈরি হচ্ছে। তার হাতে ভবিষ্যতের রঙতুলি। সেই ভবিষ্যৎকে কোনো সম্পর্কের আবেগ, প্রভাব বা ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষার কাছে বিসর্জন দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্পর্কেও বয়সের ব্যবধান থাকলে কিছু বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দুজনের সম্মতি কি স্বাধীন? সম্পর্কের মধ্যে কি ক্ষমতার ভারসাম্য আছে? একজন কি অন্যজনের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক বা মানসিকভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল? সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুজনের সমান স্বাধীনতা আছে কি নাÑএসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়সের ব্যবধান নিজে সমস্যা নয়; কিন্তু বয়সের সঙ্গে যদি ক্ষমতার অসমতা যুক্ত হয়, তখন সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যেতে পারে।

 

ভালোবাসা কখনো কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নাম নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের ছায়ায় আটকে রাখা নয়। ভালোবাসা মানে এমন এক সম্পর্ক, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি থেকেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণœ রাখতে পারেন। সমবয়সী সম্পর্কেরও যেমন সমস্যা থাকতে পারে, তেমনি বয়সের ব্যবধান থাকা সম্পর্কেও থাকতে পারে সৌন্দর্য, স্থিরতা ও গভীরতা। আবার বিপরীতটিও সত্য। তাই সম্পর্কের বিচার শুধু বয়স দিয়ে করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু আবেগ দিয়েও করা যায় না। প্রয়োজন বিবেক, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান।

 

সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির নিরাপত্তাই সভ্যতার বড় পরীক্ষা। আর সেই দুর্বলতার জায়গাটি যদি হয় একটি শিশু, তাহলে সেখানে কোনো অস্পষ্টতা, কোনো রোমান্টিক ব্যাখ্যা কিংবা কোনো সামাজিক আপসের সুযোগ নেই। ভালোবাসা মানুষের জীবনের সবচেয়ে কোমল অনুভূতিগুলোর একটি। তাই তাকে কলুষিত না করাই দায়িত্ব। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাধীন ও সম্মত ভালোবাসা তার মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক। আর শিশুর পৃথিবী থাকুক সম্পূর্ণ নিরাপদÑভালোবাসা, স্নেহ, শিক্ষা ও স্বপ্নে ভরা। কারণ ভালোবাসার সৌন্দর্য শুধু কাছে টানায় নয়, প্রয়োজন হলে সীমারেখা রক্ষা করাতেও। ভালোবাসার গভীরতা থাকতে পারে; কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার সীমারেখা কখনোই অতিক্রম করা যায় না।

লেখক: সংবাদকর্মী

মিনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ
মিনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

প্রকাশ ঘোষ বিধান

মিনা হলো দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি শিক্ষামূলক অ্যানিমেশন কার্টুন। ইউনিসেফ এর উদ্যোগে শিশুদের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই কার্টুনটি তৈরি করা হয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এটি বাংলাভাষী শিশুদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

মিনা কার্টুনটি শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য নয়, বরং এর প্রতিটি পর্বের পেছনে একটি গভীর সামাজিক বার্তা থাকে। মিনাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার বাবার সম্মতি আদায়ের গল্প। ডায়রিয়া প্রতিরোধে খাবার স্যালাইন তৈরি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার এবং হাত ধোয়ার গুরুত্ব। ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে খাবার বা শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং শিশু পাচার রোধে সচেতনতা তৈরি করা।

কার্টুনের প্রধান চরিত্র মিনা। সে একজন ৯ বছর বয়সী সাহসী, বুদ্ধিমান ও অনুসন্ধিৎসু মেয়ে, যে তার গ্রামের নানা সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। মিনার ছোট ভাই রাজু। সে মিনার সাথে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়। মিনার পোষা তোতাপাখি মিঠু। মিঠু অত্যন্ত চতুর এবং মিনার বিশ্বস্ত সঙ্গী, যে অনেক বিপদে মিনাকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করে। মিনার পোষা গরু লালি।
প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মীনা দিবস পালন করা হয়। ইউনিসেফের সহায়তায় ১৯৯৮ সাল থেকে এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। যার মূল উদ্দেশ্য হলো; শিশুদের বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং সমঅধিকার রক্ষা করা।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত একটি জনপ্রিয় টিভি কার্টুন মীনা। ১৯৯৩ সালে প্রথম বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের একটি অংশ হিসেবে ইউনিসেফের সহায়তায় এই কার্টুন ধারাবাহিকটি নির্মিত হয়। কার্টুন ধারাবাহিকের মূল চরিত্র বাংলা ভাষায় নির্মিত কার্টুনগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র। মীনা কার্টুন শুধু বাংলায় তৈরি হয়নি। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, নেপালি-সহ ২৯টি ভাষায় মীনা তৈরি হয়েছে। মীনা কার্টুনের মীনা চরিত্রের রূপদানকারী বিখ্যাত ভারতীয় কার্টুনিস্ট রাম মোহন এবং ইউনিসেফের নিল ম্যাককি ছিলেন কার্টুন সিরিজটির স্্রষ্টা।

মীনা দিবস হলো শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও অধিকার নিশ্চিত করার একটি সচেতনতামূলক উৎসব। বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য মীনা কার্টুন প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আয়োজিত বিভিন্ন ইভেন্ট। শিশুদের অধিকার নিয়ে সচেতনতামূলক নাটক ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়। গল্প বলা বা কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করা হয়।

মীনা কার্টুনের প্রধান চরিত্র মীনা শিক্ষার জন্য নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে যে বৈষম্য করা হতো, তা দূর করতে মীনা একটি প্রতীকী চরিত্র। এই দিনে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয় যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং সঠিক পুষ্টি গ্রহণের মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধিগুলো মীনা দিবসে শিশুদের খেলার ছলে ও আনন্দের মাধ্যমে শেখানো হয়। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিশুদের যেকোনো ধরনের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার সচেতনতা তৈরিতে এই দিবসটি বড় ভূমিকা রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে যে বৈষম্য করা হতো, তা দূর করতে মীনা একটি প্রতীকী চরিত্র। মীনা কার্টুন চরিত্রটি শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যার মাধ্যমে শিক্ষণীয় বার্তাগুলো সহজে তাদের মধ্যে পৌঁছে যায়। এই দিনে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয় যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট