পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন ও বৈশাখের সাহিত্য উৎসব
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের সেই উজ্জ্বল সকালে, যখন প্রকৃতির বুক জুড়ে বয়ে যায় নতুন দিনের উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই সাহিত্যের আঙিনায় জন্ম নেয় এক রঙিন স্বপ্নÑ ‘পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন’। নামের মধ্যেই যেন আছে বৈশাখের উন্মাদনা, ঝড়ো হাওয়ার দোলা, আর নবজাগরণের এক অনিবার্য স্পন্দন।
এই নান্দনিক ফোল্ডারটির সম্পাদক ছিলেন বরেণ্য ছড়াকার আহমেদ সাব্বির, যার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি পুরো সংকলনটিকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। সম্পাদনা পর্ষদে ছিলেন সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রাসেল, কবি ও গল্পকার বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী এবং সুলতান মাহমুদ রতনÑযাদের সম্মিলিত প্রয়াসে ফোল্ডারটি হয়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ সাহিত্যভা-ার। নামলিপিতে কবি স ম তুহিনের সুনিপুণ ছোঁয়া এবং গ্রাফিক্সে শেখ মোস্তফার শিল্পনৈপুণ্য ফোল্ডারটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ রোদসীর চিত্রকল্পÑযা কেবল একটি অলংকরণ নয়, বরং নবপ্রজন্মের সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ফোল্ডারটির শুরুতেই স্থান পেয়েছে জাতীয় কবি, কবিতার রাজপুত্র শামসুর রাহমানের ‘বৈশাখের গান’ যেন পুরো সংকলনের জন্য এক সুরময় দরজা উন্মোচন। এরপর গদ্যে বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর ‘বৈশাখের শক্তি’ আমাদের নিয়ে যায় চিন্তার গভীরে। রোমেল রহমানের ‘বাঘ’ এবং সুলতান মাহমুদ রতনের ‘লাল দরজা’ গল্পে জীবনের নানা প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে।
ছড়া ও কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বৈশাখের রং, মাটির গন্ধ আর মানুষের আবেগ। সুপদ বিশ্বাস, নাজমুল হাসান ও আবুল হোসেন আজাদের ছড়ায় ফুটে উঠেছে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য। অন্যদিকে পল্টু বাসার, আমিরুল বাসার, মনিরুজ্জামান মুন্না, শুভ্র আহমেদ, দিলরুবা, সায়েম ফেরদৌস মিতুল, শিরিন সাদী, সৌহার্দ সিরাজ, মো. বাকি বিল্লাহ, প্রাণকৃষ্ণ সরকার, মনিরুল বারী এবং স ম তুহিনের কবিতাগুলো যেন একেকটি আলাদা অনুভবের দরজা খুলে দেয়Ñকখনো প্রেম, কখনো বেদনা, কখনো সমাজচেতনার গভীর অনুরণন।
ফোল্ডারটির আরেকটি আকর্ষণ হলো এর রঙিন তিনটি বিজ্ঞাপন, যা পুরো প্রকাশনাকে দিয়েছে বাড়তি সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা।
‘একটি গোলপাতা প্রকাশনা’Ñএই প্রকাশনা সংস্থার উদ্যোগে এমন একটি নান্দনিক সাহিত্য ফোল্ডার প্রকাশ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বর্ষবরণের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাদের এই প্রয়াস কেবল একটি প্রকাশনা নয়, বরং বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারাকে আরও বেগবান করার এক আন্তরিক পদক্ষেপ।
বৈশাখ মানেই নতুন করে শুরু, নতুন স্বপ্ন বোনা। সেই স্বপ্নেরই এক রঙিন প্রতিফলন ‘পাগলা হাওয়ায় পাতার নাচন’। নববর্ষের এই আনন্দঘন মুহূর্তে, এমন একটি সাহিত্য ফোল্ডারের প্রকাশ নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিকেলে সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদ ও অধ্যাপক আশুতোষ সরকারের সৌজন্যে আর একটি সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়, যা এই নববর্ষ উদযাপনকে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তোলে।
গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাতক্ষীরার কাটিয়া লস্করপাড়ায় সব্যসাচী আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান ছট্টুর বাসভবন প্রাঙ্গণে এক প্রাণবন্ত সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদের আয়োজনে এটি ছিল তাদের ২৭তম সাহিত্য সভা।
কবি শুভ আহমেদের সভাপতিত্বে এবং মনিরুজ্জামান ছট্টুর সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিশিষ্ট কবি, লেখক ও গবেষকদের এক মিলনমেলা বসেছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, কণ্ঠশিল্পী ও কবি মঞ্জুরুল হক, কবি শহিদুর রহমান, গীতিকার প্রাণকৃষ্ণ সরকার, তৃপ্তি মোহন মল্লিক, কবি কাজী গুলশান আরা, মনিরুজ্জামান মুন্না, লেখক ও গবেষক শেখ সিদ্দিকুর রহমানসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে লেখক ও কবিরা তাঁদের স্বরচিত লেখা পাঠ করেন এবং সেই পাঠের ওপর গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংগঠন ও সাহিত্য, কবিতার শৈল্পিক রূপ, স্মৃতিচারণ ও আবেগ এবং লেখকদের মূল্যায়ন।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিষয়ে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেন। সংগঠন ও সাহিত্য প্রসঙ্গে শেখ সিদ্দিকুর রহমান সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদের পথচলা ও এর সাহিত্যিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। কবিতার শৈল্পিক রূপে কাজী গুলশান আরার কবিতার সংক্ষিপ্ততা ও গভীর অভিব্যক্তি এবং কবি শহিদুর রহমানের দীর্ঘ কবিতার বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা প্রশংসিত হয়।
স্মৃতিচারণ ও আবেগের জায়গায় মঞ্জুরুল হকের ‘হারানো সুর’ কবিতায় কৈশোর ও যৌবনের ফেলে আসা দিনগুলোর আকুলতা ফুটে ওঠে। এছাড়া শেখ আমিনুর রহমান কাজল তাঁর লেখায় মনিরুজ্জামান ছট্টুর স্নেহসিক্ত শৈশবের স্মৃতিগুলো প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেন।
লেখকদের মূল্যায়নে সভায় প্রাণকৃষ্ণ সরকার, তৃপ্তি মোহন মল্লিক এবং কবি সাদ্দাম হোসেনকে সফল লেখক হিসেবে অভিহিত করা হয়। পাশাপাশি শিরিন সাদীর ছোটগল্পের বিষয়বস্তু চমৎকার হলেও পাঠশৈলী নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
সব্যসাচী আবৃত্তি পরিষদের এই আয়োজনটি ছিল সাহিত্যের আড্ডায় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এক অনন্য প্রয়াস। দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাত সাড়ে নয়টায় আয়োজক মনিরুজ্জামান ছট্টুর সৌজন্যে নৈশভোজের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে।
শব্দে, ছড়ায়, গল্পে আর কবিতায়—এভাবেই বৈশাখ বয়ে আনে নতুন প্রাণ, নতুন সম্ভাবনা।
সাহিত্যের এই সম্মিলিত উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, আর রেখে যায় অনুপ্রেরণার এক অমলিন ছাপ। লেখক: সাবেক ব্যাংকার











