প্রসঙ্গ: আন্তর্জাতিক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের দিন
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের অবদান যেমন অসামান্য, তেমনি তাদের সংগ্রামের ইতিহাসও গভীর ও বেদনাবহ। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জ্ঞান, সৃজনশীলতা, শ্রম, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে দাসপ্রথা, ঔপনিবেশিক শোষণ, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের নির্মম অভিজ্ঞতাও তাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতি বছর ৩১ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের দিন’ পালন করে।
১৯২০ সালের ৩১ আগস্ট নিউইয়র্কে মার্কাস গার্ভির নেতৃত্বে আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা গৃহীত হয়, যার স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই ৩১ আগস্ট তারিখটি নির্বাচন করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আফ্রিকান ডায়াসপোরার অবদানকে স্বীকৃতি দিতে, মানবাধিকার রক্ষা করতে এবং বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য ও সামাজিক বর্জনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ‘এ/আরইএস/৭৫/১৭০’ রেজুলেশনের মাধ্যমে দিবসটি ঘোষণা করে। এর ফলশ্রুতিতে ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
২০২৬ সালে দিবসটি ‘আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগণের মানবাধিকার সম্প্রসারণ’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে, যা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগণের জন্য ঘোষিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক দশক (২০২৫-২০৩৪)-এর অন্তর্ভুক্ত। প্রথম দশকের (২০১৫-২০২৪) অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে এই দশকটি স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষ করে এবছরের উদযাপনে ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার, যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং ডারবান ঘোষণার ২৫ বছর পূর্তিতে মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; যার মূল লক্ষ্য অতীতের অন্যায় স্বীকার ও বর্তমানের বৈষম্য দূর করে ভবিষ্যতের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ বলতে শুধু আফ্রিকা মহাদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে নয়, বরং আফ্রিকার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী তাদের কোটি কোটি বংশধরকেও বোঝায়। ঐতিহাসিক আটলান্টিক দাস ব্যবসা, উপনিবেশবাদ এবং পরবর্তী অভিবাসনের ধারায় তারা আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে কেবল আমেরিকা অঞ্চলেই প্রায় ২০ কোটি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, হাইতি, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, জ্যামাইকা, কিউবা, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, সৌদি আরব এবং ইয়েমেনসহ বহু দেশে তারা সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আফ্রিকা মানবজাতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, আধুনিক মানুষের উৎপত্তি পূর্ব আফ্রিকায় এবং সেখান থেকেই মানবজাতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বাধিক জিনগত বৈচিত্র্য বিদ্যমান। এই বৈচিত্র্য মানব বিবর্তন, অভিযোজন এবং জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আফ্রিকান সংস্কৃতি বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। প্রায় দুই হাজারের বেশি ভাষা, অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী, গল্প বলার ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান, সঙ্গীত, নৃত্য, শিল্পকলা এবং সামাজিক মূল্যবোধ আফ্রিকার সাংস্কৃতিক ভা-ারকে অনন্য করেছে। আফ্রিকান ড্রামিং, কল-অ্যান্ড-রেসপন্স সঙ্গীতধারা এবং লোকঐতিহ্য পরবর্তীকালে জ্যাজ, ব্লুজ, রক অ্যান্ড রোল, রেগে, হিপ-হপ এবং এফ্রোবিটসের মতো বৈশ্বিক সংগীতধারার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ব সংস্কৃতি ও বিনোদন জগতে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের অবদান অসাধারণ। বব মার্লে, মাইকেল জ্যাকসন, টনি মরিসন, মায়া অ্যাঞ্জেলো, চিনুয়া আচেবে কিংবা চিমামান্দা এনগোজি আদিচির মতো ব্যক্তিত্ব বিশ্বসংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে মুহাম্মদ আলী, পেলে, মাইকেল জর্ডান, সেরেনা উইলিয়ামস, লুইস হ্যামিল্টন ও উসেইন বোল্ট শুধু সাফল্যের নজিরই স্থাপন করেননি, বরং সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও মানবিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের অবদান গভীর। লুইস লাটিমার বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহারিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গ্র্যানভিল উডস রেল যোগাযোগ প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী উদ্ভাবন করেন। নাসার কিংবদন্তি গণিতবিদ ক্যাথরিন জনসন, ডরোথি ভন এবং মেরি জ্যাকসনের অবদান যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ অভিযাত্রাকে সফল করে তোলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডা. চার্লস ড্রুর রক্ত সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কিজমেকিয়া করবেটের ভ্যাকসিন গবেষণা কোটি মানুষের জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।
মানবাধিকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্যক্তিত্বরা বিশ্ব ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে পুনর্মিলন ও শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন মানব মর্যাদা ও সমঅধিকারের সংগ্রামে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বারাক ওবামার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। কফি আনান জাতিসংঘের নেতৃত্বে শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসেও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের অবদান সুদূরপ্রসারী। ইতিহাসের এক দীর্ঘ সময়ে তাদের শ্রম বৈশ্বিক কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক যুগে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি উদ্ভাবক এবং ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। মিডিয়া, প্রযুক্তি, ফিনটেক, ফ্যাশন এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আফ্রিকান ডায়াসপোরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
তবুও বাস্তবতা হলো, আজও বহু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষ কাঠামোগত বর্ণবাদ, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং সুযোগের অসমতার মুখোমুখি হন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক দেশে বৈষম্য রয়ে গেছে। এ কারণেই জাতিসংঘের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক দশক শুধু অর্জনের মূল্যায়ন নয়, বরং বিদ্যমান অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরের আহ্বান।
আন্তর্জাতিক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের দিন কেবল একটি স্মারক দিবস নয়; এটি মানব মর্যাদা, সমতা, ন্যায়বিচার এবং বহুত্ববাদী সমাজ নির্মাণের একটি বৈশ্বিক আহ্বান। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব আরও ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে। স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের এই অঙ্গীকারই হোক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পথচলার ভিত্তি।











