প্রাকৃতিক ব্রাশ : দাঁতের যত্নে নিম ডাল
তারিক ইসলাম
ডিজিটাল যুগের আধুনিক বিজ্ঞাপনের ঝলকানিতে আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন টুথপেস্ট ও টুথব্রাশের মুখোমুখি হচ্ছি। কেমিক্যালযুক্ত পণ্য আর মেকানিক্যাল ব্রাশের ভিড়ে আমরা ভুলে যেতে বসেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের শতবর্ষী স্বাস্থ্যচর্চার অভ্যাসগুলো। গ্রামীণ জীবনের সেই চেনা দৃশ্য-সকালে ঘুম থেকে উঠে নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজা-কেবলই একটি প্রাচীন প্রথা ছিল না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল নিবিড় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
বর্তমান আধুনিক দন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভেষজ উপায়ের কার্যকারিতাকে স্বীকার করে নিয়েছে। নিমের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার ঐতিহ্যিক এই অভ্যাসের রয়েছে বহুমুখী স্বাস্থ্যগত উপকারিতা।
প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাংগাল উপাদান :
নিমের ডালে রয়েছে ‘নিমবিন’, ‘নিমবিডিন’ ও ‘মারগোসিন’ নামক শক্তিশালী জৈব উপাদান। এই রাসায়নিক উপাদানগুলো মুখের ভেতরের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকরী। আধুনিক টুথপেস্টে ব্যবহৃত কৃত্রিম উপাদানের বিপরীতে নিম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মুখগহ্বরের ক্ষতিকারক জীবাণু দমন করে।
পায়োরিয়া ও মাড়ির রোগ প্রতিরোধ :
মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা পায়োরিয়ার মতো সমস্যায় নিম ডাল ব্যবহারে অলৌকিক উপকার পাওয়া যায়। নিমের প্রদাহনাশক উপাদান মাড়ির টিস্যুকে শক্ত ও সতেজ রাখে। নিয়মিত নিম ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যায়।
মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণ :
মুখের দুর্গন্ধের প্রধান কারণ হলো দাঁতের খাঁজে জমে থাকা অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া। নিমের প্রাকৃতিক তিতকুটে রস ও সুবাস এই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে দীর্ঘ সময় মুখ সতেজ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখে। কোনো কৃত্রিম মাউথওয়াশ নিমের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ সুরক্ষা দিতে পারে না।
প্লাক ও ক্যাভিটি প্রতিরোধ :
দাঁতের ওপর জমে থাকা মেচেতা বা ‘প্লাক’ হলো ক্যাভিটি বা দাঁত ক্ষয়ের প্রধান কারণ। নিম ডাল চিবিয়ে তৈরি করা মেছওয়াক (প্রাকৃতিক ব্রাশ) দাঁতের এনামেলকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই দাঁতের ফাঁকে থাকা প্লাক ও খাবারের কণা দূর করতে সাহায্য করে। নিমের প্রাকৃতিক রস এসিডিক প্রভাব কমিয়ে মুখের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখে, ফলে দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
রাসায়নিক মুক্ত মুখগহ্বরের যতœ :
বাজারে প্রচলিত অনেক টুথপেস্টে ট্রাইক্লোসান, সোডিয়াম লরিল সালফেট এবং কৃত্রিম সুগন্ধি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নিম ডাল ব্যবহারে এই ধরণের কোনো রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি থাকে না। এটি সম্পূর্ণ ১০০% প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব।
আমাদের যান্ত্রিক জীবনে যেখানে সুস্থ থাকার জন্য প্রাকৃতিক উপাদানের দিকে ফিরে যাওয়ার জোয়ার উঠেছে, সেখানে আমাদের নিজস্ব লোকজ ঐতিহ্য নিমের ব্যবহারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে অন্তত দুই-একদিন সকালে প্রাকৃতিক নিমের ডাল বা অর্গানিক নিম ভিত্তিক সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সামান্য সদিচ্ছা আর প্রাচীন এই অভ্যাসের চর্চা আমাদের উপহার দিতে পারে রাসায়নিক মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর এক চিলতে অমলিন হাসি।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।



