বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩

বিয়ের দাবিতে অনশন: নৈতিক অবক্ষয়, না সামাজিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
বিয়ের দাবিতে অনশন: নৈতিক অবক্ষয়, না সামাজিক সংকট

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটি ঘটনা বারবার সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছেÑ“বিয়ের দাবিতে প্রেমিকার অনশন”, “প্রেমিকের বাড়িতে অবস্থান”, “বিয়ের দাবিতে তরুণীর আমরণ অনশন”, কিংবা “প্রেমিকের পরিবারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ”। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন ঘটনা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকে অনশনকারীকে সাহসী বলে প্রশংসা করেন, কেউ আবার এটিকে নাটক, আবেগের বহিঃপ্রকাশ কিংবা সামাজিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এসব তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেÑকেন একজন মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনশনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল প্রেম কিংবা বিয়ের প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকা যায় না।

 

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের অসম সামাজিক অবস্থান, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট, শিক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তাই বিয়ের দাবিতে অনশনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। বাংলাদেশের সমাজে বিবাহ শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি দুটি পরিবারের, অনেক সময় দুটি বংশের এবং সামাজিক মর্যাদারও বিষয়। ফলে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করা হলে এর প্রভাব ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

 

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়ে গেলে অনেক সময় তাঁরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ফলে প্রতারণার শিকার হলে অনেকের কাছে অনশনই হয়ে ওঠে শেষ প্রতিবাদের ভাষা। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা রয়েছে। প্রতিটি অনশনকারীর দাবি যে সত্য, এমনটি ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি প্রতিটি অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলাও অন্যায়। কোনো সম্পর্কের বাস্তবতা জানার আগে সামাজিক বিচার শুরু হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ এক পক্ষকে নায়ক, অন্য পক্ষকে খলনায়ক বানিয়ে ফেলে।

 

অথচ ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো তথ্য, প্রমাণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠেÑএ ধরনের ঘটনা কি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ? আংশিকভাবে উত্তর হ্যাঁ। কারণ, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং পরে দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তবে তা নিঃসন্দেহে নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া, আবেগকে ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু সমস্যার মূল এখানেই শেষ নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনো ঘটনা তখনই সামাজিক সংকটে রূপ নেয়, যখন ব্যক্তি প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলেন।

 

অনশন সেই ব্যর্থতারই প্রতীক। এটি কেবল একজন মানুষের ক্ষোভ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি এক নীরব প্রশ্নÑ“আমার কথা শোনার কেউ কি আছে?” বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী পরিবার বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। মামলা করতে গেলেও সময়, অর্থ এবং সামাজিক চাপ অনেককে নিরুৎসাহিত করে। তখন কেউ কেউ মনে করেন, জনসমর্থন আদায়ই হয়তো একমাত্র পথ। তাই অনশন, অবস্থান কিংবা সংবাদমাধ্যমের শরণাপন্ন হওয়া তাঁদের কাছে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

 

অন্যদিকে, ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহ কখনোই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আইন, মানবাধিকার এবং নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহের জন্য উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি অপরিহার্য। তাই কেবল সামাজিক চাপে কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকে বিচারহীন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াও সমান অন্যায়।

 

এই দ্বৈত বাস্তবতাই সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে প্রতারণার শিকার মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি, অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র, আইন এবং সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সম্পর্কের ধরনও বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের পরিচয় ও যোগাযোগ সহজ করেছে। কিন্তু সম্পর্ক যত সহজে তৈরি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তত সহজেই ভেঙেও যাচ্ছে।

 

দায়িত্ববোধ, প্রতিশ্রুতির মূল্য এবং পারস্পরিক সম্মানের জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সম্পর্ক পরিণত হয় অবিশ্বাসে, আর সেই অবিশ্বাস কখনো কখনো অনশনের মতো চরম পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আরও একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। আমরা কি আমাদের সন্তানদের সম্পর্কের নৈতিকতা শেখাচ্ছি? বিদ্যালয়ে আমরা গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি শেখাই; কিন্তু পারস্পরিক সম্মান, সম্মতির গুরুত্ব, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি। ফলে শিক্ষিত মানুষ তৈরি হলেও সব সময় দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি হয় না।আমাদের সমাজে প্রেমকে এখনও অনেক পরিবার সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে অনেক সম্পর্ক গোপনে এগোয়।

 

যখন সংকট তৈরি হয়, তখন আলোচনার পথ না পেয়ে তা বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ পায়। যদি পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহমর্মিতার পরিবেশ থাকত, তাহলে হয়তো অনেক ঘটনা অনশনের পর্যায়ে পৌঁছাত না। সুতরাং, বিয়ের দাবিতে অনশনকে কেবল প্রেমের ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত আবেগের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা, মূল্যবোধের সংকট এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এই সমস্যার সমাধানও তাই একমাত্র কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ।

 

নৈতিকতার সংকট ও সম্পর্কের দায়বদ্ধতামানবসমাজ টিকে থাকে কিছু মৌলিক মূল্যবোধের ওপরÑসততা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান। একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সম্পর্ক কেবল আবেগের ওপর দাঁড়ায় এবং দায়িত্ববোধের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেখান থেকেই তৈরি হয় সংকট।বর্তমান সময়ে অনেক সম্পর্ক দ্রুত তৈরি হচ্ছে, আবার দ্রুত ভেঙেও যাচ্ছে। এর পেছনে প্রযুক্তির প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু সম্পর্কের স্বাধীনতা মানেই দায়িত্বহীনতা নয়। ভালোবাসার সঙ্গে যেমন অধিকার জড়িত, তেমনি জড়িত কর্তব্যও।

 

কাউকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সরে যাওয়া শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; এটি একজন মানুষের মানসিক স্থিতি, সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশি। আমাদের সমাজে এখনো নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অনেক সময় কঠোর সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। পুরুষের ভুলকে অনেক ক্ষেত্রে সহজভাবে দেখা হলেও নারীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা সামাজিক অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দ্বৈত মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচার কখনো আবেগের ভিত্তিতে হতে পারে না।

 

একজনের অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, কোনো সভ্য সমাজে প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার সুযোগ নেই। বিয়ের দাবিতে অনশনের অন্যতম বড় কারণ হলোÑঅনেক মানুষ মনে করেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁরা দ্রুত বিচার পাবেন না। এই আস্থার সংকট দূর করা রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা করেন, মিথ্যা পরিচয় দেন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতি করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। ভুক্তভোগী যেন সহজে আইনি সহায়তা পান, অভিযোগ জানাতে ভয় না পান এবং তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়Ñএগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

কিন্তু একই সঙ্গে আইনকে কখনো সামাজিক চাপ তৈরির হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবেÑএটাই আইনের স্বাভাবিক নিয়ম। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর জনমত এমনভাবে তৈরি হয় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচার হওয়ার আগেই সামাজিকভাবে অপরাধী হয়ে যান। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ, বিচারব্যবস্থার বাইরে জনতার আদালত কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। বিয়ের দাবিতে অনশনের মতো ঘটনা আমাদের পরিবারব্যবস্থার দিকেও আঙুল তোলে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবার থেকে গোপন করে। পরে সমস্যা তৈরি হলে পরিবার হঠাৎ করে বিষয়টি জানতে পারে এবং তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শুধু ভালো ফলাফল বা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কেও শিক্ষা দেওয়া। সম্পর্ক, ভালোবাসা, দায়িত্ব, সম্মতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাÑএসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সন্তানদেরও বুঝতে হবে, আবেগের সিদ্ধান্ত জীবনের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ভালো লাগা নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া, দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষার ফলাফল ও কর্মজীবনের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু একজন মানুষকে ভালো নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।

 

বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে সম্পর্কের নৈতিকতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনি অধিকার, পারস্পরিক সম্মান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আলোচনা থাকা প্রয়োজন। কারণ, তরুণ বয়সে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পুরো জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। শিক্ষিত হওয়া আর সচেতন হওয়া এক বিষয় নয়। একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েও যদি অন্যের অনুভূতি ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমান সময়ে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ঘটনা ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু দ্রুততার এই সংস্কৃতির মধ্যে অনেক সময় সত্য হারিয়ে যায়।

বিয়ের দাবিতে অনশনের মতো বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে জড়িত থাকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সম্মান এবং ভবিষ্যৎ। তাই গণমাধ্যমের উচিত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা। কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, একপাক্ষিক বক্তব্য প্রচার কিংবা উত্তেজনা তৈরি করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার কাজ হলো মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা, কিন্তু কারও জীবনকে জনসমক্ষে অপমানের জায়গায় নিয়ে যাওয়া নয়। একটি সংবাদ যেমন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের পথ খুলে দিতে পারে, তেমনি অসতর্ক উপস্থাপন কারও জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

 

বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনাগুলোতে প্রায়ই নারীদের নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। কিন্তু মূল বিষয় হওয়া উচিতÑনারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার। একজন নারী যেন সম্পর্কের কারণে সামাজিকভাবে একঘরে না হয়ে যান, সেটি নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। একই সঙ্গে একজন পুরুষও যেন মিথ্যা অভিযোগের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার মানে কোনো পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটন করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। বিয়ের দাবিতে অনশন আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে।

 

এই আয়নায় আমরা দেখতে পাইÑসম্পর্কের সংকট, মূল্যবোধের দুর্বলতা, বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তিত রূপ। সমাধান হলো না শুধু অনশন বন্ধ করা; বরং সেই পরিস্থিতি তৈরি না করা, যেখানে একজন মানুষ নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য হন। এর জন্য প্রয়োজন পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীবনমুখী শিক্ষা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সমাজে পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি। সমাধানের পথ কোথায়? বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু কে দোষী, কে নির্দোষÑএই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। বরং খুঁজে দেখতে হবে, কেন একজন মানুষ এমন চরম অবস্থানে যেতে বাধ্য হন।

 

কোনো সুস্থ সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট অনশন, আন্দোলন বা জনসমক্ষে অপমানের পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা নয়। এর অর্থ হলো, কোথাও না কোথাও আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক যোগাযোগ এবং বিচার ব্যবস্থার মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, প্রয়োজন সম্পর্কের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা। ভালোবাসা কোনো খেলনা নয়, আবার সম্পর্ক কোনো সাময়িক বিনোদনের বিষয়ও নয়। একটি সম্পর্কের সঙ্গে একজন মানুষের আবেগ, সম্মান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পরিবারের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। তাই সম্পর্ক গড়ার আগে যেমন সততা প্রয়োজন, তেমনি সম্পর্কের পরিণতি সম্পর্কেও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

 

কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রাখা যেমন অনৈতিক, তেমনি কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রতিশোধ বা সামাজিক চাপের পথ বেছে নেওয়াও সমাধান নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের প্রতি আস্থা। এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন নাগরিক যখন মনে করেন যে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না, তখনই তিনি বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। অনশন, অবস্থান কিংবা সামাজিক চাপ তৈরির প্রবণতা অনেক সময় সেই আস্থাহীনতার ফল। তাই রাষ্ট্রকে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ প্রতারণা, হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার হলে দ্রুত আইনি সহায়তা পান।

 

অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করার সুযোগও বন্ধ করতে হবে। কারণ, ন্যায়বিচারের মূলনীতি হলোÑঅভিযোগকারী যেমন সুরক্ষা পাবেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিও তেমনি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অধিকার রাখবেন। একটি সমাজ শুধু আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না; সমাজকে টিকিয়ে রাখে মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। আজকের বড় সংকট হলোÑআমরা অনেক ক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে কথা বলি, কিন্তু দায়িত্বের কথা ভুলে যাই। ভালোবাসার অধিকার যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার দায়িত্ব। স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়।

 

ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। শুধু সফল মানুষ নয়, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করাই হতে হবে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনায় প্রায়ই সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ পুরোপুরি নারীর পক্ষে দাঁড়ান, কেউ আবার পুরুষকে সমর্থন করেন। কিন্তু প্রকৃত সমাধান পক্ষ নেওয়ার মধ্যে নয়; সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যে। নারী যদি প্রতারণার শিকার হন, তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আবার কোনো পুরুষ যদি মিথ্যা অভিযোগের শিকার হন, তাঁর সম্মান ও অধিকার রক্ষার দায়িত্বও সমাজের। একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজে নারী-পুরুষ উভয়কেই মর্যাদার সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে, আবেগের ভিত্তিতে নয়।

গণমাধ্যম সমাজের আয়না। তাই কোনো সংবেদনশীল ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনের সংকটকে শুধু চমকপ্রদ সংবাদ হিসেবে দেখলে মানুষের ক্ষতি হতে পারে। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো ঘটনার গভীরে যাওয়া, উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং সমাজের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি করা কিংবা সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হতে পারে না। ডিজিটাল যুগে একটি অভিযোগ মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

 

এটি যেমন ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অপপ্রচার ও চরিত্রহননের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, কারও বিরুদ্ধে মন্তব্য করা কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উপহাস করা মানবিকতার পরিচয় নয়। এ ধরনের ঘটনা কমাতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজনÑপ্রথমত, পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা সমস্যার সময় গোপন না করে পরিবারের সহযোগিতা নিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীবনমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে। সম্পর্ক, সম্মান, দায়িত্ব, আইন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে তরুণদের সচেতন করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে। মানুষ যেন মনে না করেন যে বিচার পেতে হলে তাঁকে রাস্তায় নামতে হবে। চতুর্থত, সমাজকে গুজব ও আবেগের পরিবর্তে যুক্তি ও মানবিকতার পথে এগোতে হবে। বিয়ের দাবিতে অনশনÑএটি শুধু একটি সামাজিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্ন আমাদের সামনে তুলে ধরেÑআমাদের সম্পর্ক কতটা দায়িত্বশীল, আমাদের পরিবার কতটা সহমর্মী, আমাদের আইন কতটা কার্যকর এবং আমাদের সমাজ কতটা মানবিক।

 

কোনো মানুষ যেন ভালোবাসায় প্রতারিত হয়ে, ন্যায়বিচারের আশায় নিজের জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য না হনÑএটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আবার কোনো মানুষ যেন সামাজিক চাপে বা মিথ্যা অভিযোগে অপমানিত না হনÑসেটিও নিশ্চিত করতে হবে।সমাধান অনশনে নয়, প্রতিশোধে নয়, সামাজিক অপমানে নয়। সমাধান হলো সততা, দায়িত্ববোধ, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। বিয়ের দাবিতে অনশনকে তাই শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের চিহ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সমাজের আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের দুর্বলতা দেখতে পাই। সেই দুর্বলতা কাটিয়ে একটি দায়িত্বশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

Ads small one

সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ কপোতাক্ষের খালে পাট পচন: জলাশয় রক্ষা ও মৎস্যজীবীদের বাঁচাতে দরকার টেকসই সমাধান

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষ্ণনগর-সেনেরগাঁতী খালের সুুইসগেট বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে পানি আটকে পাট পচানো হচ্ছে। এতে খালের পানি বিষাক্ত ও দূষিত হয়ে যেমন ব্যাপক হারে মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি তীব্র দুর্গন্ধে হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ওপর—যাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য বহু বছর ধরে এই জলাশয়ের মাছের ওপর নির্ভরশীল। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় আজ তাঁরা কর্মহীন, ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর ঋণ ও দেনার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
কৃষিপ্রধান আমাদের এই অঞ্চলে পাট উৎপাদন ও পাট পচানো কৃষকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক কর্মকা-, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কৃষির একটি খাতকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন খালের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ ধ্বংস করা হয় এবং অন্য একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ নিস্ব ও উপবাসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই বা গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন হতে পারে না।
প্রভাবশালী মহলের সুবিধার্থে খালের ওপর নির্মিত কপোতাক্ষের পানির কপাট বা সুইচগেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিস্বার্থই চরিতার্থ করে, অথচ তা সামগ্রিক জনস্বার্থ ও সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির পরিপন্থী। উন্মুক্ত জলাধারে এভাবে পানিপ্রবাহ আটকে রাখা এবং পরিবেশদূষণ ঘটানো পরিবেশ আইন ও মৎস্য সুরক্ষা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষ্ণনগর খালের সুইচগেটটি খুলে দিয়ে দ্রুত কপোতাক্ষের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে দূষিত পানি সরে গিয়ে পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরে পায়। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও দেনাগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে জরুরি সহায়তা প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। জলাশয় সবার, একে ব্যক্তিস্বার্থে জিম্মি করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপন্ন করার সংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।

 

 

 

শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে সালিসে হত্যার হুমকির অভিযোগ

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আয়োজিত সালিস বৈঠকে পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিযোগকারীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. মোকসেদ আলী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ২৬ আগস্ট বিকেলে শ্যামনগর সদরে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগকারী নকিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুজা মাহমুদ জানান, তাঁদের কেনা ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমিতে গত ২৫ আগস্ট চাষাবাদ করতে গেলে মোকসেদ আলীসহ কয়েকজন বাধা দেন এবং মারধরের হুমকি দেন। এ নিয়ে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগকারীর দাবি, সালিসে মোকসেদ আলী জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো সালিস চলাকালেই তিনি সুজা মাহমুদকে জমিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. মোকসেদ আলী নিজেকে ‘ভূমিহীন নেতা’ দাবি করে বলেন, জমিটি সরকারি খাসজমি এবং তা ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন বলেন, জমিটি খাস নাকি বন্দোবস্ত দেওয়াÑতা সরকারি খতিয়ান ও নথি দেখে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা হুমকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রেল লাইন ও সম্ভাবনা

 

শ্যামল শীল
১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয়। সেন্ট্রাল রেলওয়ে নামে পরিচিত বনগাঁ-যশোর-খুলনা ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় ১৮৮২-৮৪ সালে । এ সময় নাভারনে রেলওয়ে স্টেশনও নির্মাণ করা হয়। ১৯১৪ সালে ভাইসরয় অব বৃটিশ ইন্ডিয়া কলকাতা থেকে নাভারণ হয়ে সাতক্ষীরার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত রেল লিংক স্থাপনের নির্দেশ দেন এবং সেটি অনুমোদনও করেন। ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়েও রেলের জায়গা রেখে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়ার কথা শোনা যায়। কালেক্রমে দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কি. মি. রেল লাইন নির্মাণ করা হয়। রেল নেটওয়ার্কে দেশের ৪৪টি জেলা সংযুক্ত হয়। কিন্তু সাতক্ষীরা থেকে যায় অবহেলিত।
দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বাণিজ্য নির্ভর ও অর্থনীতির সুতিকাগার হিসেবে সাতক্ষীরা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেছে। জেলার বিশলক্ষাধীক মানুষের যাতায়াত এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম সড়ক পথ আর তাই জেলাবাসির দীর্ঘদিনের দাবী প্রত্যাশা আর বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ প্রত্যাশা রেলপথ, রেল যোগাযোগ। এই মাধ্যমটি যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ অনেকাংশে কম, সাতক্ষীরা বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। এবং অভ্যন্তরীন বানিজ্য নির্ভর। এই জেলায় উৎপাদিত চিংড়ী বিশ্ব বাজারে রপ্তানীর মাধ্যমে দেশ প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে, এই চিংড়ী পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ, রেলপথ কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারে বিশেষত পণ্য পরিবহনে খরচ কম সহ হিমায়িত বিষয় গুলোতে সুবিধা পাবে। দেশের অন্যতম স্থল বন্দর সাতক্ষীরার ভোমরায় অবস্থিত। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহারে বিশেষ উৎসাহিত হতো যদি জেলায় রেলপথ থাকতো। আর এ ক্ষেত্রে আমদানী ও রপ্তানী কৃত পণ্য সামগ্রী ট্রাকের পরিবর্তে রেলে নিলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বেনাপোল সহ দেশের অপরাপর বন্দর গুলো রেলযোগাযোগ সুবিধা পেয়ে আসছে। সাতক্ষীরা কৃষি প্রধান এলাকা এই জেলাকে শস্য ভান্ডার বলা হয়। কৃষক তার ক্ষেতে উৎপাদিত পণ্য ট্রাকের পরিবর্তে রেলে আনা নেওয়া করলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমবে। অন্যদিকে সাধারন ব্যবসায়ীরা আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন যাবৎ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য শহর হতে পণ্য সামগ্রী ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে আনা নেওয়া করে থাকে যা অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময় গুলোতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রী আনা নেওয়া ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের খেয়াল খুশি মত মূল্য নির্ধারন করে গ্রাহকদের অস্বস্তিতে ফেলছে। রেলগাড়ী দৃশ্যতঃ বিপুল সংখ্যক যাত্রী এবং ব্যাপক ভিত্তিক পণ্য সামগ্রী বহনে ও পরিবহনে প্রস্তুত বিধায় যাতায়াত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেল গাড়ীর বিকল্প কেবলই রেলগাড়ী। সাতক্ষীরা মুন্সিগঞ্জ টু বেনাপোল, যশোর, খুলনা রেল যোগাযোগের বিষয়টি যেমন সময়ের দাবী অনুরুপ ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবীর যৌক্তিকতার সাথে সহমত ও পোষন করেছে। সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ সহ একনেকের বৈঠকেও রেল যোগাযোগ তথা সাতক্ষীরা রেলপথে আনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত দৃশ্যতঃ কোন কাজ শুরু হইনি। জেলাবাসি আশা অবিলম্বে রেললাইন নির্মান কাজ শুরু হোক। সাতক্ষীরার অর্থনীতি এবং ব্যবসা বানিজ্যের নবদিগন্তের ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে রেলপথ অন্যদিকে রেলপথের অভাব হেতু সাতক্ষীরার কাঙ্খিত উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়েছে। রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াত যোগাযোগ এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বিনির্মান করবে তা নয় নগরায়ন, সভ্যতা, নতুন নতুন হাট বাজার ও মোকাম সৃষ্টি করবে, গ্রামের মেঠো পথ নগরায়নের ছোয়া পাবে, আলোকিত হবে গ্রামীন জনপথ সব মিলে রেলপথ সংযুক্ত সাতক্ষীরা হবে আধুনিক, উন্নয়ন নির্ভর ব্যবসা সফল আর অর্থনীতির আলোকিত সাতক্ষীরা। কিন্তু সেই সুসময় সম্ভব কেবল মাত্র রেল পথের মাধ্যমেই। সাতক্ষীরার বিশলক্ষাধীক মানুষের আশার প্রতীক রেল পথ কতদূর?
১১১ বছর পূর্ব থেকে সাতক্ষীরার মানুষ রেলের স্বপ্ন দেখছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, সুন্দরবন ও পর্যটন, ভারতের সাথে ব্যবসা—বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানকার মোট কৃষি জমির এক—তৃতীয়াংশের বেশি জমিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ হয়। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন মাছের এর একাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং অবশিষ্ট মাছ দেশের অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ হয়। সাতক্ষীরার আম এখন বিশ্ববাজারে জনপ্রিয়, কুল, ধানসহ শাক সবজির ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন করে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যার একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্নস্থান ছাড়াও দেশের বাইরে রপ্তানী হয়। সড়ক পথে সুন্দরবন ভ্রমনের একমাত্র সুযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। ঢাকা বা দেশের অন্যান্য স্থান থেকে যে কোন যানবাহনে সাতক্ষীরা শহরের উপর দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ পৌছালেই চুনকড়ি নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। পর্যটনে কক্সবাজারের পরেই সুন্দরবন হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্পট। বাংলাদেশ—ভারতের মধ্যকার ২৭২কি.মি. সীমান্ত রয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এখানকার ভোমরা স্থল বন্দর থেকে মাত্র ৮০কি.মি. দূরত্বে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা শহর অবস্থিত। কোলকাতা সমুদ্র বন্দরের সবচেয়ে নিকটে রয়েছে অধুনালুপ্ত সাতক্ষীরার বসন্তপুর নৌবন্দর। এটিই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার ব্যবসা—বানিজ্যের সেতুবন্ধনকারী একমাত্র নৌবন্দর। এবছর সাতক্ষীরায় উৎপাদিত আম কুরিয়ারে ঢাকায় পাঠাতে কেজি প্রতি খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে প্রতি কেজির খরচ ২০ টাকার কম নয়। একই আম চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে রেলওয়ের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠাতে প্রতি কেজির খরচ হয়েছে ১টাকা ৩১ পয়সা। রেলে ঝুক্কি—ঝাকি কম হওয়ায় প্যাকিংসহ অন্যান্য খরচ কম। ফলে রেলে আম পরিবহনে প্যাকিংসহ খরচ গড়ে ৫টাকার বেশি নয়। সাতক্ষীরা এবং চাপাইনবাবগঞ্জের এই আম পরিবহনের খরচের পার্থক্য গড়ে প্রায় ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সাতক্ষীরার আম তুলনামূলক সুস্বাদু হওয়া সত্বেও পরিবহন ব্যয়ের এই পার্থক্যের কারনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সাতক্ষীরার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পন্য পরিবহনের সিংহভাগ ছিল নদী কেন্দ্রীক। তখন সড়ক পথে খুলনায় যেতে হতো যশোর হয়ে এবং সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগতো ১৫/২০ ঘন্টা। নৌপথ বন্ধ হওয়ার পর সারাদেশের সাথে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এখন সড়ক পথ। সারাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগন্তরকারী উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সাতক্ষীরায় সড়ক উন্নয়ন হয়েছে কম। এর অন্যতম প্রধান কারন মনে করা হয় সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের সর্বশেষ জেলা।
প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইল কোম্পানি লিমিটেড সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়। নাভারণ—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেললাইনের সম্ভাব্যতা ম্যাপে নাভারণ থেকে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ গ্যারেজ পর্যন্ত ৯৮ দশমিক ৪২ কিলোমিটার এলাকায় মোট আটটি স্টেশনের কথা বলা হয়। স্টেশনগুলোর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয় নাভারণ, বাগআচড়া, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, পারুলিয়া, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর ও মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ম্যাপে বাঁকাল, লাবণ্যবতী, সাপমারা খাল ও কাকশিয়ালী নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নাভারন থেকে বাগআচড়া স্টেশনের দূরত্ব ১২ দশমিক ৪ কিলোমিটার, বাগআচড়া থেকে কলারোয়া ১২ দশমিক ৬৮, কলারোয়া থেকে সাতক্ষীরা ১৪ দশমিক ২৩, সাতক্ষীরা থেকে পারুলিয়া ১৫ দশমিক ১১, পারুলিয়া থেকে কালিগঞ্জ ১৮ দশমিক ৩৭, কালিগঞ্জ থেকে শ্যামনগর ১৩ দশমিক ৮২ ও শ্যামনগর থেকে মুন্সীগঞ্জ স্টেশনের দূরত্ব হবে ১১ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। প্রকল্পটি মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবর্তে আরও ১০ কি.মি. বাদ দিয়ে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ গ্যারেজ বাজার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয় এবং সেটিরই পিডিপিপি প্রণয়ন করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ‘কন্সট্রাকশন অব নিউ বিজি ট্র্যাক ফর্ম নাভারন টু সাতক্ষীরা’ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীনের কাছে থেকে ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৬৬২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাকিস্তান শাসন আমলে ১৯৫৮ সালে সাতক্ষীরা—ভেটখালী সড়ক নির্মাণের সময়ও রেললাইনের জায়গা ধরে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তখনও রেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। কিন্তু সে প্রক্রিয়া বেশিদুর যায়নি।
এই পরিস্থিতির অবসানে জরুরিভাবে নাভারন—সাতক্ষীরা—মুন্সিগঞ্জ রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আর সেজন্য প্রয়োজন সাতক্ষীরার রাজনীতিবীদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা