মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

বিয়ের দাবিতে অনশন: নৈতিক অবক্ষয়, না সামাজিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
বিয়ের দাবিতে অনশন: নৈতিক অবক্ষয়, না সামাজিক সংকট

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটি ঘটনা বারবার সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছেÑ“বিয়ের দাবিতে প্রেমিকার অনশন”, “প্রেমিকের বাড়িতে অবস্থান”, “বিয়ের দাবিতে তরুণীর আমরণ অনশন”, কিংবা “প্রেমিকের পরিবারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ”। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন ঘটনা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকে অনশনকারীকে সাহসী বলে প্রশংসা করেন, কেউ আবার এটিকে নাটক, আবেগের বহিঃপ্রকাশ কিংবা সামাজিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখেন। কিন্তু এসব তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেÑকেন একজন মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনশনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল প্রেম কিংবা বিয়ের প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকা যায় না।

 

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের অসম সামাজিক অবস্থান, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট, শিক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তাই বিয়ের দাবিতে অনশনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। বাংলাদেশের সমাজে বিবাহ শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি দুটি পরিবারের, অনেক সময় দুটি বংশের এবং সামাজিক মর্যাদারও বিষয়। ফলে প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করা হলে এর প্রভাব ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

 

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। সম্পর্কের কথা প্রকাশ হয়ে গেলে অনেক সময় তাঁরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ফলে প্রতারণার শিকার হলে অনেকের কাছে অনশনই হয়ে ওঠে শেষ প্রতিবাদের ভাষা। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা রয়েছে। প্রতিটি অনশনকারীর দাবি যে সত্য, এমনটি ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি প্রতিটি অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলাও অন্যায়। কোনো সম্পর্কের বাস্তবতা জানার আগে সামাজিক বিচার শুরু হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে মানুষ এক পক্ষকে নায়ক, অন্য পক্ষকে খলনায়ক বানিয়ে ফেলে।

 

অথচ ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হলো তথ্য, প্রমাণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠেÑএ ধরনের ঘটনা কি নৈতিক অবক্ষয়ের প্রমাণ? আংশিকভাবে উত্তর হ্যাঁ। কারণ, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং পরে দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তবে তা নিঃসন্দেহে নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেওয়া, আবেগকে ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু সমস্যার মূল এখানেই শেষ নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনো ঘটনা তখনই সামাজিক সংকটে রূপ নেয়, যখন ব্যক্তি প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলেন।

 

অনশন সেই ব্যর্থতারই প্রতীক। এটি কেবল একজন মানুষের ক্ষোভ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি এক নীরব প্রশ্নÑ“আমার কথা শোনার কেউ কি আছে?” বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী পরিবার বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। মামলা করতে গেলেও সময়, অর্থ এবং সামাজিক চাপ অনেককে নিরুৎসাহিত করে। তখন কেউ কেউ মনে করেন, জনসমর্থন আদায়ই হয়তো একমাত্র পথ। তাই অনশন, অবস্থান কিংবা সংবাদমাধ্যমের শরণাপন্ন হওয়া তাঁদের কাছে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

 

অন্যদিকে, ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহ কখনোই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আইন, মানবাধিকার এবং নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহের জন্য উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি অপরিহার্য। তাই কেবল সামাজিক চাপে কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকে বিচারহীন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াও সমান অন্যায়।

 

এই দ্বৈত বাস্তবতাই সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছে। একদিকে প্রতারণার শিকার মানুষের ন্যায়বিচারের দাবি, অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র, আইন এবং সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সম্পর্কের ধরনও বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের পরিচয় ও যোগাযোগ সহজ করেছে। কিন্তু সম্পর্ক যত সহজে তৈরি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তত সহজেই ভেঙেও যাচ্ছে।

 

দায়িত্ববোধ, প্রতিশ্রুতির মূল্য এবং পারস্পরিক সম্মানের জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সম্পর্ক পরিণত হয় অবিশ্বাসে, আর সেই অবিশ্বাস কখনো কখনো অনশনের মতো চরম পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আরও একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। আমরা কি আমাদের সন্তানদের সম্পর্কের নৈতিকতা শেখাচ্ছি? বিদ্যালয়ে আমরা গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি শেখাই; কিন্তু পারস্পরিক সম্মান, সম্মতির গুরুত্ব, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি। ফলে শিক্ষিত মানুষ তৈরি হলেও সব সময় দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি হয় না।আমাদের সমাজে প্রেমকে এখনও অনেক পরিবার সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে অনেক সম্পর্ক গোপনে এগোয়।

 

যখন সংকট তৈরি হয়, তখন আলোচনার পথ না পেয়ে তা বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ পায়। যদি পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহমর্মিতার পরিবেশ থাকত, তাহলে হয়তো অনেক ঘটনা অনশনের পর্যায়ে পৌঁছাত না। সুতরাং, বিয়ের দাবিতে অনশনকে কেবল প্রেমের ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত আবেগের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা, মূল্যবোধের সংকট এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এই সমস্যার সমাধানও তাই একমাত্র কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাব্যবস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ।

 

নৈতিকতার সংকট ও সম্পর্কের দায়বদ্ধতামানবসমাজ টিকে থাকে কিছু মৌলিক মূল্যবোধের ওপরÑসততা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান। একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবোধগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সম্পর্ক কেবল আবেগের ওপর দাঁড়ায় এবং দায়িত্ববোধের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেখান থেকেই তৈরি হয় সংকট।বর্তমান সময়ে অনেক সম্পর্ক দ্রুত তৈরি হচ্ছে, আবার দ্রুত ভেঙেও যাচ্ছে। এর পেছনে প্রযুক্তির প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা। কিন্তু সম্পর্কের স্বাধীনতা মানেই দায়িত্বহীনতা নয়। ভালোবাসার সঙ্গে যেমন অধিকার জড়িত, তেমনি জড়িত কর্তব্যও।

 

কাউকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সরে যাওয়া শুধু একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়; এটি একজন মানুষের মানসিক স্থিতি, সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেক বেশি। আমাদের সমাজে এখনো নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অনেক সময় কঠোর সামাজিক বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। পুরুষের ভুলকে অনেক ক্ষেত্রে সহজভাবে দেখা হলেও নারীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা সামাজিক অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দ্বৈত মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচার কখনো আবেগের ভিত্তিতে হতে পারে না।

 

একজনের অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, কোনো সভ্য সমাজে প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার সুযোগ নেই। বিয়ের দাবিতে অনশনের অন্যতম বড় কারণ হলোÑঅনেক মানুষ মনে করেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁরা দ্রুত বিচার পাবেন না। এই আস্থার সংকট দূর করা রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা করেন, মিথ্যা পরিচয় দেন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতি করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। ভুক্তভোগী যেন সহজে আইনি সহায়তা পান, অভিযোগ জানাতে ভয় না পান এবং তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়Ñএগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

কিন্তু একই সঙ্গে আইনকে কখনো সামাজিক চাপ তৈরির হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবেÑএটাই আইনের স্বাভাবিক নিয়ম। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর জনমত এমনভাবে তৈরি হয় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচার হওয়ার আগেই সামাজিকভাবে অপরাধী হয়ে যান। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ, বিচারব্যবস্থার বাইরে জনতার আদালত কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। বিয়ের দাবিতে অনশনের মতো ঘটনা আমাদের পরিবারব্যবস্থার দিকেও আঙুল তোলে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবার থেকে গোপন করে। পরে সমস্যা তৈরি হলে পরিবার হঠাৎ করে বিষয়টি জানতে পারে এবং তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের শুধু ভালো ফলাফল বা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কেও শিক্ষা দেওয়া। সম্পর্ক, ভালোবাসা, দায়িত্ব, সম্মতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাÑএসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সন্তানদেরও বুঝতে হবে, আবেগের সিদ্ধান্ত জীবনের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ভালো লাগা নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া, দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষার ফলাফল ও কর্মজীবনের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু একজন মানুষকে ভালো নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।

 

বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে সম্পর্কের নৈতিকতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আইনি অধিকার, পারস্পরিক সম্মান এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আলোচনা থাকা প্রয়োজন। কারণ, তরুণ বয়সে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত পুরো জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। শিক্ষিত হওয়া আর সচেতন হওয়া এক বিষয় নয়। একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়েও যদি অন্যের অনুভূতি ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমান সময়ে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি ঘটনা ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু দ্রুততার এই সংস্কৃতির মধ্যে অনেক সময় সত্য হারিয়ে যায়।

বিয়ের দাবিতে অনশনের মতো বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে জড়িত থাকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সম্মান এবং ভবিষ্যৎ। তাই গণমাধ্যমের উচিত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা। কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, একপাক্ষিক বক্তব্য প্রচার কিংবা উত্তেজনা তৈরি করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার কাজ হলো মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা, কিন্তু কারও জীবনকে জনসমক্ষে অপমানের জায়গায় নিয়ে যাওয়া নয়। একটি সংবাদ যেমন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের পথ খুলে দিতে পারে, তেমনি অসতর্ক উপস্থাপন কারও জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

 

বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনাগুলোতে প্রায়ই নারীদের নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। কিন্তু মূল বিষয় হওয়া উচিতÑনারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার। একজন নারী যেন সম্পর্কের কারণে সামাজিকভাবে একঘরে না হয়ে যান, সেটি নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। একই সঙ্গে একজন পুরুষও যেন মিথ্যা অভিযোগের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার মানে কোনো পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটন করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। বিয়ের দাবিতে অনশন আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরে।

 

এই আয়নায় আমরা দেখতে পাইÑসম্পর্কের সংকট, মূল্যবোধের দুর্বলতা, বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তিত রূপ। সমাধান হলো না শুধু অনশন বন্ধ করা; বরং সেই পরিস্থিতি তৈরি না করা, যেখানে একজন মানুষ নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য হন। এর জন্য প্রয়োজন পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীবনমুখী শিক্ষা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সমাজে পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি। সমাধানের পথ কোথায়? বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু কে দোষী, কে নির্দোষÑএই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। বরং খুঁজে দেখতে হবে, কেন একজন মানুষ এমন চরম অবস্থানে যেতে বাধ্য হন।

 

কোনো সুস্থ সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট অনশন, আন্দোলন বা জনসমক্ষে অপমানের পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা নয়। এর অর্থ হলো, কোথাও না কোথাও আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক যোগাযোগ এবং বিচার ব্যবস্থার মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, প্রয়োজন সম্পর্কের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা। ভালোবাসা কোনো খেলনা নয়, আবার সম্পর্ক কোনো সাময়িক বিনোদনের বিষয়ও নয়। একটি সম্পর্কের সঙ্গে একজন মানুষের আবেগ, সম্মান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পরিবারের প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। তাই সম্পর্ক গড়ার আগে যেমন সততা প্রয়োজন, তেমনি সম্পর্কের পরিণতি সম্পর্কেও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

 

কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রাখা যেমন অনৈতিক, তেমনি কোনো সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রতিশোধ বা সামাজিক চাপের পথ বেছে নেওয়াও সমাধান নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের প্রতি আস্থা। এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন নাগরিক যখন মনে করেন যে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না, তখনই তিনি বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। অনশন, অবস্থান কিংবা সামাজিক চাপ তৈরির প্রবণতা অনেক সময় সেই আস্থাহীনতার ফল। তাই রাষ্ট্রকে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ প্রতারণা, হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার হলে দ্রুত আইনি সহায়তা পান।

 

অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করার সুযোগও বন্ধ করতে হবে। কারণ, ন্যায়বিচারের মূলনীতি হলোÑঅভিযোগকারী যেমন সুরক্ষা পাবেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিও তেমনি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অধিকার রাখবেন। একটি সমাজ শুধু আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না; সমাজকে টিকিয়ে রাখে মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। আজকের বড় সংকট হলোÑআমরা অনেক ক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে কথা বলি, কিন্তু দায়িত্বের কথা ভুলে যাই। ভালোবাসার অধিকার যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার দায়িত্ব। স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়।

 

ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। শুধু সফল মানুষ নয়, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করাই হতে হবে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।বিয়ের দাবিতে অনশনের ঘটনায় প্রায়ই সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ পুরোপুরি নারীর পক্ষে দাঁড়ান, কেউ আবার পুরুষকে সমর্থন করেন। কিন্তু প্রকৃত সমাধান পক্ষ নেওয়ার মধ্যে নয়; সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যে। নারী যদি প্রতারণার শিকার হন, তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আবার কোনো পুরুষ যদি মিথ্যা অভিযোগের শিকার হন, তাঁর সম্মান ও অধিকার রক্ষার দায়িত্বও সমাজের। একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজে নারী-পুরুষ উভয়কেই মর্যাদার সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে, আবেগের ভিত্তিতে নয়।

গণমাধ্যম সমাজের আয়না। তাই কোনো সংবেদনশীল ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনের সংকটকে শুধু চমকপ্রদ সংবাদ হিসেবে দেখলে মানুষের ক্ষতি হতে পারে। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো ঘটনার গভীরে যাওয়া, উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং সমাজের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি করা কিংবা সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হতে পারে না। ডিজিটাল যুগে একটি অভিযোগ মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

 

এটি যেমন ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অপপ্রচার ও চরিত্রহননের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল হতে হবে। যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, কারও বিরুদ্ধে মন্তব্য করা কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উপহাস করা মানবিকতার পরিচয় নয়। এ ধরনের ঘটনা কমাতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজনÑপ্রথমত, পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা সমস্যার সময় গোপন না করে পরিবারের সহযোগিতা নিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীবনমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে। সম্পর্ক, সম্মান, দায়িত্ব, আইন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে তরুণদের সচেতন করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনি সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে। মানুষ যেন মনে না করেন যে বিচার পেতে হলে তাঁকে রাস্তায় নামতে হবে। চতুর্থত, সমাজকে গুজব ও আবেগের পরিবর্তে যুক্তি ও মানবিকতার পথে এগোতে হবে। বিয়ের দাবিতে অনশনÑএটি শুধু একটি সামাজিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্ন আমাদের সামনে তুলে ধরেÑআমাদের সম্পর্ক কতটা দায়িত্বশীল, আমাদের পরিবার কতটা সহমর্মী, আমাদের আইন কতটা কার্যকর এবং আমাদের সমাজ কতটা মানবিক।

 

কোনো মানুষ যেন ভালোবাসায় প্রতারিত হয়ে, ন্যায়বিচারের আশায় নিজের জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য না হনÑএটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আবার কোনো মানুষ যেন সামাজিক চাপে বা মিথ্যা অভিযোগে অপমানিত না হনÑসেটিও নিশ্চিত করতে হবে।সমাধান অনশনে নয়, প্রতিশোধে নয়, সামাজিক অপমানে নয়। সমাধান হলো সততা, দায়িত্ববোধ, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। বিয়ের দাবিতে অনশনকে তাই শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের চিহ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সমাজের আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের দুর্বলতা দেখতে পাই। সেই দুর্বলতা কাটিয়ে একটি দায়িত্বশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

Ads small one

ফ্রান্সের বিপক্ষে ২–০ গোলে এগিয়ে গেল স্পেন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
ফ্রান্সের বিপক্ষে ২–০ গোলে এগিয়ে গেল স্পেন

ফ্রান্স দলে আরও দুই পরিবর্তন
৭২ মিনিটে মাঠ ছাড়লেন মাইকেল ওলিসে ও লুকাস দিনিয়ে। আর এ দুজনের পরিবর্তনে মাঠে নেমেছেন রায়ান শেরকি ও থিও হার্নান্দেজ।

০২: ২৫
ইয়ামালের গোল বাতিল
মনে হচ্ছিল লামিনে ইয়ামাল গোল করে ম্যাচ সিলাগালা করে দিয়েছেন। কিন্তু ৬৪ মিনিটে করা ইয়ামালের গোলটি বাতিল হয় অফসাইডের কারণে।

০২: ২১
২–০ গোলে এগিয়ে স্পেন, বিপদে ফ্রান্স
ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় থাকা ফ্রান্স এখন আরও বড় বিপদে পড়ল। তারা পিছিয়ে গেল ২–০ গোলে। ৫৮ মিনিটে গোলটি করেছেন পেদ্রো পোরো।

গোলটি অনেকটাই নিজের চেষ্টায় তৈরি করেন পোরো। দানি ওলমোর সঙ্গে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে পড়েন পরো। এরপর দারুণ স্থিরতায় মাইক মাইনিয়ঁকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি।

ফ্রান্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলের পর স্পেনের উদ্‌যাপন
ফ্রান্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলের পর স্পেনের উদ্‌যাপনরয়টার্স
০২: ১৯
নামলেন দেজিরে দুয়ে
সমতা ফেরানোর অপেক্ষায় থাকা ফ্রান্স ৫৯ মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলার বদলে মাঠে নামিয়েছে দেজিরে দুয়েকে।

০২: ১০
ফ্রান্স দলে পরিবর্তন
বিরতির সময়ই পরিবর্তন আনল ফ্রান্স। পরিবর্তনটি ছিল প্রত্যাশিতও। প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড দেখা মিডফিল্ডার আদ্রিয়াঁ রাবিওর বদলে মাঠে নেমেছেন রোমার মিডফিল্ডার মানু কোনে।

০১: ৫১
স্পেন ১ : ০ ফ্রান্স (হাফ টাইম)
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের প্রথমার্ধ শেষে ফ্রান্সের বিপক্ষে ১–০ এগিয়ে আছে স্পেন। পেনাল্টি থেকে প্রথমার্ধে একমাত্র গোলটি করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। প্রথমার্ধে চেনা রূপে দেখা যায়নি ফ্রান্সকে।

ম্যাচের ২০ মিনিটে লুকাস দিনিয়ে বক্সের ভেতরে অসাবধানতাবশত লামিনে ইয়ামালকে ফেলে দিলে পেনাল্টি পায় স্পেন। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন ওইয়ারসাবাল।

এর কিছুক্ষণ পরই ফ্রান্সের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা।

এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে এতটা অস্থির আগে দেখা যায়নি। এত দিন তারা ছিল প্রায় অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু দিনিয়ের বিপক্ষে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত, দেম্বেলের ওপর ফাউলের জন্য পাওয়া ফ্রি-কিক ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হওয়া এবং জুলস কুন্দের বিপক্ষে আরেকটি সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে ফরাসি খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্ষোভ জমতে দেখা যাচ্ছে। এখন দ্বিতীয়ার্ধে দিদিয়ের দেশমের দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে কিনা সেটাই দেখার অপেক্ষা।

স্পেন পেনাল্টির আশীর্বাদে শুরুতেই এগিয়ে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ২:২৮ পূর্বাহ্ণ
স্পেন পেনাল্টির আশীর্বাদে শুরুতেই এগিয়ে

চলমান ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইউরোপের দুই পরাশক্তি স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার মহারণে শুরুতেই এগিয়ে গেছে স্পেন।

ম্যাচের ১৯তম মিনিটে ফ্রান্সের পেনাল্টি বক্সের ভেতরে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে ফাউল করেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস ডিগনে। এতে স্পেনের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।

স্পট কিক থেকে কোনো ভুল করেননি মিকেল ওয়ারজাবাল। তার নেওয়া নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে যায় ফ্রান্সের জালে। ফলে ম্যাচের ১৯ মিনিটেই ১-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন।

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: শিক্ষার্থীহীন মাদ্রাসায় ১৭ শিক্ষক-কর্মচারী!

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১:০১ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: শিক্ষার্থীহীন মাদ্রাসায় ১৭ শিক্ষক-কর্মচারী!

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল প্রাণ হলো শিক্ষার্থী। অথচ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার যে চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী নেই, কোনো শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা উপকরণ নেই, সেখানে কাগজে-কলমে বহাল তবিয়তে আছেন ১৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারী! দিনের বেলা যে মাদ্রাসার জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষগুলো ব্যবহৃত হয় গোয়ালঘর বা ছাগল বাঁধার স্থান হিসেবে আর রাতে যেখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডাÑসেই ভুতুড়ে প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে সরকারি বই, উপবৃত্তি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে কোন জাদুবলে, সেই প্রশ্ন এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
১৯৯৮ সালে স্থানীয়দের দান করা জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটি শুরুর দিকে ভালো চললেও পরবর্তী সময়ে সুপারিন্টেন্ডেন্টের নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ২০১১ সাল থেকে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে। অথচ সরকারি খাতায় প্রতিষ্ঠানটিকে সচল দেখাতে প্রতি বছর জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। অবাক করার বিষয় হলো, চলতি বছরও প্রতিষ্ঠানটি ২২৫ সেট নতুন বইয়ের চাহিদা পাঠায় এবং প্রাক-প্রাথমিক থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি বই বরাদ্দও পায়! যেখানে বাস্তবে একজন শিক্ষার্থীরও অস্তিত্ব নেই, সেখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি বই এবং উপবৃত্তির টাকা কাদের পকেটে যাচ্ছে, তা বুঝতে খুব একটা বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, শিক্ষার পবিত্র আঙিনাকে ব্যবহার করে এখানে এক পারিবারিক লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নামে বরাদ্দ হওয়া সমস্ত সরকারি অনুদান ও সুবিধা মূলত সুপার ও তাঁর সহকারী শিক্ষিকা স্ত্রী মিলে আত্মসাৎ করছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সরেজমিন অনুসন্ধানেও এর প্রমাণ মিলেছে। যখন মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে ছাগল ও গোখাদ্য মজুত থাকতে দেখা যায়, তখন সহকারী শিক্ষিকা নিজ বাড়িতে ধান শুকানোর ফাঁকে ‘এইমাত্র ক্লাস নিয়ে আসার’ যে দাবি করেন, তা এক চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। শিক্ষার নামে এমন প্রকাশ্য জালিয়াতি ও প্রতারণা বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে চলছে, তা ভাবতেই অবাক লাগে।
ইতিমধ্যেই জমিদাতারা শিক্ষাহীন এই প্রতিষ্ঠানের কবল থেকে তাঁদের সম্পত্তি ফেরত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এই জালিয়াতির খবর শুনে বিস্মিত হয়েছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আমরা মনে করি, শুধু সাধারণ খোঁজখবর নেওয়াই যথেষ্ট নয়। এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সরকারি সম্পদ ও অর্থ আত্মসাতের যে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তার শিকড় উপড়ে ফেলা জরুরি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে এমন তামাশা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার এই জালিয়াতির ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় এনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।