বেতনার তীরে সোনালী স্বপ্নের দোলা: সাতক্ষীরায় ফিরছে কৃষকের হাসি
পত্রদূত রিপোর্ট: আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও সাতক্ষীরার বেতনা নদীর তীরে এখন বইছে অন্যরকম এক আনন্দের বাতাস। যে জনপদ গত কয়েক বছর ধরে কেবল জলজট আর পলিমাটির বিষণ্ণতায় ডুবে থাকত, সেখানে আজ দিগন্তজোড়া সবুজ ধানের ঢেউ। দীর্ঘ ৬-৭ বছরের অবরুদ্ধ জলাবদ্ধতার অভিশাপ কাটিয়ে বেতনার কোলঘেঁষা ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর আর ফিংড়ী ইউনিয়নের বুক চিরে জেগে উঠেছে নতুন প্রাণের স্পন্দন। এবার সাতক্ষীরায় বোরো ধানের যে ‘বাম্পার’ ফলন দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কৃষি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক জনপদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
এক সময় এই বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের অধিকাংশ সময় লোনা জল আর কচুরিপানায় আটকে থাকত। এক ফসলি জমিতে আমন চাষ ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আর কৃষকের অদম্য পরিশ্রমে এবার চিত্রটা বদলে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বছরের পর বছর জমিগুলো পানির নিচে থাকায় তলানির আগাছা পচে তৈরি হয়েছে উর্বর প্রাকৃতিক জৈব সার। সেই ঊষর জমিতেই এখন ব্রি-ধান ২৮, ৮৮, ১০১ থেকে শুরু করে লবণ-সহিষ্ণু হাইব্রিড জাতের ধানগুলো যেন একেকটি স্বপ্নের মিনার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খাতা বলছে, এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে, সাতক্ষীরার কৃষক কতটা মরিয়া ছিল এই মাটির বুক থেকে অন্ন তুলে আনতে। শুধু সদর উপজেলাতেই ২৩ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৯৬ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মাছখোলা গ্রামের কৃষক মাসুদ রানার চোখেমুখে এখন তৃপ্তির ছায়া। তিনি বলেন, “আবহাওয়া এবার বড্ড মায়া করেছে আমাদের ওপর। গতবারের চেয়ে এবার ধানের শীষ অনেক পুষ্ট।” দামারপোতার হাফিজুল ইসলাম যেন নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখছেন তার ধানের ক্ষেত। তার বিশ্বাস, প্রকৃতির মেজাজ ঠিক থাকলে এবার ঘরে উঠবে কাঙ্ক্ষিত ফসল।
ধুলিহর এলাকার ইলিয়াস হোসেন বাবু এক অভিনব লাভের কথা শোনালেন। ঘেরের জমিতে মাছ চাষের পর সেই পলিমাটিতেই ধানের আবাদ করে এবার দ্বিগুণ আয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তবে সাবেক ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামের কণ্ঠে চিরাচরিত কৃষকের শঙ্কাÑফসল যতক্ষণ না গোলায় উঠছে, ততক্ষণ যেন স্বস্তি নেই।
এত প্রাপ্তির মাঝেও কোথাও কোথাও কষ্টের সুর বেজে উঠছে। কৃষকদের বড় অভিযোগ ডিজেল সংকট নিয়ে। আইয়ুব আলীর মতো প্রান্তিক চাষিরা দুশ্চিন্তায় আছেন সেচ নিয়ে। শেষ মুহূর্তের সেচটুকু ঠিকমতো দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে—এমন এক শঙ্কাও কাজ করছে তাদের মনে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেনের কণ্ঠে অবশ্য আশাবাদের জয়গান। তিনি জানালেন, পরিমিত সার ব্যবহার আর নিয়মিত তদারকির ফলে এবার রোগবালাইয়ের উপদ্রব অনেক কম। কৃষি বিভাগের সময়োপযোগী পরামর্শ আর কৃষকের নিবিড় যতœÑএই দুইয়ের মেলবন্ধনেই এবার ফলন হয়েছে ঈর্ষণীয়।
বেতনা নদীর তীরে এক সময় যে হাহাকার শোনা যেত, আজ সেখানে ধানের শীষের মড়মড় শব্দে আগামীর সমৃদ্ধির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যদি সব ঠিক থাকে, তবে এই বোরো মৌসুম কেবল সাতক্ষীরার চালের আড়তগুলোকেই পূর্ণ করবে না, বরং বদলে দেবে হাজার হাজার কৃষি শ্রমিকের ভাগ্য। বেতনার পলিভেজা মাটি যেন এবার সত্যি সত্যি সোনা ফলাতে প্রস্তুত।







