ভাঙে বেড়িবাঁধ, দায় কার?/সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বেড়িবাঁধ ভাঙার আগে সতর্কবার্তা থাকে। কোথাও মাটি সরে যায়, কোথাও ফাটল ধরে, কোথাও নদীর স্রোত বাঁধের পাড় কামড়ে ধরে। স্থানীয় মানুষ বিষয়টি জানান, জনপ্রতিনিধিরা অবহিত হন, সংবাদও প্রকাশিত হয়। কিন্তু সংস্কারের কাজ শুরু হয় না। তারপর একদিন জোয়ার আসে, বাঁধ ভাঙে, পানি ঢোকে। শুরু হয় প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ। এটাই কি আমাদের উপকূল ব্যবস্থাপনার নিয়ম? সাতক্ষীরার আশাশুনিতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশি দূর যেতে হয় না। বুধহাটা বাজার, শ্মশানঘাট তেঁতুলতলা, প্রতাপনগর, বড়দল, আনুলিয়া কিংবা খাজরার বাঁধের দিকে তাকালেই চিত্রটি স্পষ্ট হয়। বুধহাটা শুধু একটি বাজার নয়। দীর্ঘদিনের এই বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। অথচ বেতনা নদীর ভাঙন এখন বাজারটির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বুধহাটা বাজার সংলগ্ন বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। কয়েক দিনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাত বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নদীখননের কারণে স্রোতের চাপ বাজারমুখী হয়েছে।
জুলাইয়ে বুধহাটা ও নওয়াপাড়া এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার খবর আসে। সেখানে ২০০ থেকে ৩০০ হাত বাঁধের নিচের অংশ নদীতে চলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রায় ১০০ হাত মূল বাঁধে বড় ফাটল দেখা দেয়। এতে বুধহাটা, ফিংড়ী, ব্রহ্মরাজপুর ও ধুলিহরসহ আশপাশের বহু গ্রাম, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়ে। বৈরামপুরেও বেতনা নদীর ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে বাঁধকে দুর্বল করে তুলছে। সেখানে কয়েক মাসে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট চর নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ভাঙন বাঁধসংলগ্ন সড়কের কাছাকাছি চলে এসেছে। এটি শুধু আশাশুনির সমস্যা নয়; পুরো সাতক্ষীরার উপকূলীয় বাস্তবতা একই। চলতি বছরের মে মাসে আশাশুনি ও শ্যামনগরের অন্তত ৪০টি স্থানে বেড়িবাঁধ তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আশাশুনির মরিচ্চাপ নদীর তেঁতুলিয়া সেতু এলাকাও ছিল সেই ঝুঁকির তালিকায়।
গত বছর আনুলিয়ার বিছট গ্রামের কাছে খোলপেটুয়া নদীর বাঁধের প্রায় ১৫০ ফুট অংশ ভেঙে প্রায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। চলতি বছর বড়দল ও খাজরা এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর বাঁধে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিলে প্রায় ২০টি গ্রাম এবং হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও মৎস্যঘের প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়। আর সর্বশেষ প্রতাপনগরের শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বাঁধ ভাঙার ঘটনা আবারও সেই পুরোনো বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। স্থানীয় মানুষের হিসাবে ভাঙন প্রায় ১৫০ ফুট হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক হিসাবে তা ৬০ থেকে৭০ ফুট। বাঁধ রক্ষায় শতাধিক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে কাজে নেমেছেন। অথচ এলাকাবাসীর ভাষ্য, ঝুঁকির কথা আগেই জানানো হয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবার মানুষ নিজেরাই কেন বাঁধ রক্ষায় নামবেন?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়? আশাশুনির মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু মানুষের সহনশীলতাকে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিকল্প বানানো যায় না। বাঁধ ভাঙার পর জিওব্যাগ ফেলা, মাটি ফেলা, বাঁশের পাইলিং করাÑএসব জরুরি ব্যবস্থা হতে পারে; কিন্তু এগুলো স্থায়ী সমাধান নয়। আরও বড় প্রশ্ন নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কোথাও নদী খনন হচ্ছে, কোথাও স্রোতের গতিপথ বদলাচ্ছে, কোথাও তীর থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এসব কাজের সঙ্গে বাঁধের নিরাপত্তার সম্পর্ক বিবেচনা না করলে এক জায়গা রক্ষা করতে গিয়ে অন্য জায়গা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই নদী ও বাঁধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
এখন আর প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়Ñবাঁধ ভাঙলে কীভাবে সামলানো হবে? প্রশ্ন হওয়া উচিতÑবাঁধ যাতে না ভাঙে, তার জন্য আজ কী করা হচ্ছে? পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর কারিগরি জরিপ করতে হবে। বাঁধের উচ্চতা, প্রস্থ, মাটির গুণমান, ফাটল, নদীর স্রোত ও তীরভাঙনের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে একটি ঝুঁকি-মানচিত্র তৈরি করা প্রয়োজন। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ী সংস্কার করতে হবে। বুধহাটা বাজার ও শ্মশানঘাট তেঁতুলতলার মতো জন বসতিপূর্ণ এলাকায় সাময়িক জোড়াতালির বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ শক্তিশালী করতে হবে।
নদীখনন বা অন্য কোনো উন্নয়নকাজের আগে তার প্রভাব বাঁধ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর কী পড়বে, সেটিও কারিগরি সমীক্ষায় নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে কাজের মান, অর্থ ব্যয় এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষা ও দুর্যোগ মৌসুমের আগে প্রতিবছর বাঁধের ‘স্বাস্থ্য পরীক্ষা’ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগেই জিওব্যাগ, বালুর বস্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুত রাখতে হবে। সবশেষে প্রয়োজন জবাবদিহি।
একই বাঁধ বারবার ভাঙবে, বারবার সরকারি অর্থে সংস্কার হবে, আবার ভাঙবেÑএই চক্র চলতে পারে না। কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে তার কারণ খুঁজতে হবে এবং দায়িত্বে অবহেলা থাকলে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাঁধ ভাঙার পর দৌড়ঝাঁপ নয়Ñভাঙার আগেই পরিকল্পনা, অর্থায়ন, কাজ ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। কারণ একটি বেড়িবাঁধ শুধু মাটি ও বালুর স্তূপ নয়; এর ওপারে রয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্যঘের, বাজার ও জীবিকা। বাঁধ রক্ষার সাফল্য জিওব্যাগের সংখ্যায় নয়, কতটি পরিবারকে প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করা গেলÑতার হিসাবেই মাপা উচিত।
লেখক: সংবাদকর্মী












