শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিকল্পিত কর্মসংস্থান
এম.এম হায়দার আলী
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। বিগত সরকারের আমলে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ, কালভার্ট, সড়ক-মহাড়ক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, আর সেটা হলো বেকারত্ব। কর্মক্ষম হয়েও যখন একজন মানুষ কাজের সুযোগ পান না, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ এবং নারী প্রায় ১০ লাখ। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অসংখ্য তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে অনেকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকলে অনেকেই হতাশা, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকেন।
এই পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ মাদকাসক্তি, জুয়া, অনৈতিক কর্মকান্ড কিংবা অন্যান্য সমাজ বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যদিও এসব অপরাধের পেছনে নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণও থাকে। তবুও কর্মসংস্থানের অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা, এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাই দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকারখানা, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং দক্ষতা উন্নয়ন ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।
রাজধানী কেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় পর্যায়েই লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। এতে শহরমুখী জনগ্রোতও কমবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, সহজ ঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে হবে।
সরকার, বেসরকারি খাত এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো সম্ভব। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ। একটি কর্মসংস্থান শুধু একজন মানুষের আয়ের পথ খুলে দেয় না; এটি একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, সমাজে স্থিতিশীলতা আনে এবং অপরাধপ্রবণতা কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পেতে পারে।
এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার ওপরও, মামলার চাপ কমলে তারা আরও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের সেবা দিতে পারবেন। ফলে দেশের প্রতিটি জেলায় সন্তোষজনক কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই সত্যিকার অর্থে শান্তির সুবাতাস বইবে। সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, বেকারত্ব দূর করা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, এটি একটি মানবিক, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবন বদলে দেয় না,বদলে দেয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও…।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












