বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

শিক্ষকের মর্যাদাই হোক শিক্ষা সংস্কারের শুরু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫৯ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের মর্যাদাই হোক শিক্ষা সংস্কারের শুরু

মো. মামুন হাসান

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের কথা নতুন নয়। পাঠ্যক্রম বদলেছে, পরীক্ষাপদ্ধতি বদলেছে, মূল্যায়নের ধরণ বদলেছে, কখনো কখনো একটি নীতির ফল দেখার আগেই আরেকটি নীতি এসে হাজির হয়েছে। প্রতিবারই ঘোষণায় থাকে নতুন স্বপ্ন, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের কাঁধে। এই পরিচিত চিত্র দেখে আমার একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। সংস্কারের শুরুটা আমরা কোথা থেকে করছি। আমার বিশ্বাস, শুরুটা হওয়া উচিত শিক্ষক থেকে, আর সেই শুরুর প্রথম ধাপ শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

প্রথমে একটি সহজ সত্য মেনে নেওয়া দরকার। কোনো সংস্কার কাগজে সম্পূর্ণ হয় না, সম্পূর্ণ হয় শ্রেণিকক্ষে। নীতিমালা যত সুচিন্তিত হোক, শিক্ষার্থীর কাছে সেটি পৌঁছায় শিক্ষকের মাধ্যমে। নতুন পাঠ্যক্রম বুঝিয়ে দেওয়া, নতুন মূল্যায়ন প্রয়োগ করা, শিক্ষার্থীর ভয় ও দ্বিধা কাটানো, সবই করেন শিক্ষক। অর্থাৎ সংস্কারের সফলতার চাবি তাঁর হাতেই। অথচ সংস্কারের পরিকল্পনায় তাঁকে প্রায়ই দেখা হয় বাস্তবায়নের একটি উপকরণ হিসেবে, অংশীদার হিসেবে নয়। উপকরণ হিসেবে দেখলে তাঁর কাছ থেকে নির্দেশ পালন পাওয়া যায়, কিন্তু উদ্যম পাওয়া যায় না। আর উদ্যম ছাড়া কোনো সংস্কার প্রাণ পায় না।

এই বাস্তবতা থেকেই বোঝা যায় কেন মর্যাদা এত গুরুত্বপূর্ণ। মর্যাদা বলতে আমি কেবল সামাজিক সম্মান বোঝাচ্ছি না। ১৯৬৬ সালে আইএলও ও ইউনেস্কোর সুপারিশ শিক্ষকের মর্যাদাকে অধিকার ও দায়িত্বের একটি কাঠামো হিসেবে দেখেছিল। তার ষাট বছর পূর্ণ হচ্ছে এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা কতটা এগিয়েছি, সেই হিসাব নেওয়ার এটাই সময়। মর্যাদার মধ্যে আছে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ চাকরি, স্পষ্ট পেশাগত অগ্রগতির পথ, পাঠদানের স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অধিকার। এগুলোর কোনোটি বাদ গেলে মর্যাদা অসম্পূর্ণ থাকে, আর অসম্পূর্ণ মর্যাদার ওপর দাঁড়ানো সংস্কার টলমলে হয়।

কেন শুরুটা শিক্ষক দিয়েই হতে হবে, তার তিনটি যুক্তি আমি দিতে চাই।
প্রথম যুক্তি আস্থার। যে শিক্ষককে পেশাদার হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তিনি নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস পান। তিনি পাঠদানের পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেন, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলান। কিন্তু যে ব্যবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য নির্দেশ ও নজরদারি, সেখানে শিক্ষক নিরাপদ পথে হাঁটতে শেখেন। সংস্কার চায় সৃজনশীলতা, আর সৃজনশীলতা জন্মায় আস্থার পরিবেশে।
দ্বিতীয় যুক্তি প্রতিভার। যে কোনো পেশার মান নির্ভর করে সেখানে কারা আসছেন তার ওপর। আজ অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে ভাবে না, কারণ তারা সেখানে নিরাপত্তা, সুযোগ ও সম্মানের নিশ্চয়তা দেখে না। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি মানে শেষ পর্যন্ত ভালো শিক্ষক পাওয়া। ভালো শিক্ষক পেতে হলে পেশাটিকে আকর্ষণীয় করতে হবে। এই কাজটি সংস্কারের সবচেয়ে গোড়ার কাজ, কারণ বাকি সব পরিবর্তন এর ওপরেই দাঁড়ায়।

তৃতীয় যুক্তি ধারাবাহিকতার। বারবার বদলে যাওয়া নীতি শিক্ষককে ক্লান্ত করে। নতুন পদ্ধতি শিখতে না শিখতেই আরেকটি এসে যায়। এই সংস্কার ক্লান্তি থেকে বাঁচার উপায় হলো শিক্ষকদের আগে থেকেই আলোচনায় যুক্ত করা। তাঁরা যদি পরিকল্পনার অংশীদার হন, তাহলে সেটি তাঁদের নিজেদের হয়ে ওঠে এবং বাস্তবায়নে তাঁরা সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এই যুক্তিগুলো আরও জোরালো। আমি নিজে একটি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানে পর্যটন ও আতিথেয়তা বিভাগে পড়াই। এই খাতে শিল্পের চাহিদা বদলায় খুব দ্রুত। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার কথা আমরা বলি, কিন্তু সেই শিক্ষা দিতে হলে শিক্ষকের নিজের হাতে কলমে অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তাঁকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হয়, কর্মশালায় আধুনিক সরঞ্জাম দিতে হয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। এসব না দিয়ে নতুন পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দিলে শিক্ষক এমন দায়িত্ব পান, যা পালনের উপকরণ তাঁর হাতে নেই। তখন সংস্কার হয় নামমাত্র, আর স্নাতকেরা সনদ নিয়ে বের হয় ঠিকই, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি নিয়ে নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ এই প্রয়োজনকে আরও তীব্র করেছে। তথ্য এখন সবার হাতের মুঠোয়। তাই শিক্ষকের ভূমিকা এখন তথ্য দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করতে শেখানো, যাচাই করতে শেখানো, নৈতিকতা ও মানবিকতা গড়ে তোলার দিকে সরে এসেছে। এই কাজ আগের চেয়ে কঠিন ও সূক্ষ্ম। যে সংস্কার এই নতুন ভূমিকাকে স্বীকার করবে না, সে সংস্কার সময়ের পেছনে পড়ে থাকবে। আর যে শিক্ষকের কাছে আমরা এই নতুন ভূমিকা দাবি করছি, তাঁকে প্রযুক্তি শেখার সুযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।

মর্যাদার আরেকটি দিক নিরাপত্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে এক টুকরো ভিডিও বা অর্ধসত্য মন্তব্য একজন শিক্ষকের বছরের পর বছরের সুনাম নষ্ট করে দিতে পারে। শিক্ষকও মানুষ, তাঁর ভুল হলে জবাবদিহি অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই জবাবদিহি হতে হবে তথ্য যাচাই করে, তাঁর বক্তব্য শুনে, ন্যায্য প্রক্রিয়ায়। আতঙ্কের মধ্যে থাকা শিক্ষক ঝুঁকি নিতে চান না, আর ঝুঁকি ছাড়া শিক্ষার উন্নতি হয় না।

শিক্ষকের কাজের বোঝার প্রশ্নটিও সংস্কারের আলোচনায় জরুরি। পাঠদানের পাশাপাশি তথ্য সংকলন, প্রতিবেদন, নানা কমিটির কাজ, এসব মিলিয়ে অনেক শিক্ষক শেখানোর জন্য যথেষ্ট সময় পান না। প্রতিটি নতুন সংস্কারের সঙ্গে যদি আরও কাগজপত্র যুক্ত হয়, তাহলে সংস্কার শিক্ষকের জন্য সহায়তা না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সংস্কারের নকশা করার সময়ই জিজ্ঞেস করা দরকার, এতে শিক্ষকের সময় বাঁচবে নাকি আরও কমবে।

তবে একতরফা দাবি করলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সম্মান দাবি করার আগে তা অর্জনের দায় আমাদের আছে। বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো, সময়ানুবর্তিতা ও সততা বজায় রাখা, শিক্ষার্থীর প্রতি সহমর্মী থাকা এবং প্রতিদিন শেখার আগ্রহ ধরে রাখা, এগুলো পেশার মর্যাদাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে। কিছু শিক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা পুরো পেশার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মর্যাদা ও জবাবদিহি একে অপরের বিরোধী নয়, পরিপূরক। স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও পেশাগত আচরণবিধি থাকলে শিক্ষকের দাবি আরও গ্রহণযোগ্য হয়।

তাহলে সংস্কারের শুরুতে কী করা দরকার। প্রথমত, যে কোনো সংস্কার প্রস্তাবের খসড়া পর্যায়েই মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং বড় পরিবর্তনের আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদের মতামত নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ন্যায্য বেতন কাঠামো, স্বচ্ছ পদোন্নতি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণকে অধিকার হিসেবে দেখে ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, কারিগরি শিক্ষকদের জন্য শিল্প অভিজ্ঞতার নিয়মিত সুযোগ ও আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পঞ্চমত, প্রশাসনিক বোঝা যুক্তিসংগত রাখতে হবে। ষষ্ঠত, অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।

অভিভাবক ও সমাজেরও এখানে ভূমিকা আছে। শিক্ষককে হেয় করার সংস্কৃতি বদলাতে হবে, শিক্ষকের সঙ্গে অংশীদারত্বের মনোভাব গড়তে হবে। সন্তানের শিক্ষার সাফল্য ঘরে ও বিদ্যালয়ের সমন্বিত চেষ্টার ফল।কেউ বলতে পারেন, সীমিত সম্পদের দেশে সবকিছু একসঙ্গে সম্ভব নয়। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু অগ্রাধিকার ঠিক করাই আসল কথা। বহু সংস্কার ব্যর্থ হয় এ কারণে নয় যে নকশা খারাপ ছিল, ব্যর্থ হয় এ কারণে যে যাঁরা তা বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের প্রস্তুত করা হয়নি। শিক্ষকে বিনিয়োগ করলে বাকি সব বিনিয়োগের ফলও বাড়ে। এটি ব্যয় নয়, সবচেয়ে নিশ্চিত পুঁজি।

শেষ পর্যন্ত কথাটা এই দালান গড়তে গেলে আগে ভিত গড়তে হয়। শিক্ষাব্যবস্থার ভিত হলেন শিক্ষক। সেই ভিত দুর্বল রেখে ওপরে যত সুন্দর কাঠামোই তুলি, তা টেকসই হবে না। এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, সংস্কারের পরিকল্পনা শুরু করার আগে আমরা শিক্ষকের পাশে দাঁড়াব, তাঁর কথা শুনব, তাঁর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করব। কারণ শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলাতে চাইলে আগে বদলাতে হবে শিক্ষকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।

মো. মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।

 

Ads small one

সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে?

তারিক ইসলাম

‎‘সুন্দরবন’—নামটির সঙ্গে গভীর রক্তের টান যেন ‘সুন্দরী’ গাছের। যে বৃক্ষের সমৃদ্ধি আর বিশালতায় টিকে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মূল সৌন্দর্য ও পরিচয়, সেই সুন্দরী গাছই আজ আক্রান্ত এক মরণব্যাধিতে। বনজুড়ে চলছে গাছগুলোর নীরব বিদায়ের করুণ সুর। কেবল পাতা আর ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া নয়, মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে মূল কাণ্ড পর্যন্ত। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নতুন চারা গজানোর হারও। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র যে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সুন্দরী গাছের এই অসুস্থতা তারই এক মারাত্মক বার্তা।

‎সম্প্রতি সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০২৪–২৫ সালে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবীক্ষণ’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন ‘আগামরা’ বা ‘টপ-ডাইং’ (Top-Dying) রোগে আক্রান্ত। সব মিলিয়ে আক্রান্ত গাছের আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি গাছ গুরুতরভাবে মরে যাওয়ার মুখোমুখি।

‎পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ পরিচালনায় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারসহ বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণায় এই ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে।

‎সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রধান বৃক্ষ যখন একযোগে রোগাক্রান্ত হয়, তখন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমস্যা থাকে না; পুরো বনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের নোনা পানির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব মিলেই সুন্দরী গাছের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সুন্দরবনের মিষ্টি পানি ও মৃদু লবণাক্ত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকায় মাটির বায়ুসঞ্চালন কমছে, যা গাছগুলোর গোড়া ও কাণ্ডকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও পলি জমার কারণে বন নিজের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে।

‎

‎সুন্দরবন কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে বছরের পর বছর বুক দিয়ে বাংলাদেশকে আড়াল করে রেখেছে এই ম্যানগ্রোভ বন। আর সেই বনের মূল কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ সুন্দরী গাছ যদি একে একে উজাড় হয়ে যায়, তবে গোটা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ দুর্লভ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

‎

‎সুন্দরবনের এই নীরব আর্তনাদ আর উপেক্ষা করার সময় নেই। সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার:

‎

‎১. মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার: উজান থেকে সুন্দরবনমুখী নদ-নদীগুলোতে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আন্তঅঞ্চলীয় ও জাতীয় পানিসম্পদ নীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

‎

‎২.পলি নিরসন ও নদী-খাল খনন: বনের অভ্যন্তরীণ যে নদ-নদী ও খালগুলো পলি ভরাট হয়ে মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।

‎

‎৩.রোগ প্রতিরোধে জোরালো গবেষণা: আগামরা রোগের সঠিক জীবাণু বা অণুজীব শনাক্ত করে তা থেকে সুন্দরী গাছকে রক্ষায় বন অধিদপ্তর এবং বিজ্ঞানীদের সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

‎

‎৪.সুরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা ও নজরদারি: বনের যেসব এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নতুন চারা উৎপাদন ও বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

‎

‎সুন্দরবন ছাড়া আমাদের মানচিত্রের এক বিরাট অংশকে কল্পনা করা যায় না, আর সুন্দরী গাছ ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির বিপন্নতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে হয়তো মানচিত্রে ‘সুন্দরবন’ নামটি থেকে যাবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার আসল রূপকার—আমাদের ‘সুন্দরী’।

‎লেখক : তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
ডিসেম্বরে খুলনায় চালু হচ্ছে বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট
পত্রদূত ডেস্ক: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় দেশের প্রথম বর্জ্য রিসাইকেল প্ল্যান্টের পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে সবঠিক থাকলে ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে চালু হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে একইসঙ্গে মিলবে সার, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এটি পরিচালনার জন্য দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি এলজিইডি এবং কেসিসির যৌথ সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফাস্ট ট্রায়াল দেওয়া হয়েছে, এটি চলমান থাকবে।
তিনি বলেন, এটি চালাবে প্রফেশনাল প্রাইভেট অপারেটর। ইতোমধ্যে কোম্পানি নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি থেকে সার, জ্বালানি তেল ও বায়োগ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ, প্লান্টের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে চালু করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্টের কম্পোস্ট ও পাইরোলাইসিস প্লান্টের যন্ত্রকৌশল ম্যাটারিয়ালস এ্যান্ড ম্যাটালোজিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল বিষয়ে কারিগরি সহায়তার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিজ্ঞ পাঁচ প্রকৌশলীকে নিয়ে গঠিত হয়েছে একটি টিম। টিমের সদস্যরা প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণে গত ১ অক্টোবর খুলনায় আসেন। ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরীক্ষা শেষে তারা ঢাকায় ফিরে যান।
টিমের সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রের (বিটাক) প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. ইনসানুল করিম, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী একেএম শামসুল হুদা, প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী, সানইয়ার্ড গ্রুপ বর্তমানে ন্যাশনাল কেমিক্যাল ম্যানুফাকচারিং কোঃ লিঃ-এর ডিএমডি প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল জব্বার, প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী মোঃ আশরাফ উদ্দিন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) প্রাক্তন চিফ সাইন্টিফিক অফিসার ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মোঃ আব্দুল গফুর। প্রতিনিধি দলের চারজন বুয়েট এবং বাকি একজন চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। যারা সবাই শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট মেশিনারি ডিজাইনার।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করে মতামত প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করবেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্প ম্যানেজার প্রকৌশলী পিন্টু মন্ডল। তিনি বলেন, প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সরজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি দল এসেছিলেন। তারা ২/৩ দিন এখানে ছিলেন। তাদের ক্লান্তির কারণে ৩৬ ঘণ্টা পাইরোলাইসিস করা হয়নি।
পাইরোলাইসিসের প্রসেস অনুযায়ী ৬ ঘণ্টা পর তেল আসা শুরুর ২/৩ ঘণ্টা মেশিন চালানোর পর বন্ধ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে পলিথিন এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেলের মধ্য থেকে ১০ লিটার তেল পরীক্ষার জন্য স্যারেরা ঢাকায় নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা করে মিটিং করে মতামত প্রকল্পের পরিচালক স্যারকে জানাবেন। প্রকল্পের পরীক্ষামূলক ফলাফল সফল হয়েছে বলা যায়।
এর আগে গত ১ অক্টোবর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এরপর মেশিনারিজ সম্পূর্ণ সেট আপের পর শনিবার সকালে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। শেষ হয় সন্ধ্যায়।
বিগত ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শলুয়া বাজার-সংলগ্ন ১৭ একর জমিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তা। দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (সিআরডিপি-২)’র আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এটিতে অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৫৩ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, তিন ধরনের বর্জ্য থেকে তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হবে। গৃহস্থালির পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি হবে জৈব সার, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক রিসাইকেল করে উৎপাদন করা হবে জ্বালানি তেল এবং কাঁচাবাজার থেকে সংগৃহীত বর্জ্য থেকে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ। অত্যাধুনিক পাইরোলাইসিস প্রযুক্তি ব্যবহারে বায়ু দূষণের কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন ২০ টন জৈব সার, ৪ হাজার ৮০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং উৎপাদিত বায়োগ্যাস থেকে সাড়ে ৪০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। উৎপাদিত তেল ও বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হবে। প্রতি ব্যাচ বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগবে এক সপ্তাহ।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার সলুয়ায় স্থাপিত বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট আগামী ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে। একইসঙ্গে বটিয়াঘাটা উপজেলার মাথাভাঙ্গায় আরও একটি বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ডে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার প্লান্টও শিগগিরই চালু হচ্ছে। এই তিনটি রিসাইক্লিং প্লান্ট চালু হলে মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।

কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
কয়রায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে ৬ জনকে আটক
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: খুলনার কয়রা উপজেলায় ভাগবা গ্রামের ছয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। ১২ অক্টোবর বিশেষ অভিযানে অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে তাদেরকে আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন ভাগবা গ্রামের  মোঃ আব্বাস গাজীর পুত্র ,মোঃ জিয়ারুল ইসলাম (২২), মোঃ মাসুদ সরদারের পুত্র মোঃ জাহিদুল ইসলাম (২০), মোঃ কেনা গাজীর পুত্র, মোঃ আব্দুল আলিম গাজী (২১), মোঃ শহিদুল গাজীর পুত্র মোঃ আলী হোসেন (২১),মোঃ আয়ুব আলী মোড়লের  পুত্র, মোঃ সিফাত হোসাইন (২৪), মোঃ নজরুল শেখের পুত্র মোঃ জাকারিয়া শেখ।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ রাশেদুল আলম জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়া খেলায়  ১২ অক্টোবর ভাগবা গ্রাম থেকে তাদেরকে আটক করা হয়। অনলাইন জুয়া মামলায় আসামিদের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।