শিক্ষকের মর্যাদাই হোক শিক্ষা সংস্কারের শুরু
মো. মামুন হাসান
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের কথা নতুন নয়। পাঠ্যক্রম বদলেছে, পরীক্ষাপদ্ধতি বদলেছে, মূল্যায়নের ধরণ বদলেছে, কখনো কখনো একটি নীতির ফল দেখার আগেই আরেকটি নীতি এসে হাজির হয়েছে। প্রতিবারই ঘোষণায় থাকে নতুন স্বপ্ন, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের কাঁধে। এই পরিচিত চিত্র দেখে আমার একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। সংস্কারের শুরুটা আমরা কোথা থেকে করছি। আমার বিশ্বাস, শুরুটা হওয়া উচিত শিক্ষক থেকে, আর সেই শুরুর প্রথম ধাপ শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করা।
প্রথমে একটি সহজ সত্য মেনে নেওয়া দরকার। কোনো সংস্কার কাগজে সম্পূর্ণ হয় না, সম্পূর্ণ হয় শ্রেণিকক্ষে। নীতিমালা যত সুচিন্তিত হোক, শিক্ষার্থীর কাছে সেটি পৌঁছায় শিক্ষকের মাধ্যমে। নতুন পাঠ্যক্রম বুঝিয়ে দেওয়া, নতুন মূল্যায়ন প্রয়োগ করা, শিক্ষার্থীর ভয় ও দ্বিধা কাটানো, সবই করেন শিক্ষক। অর্থাৎ সংস্কারের সফলতার চাবি তাঁর হাতেই। অথচ সংস্কারের পরিকল্পনায় তাঁকে প্রায়ই দেখা হয় বাস্তবায়নের একটি উপকরণ হিসেবে, অংশীদার হিসেবে নয়। উপকরণ হিসেবে দেখলে তাঁর কাছ থেকে নির্দেশ পালন পাওয়া যায়, কিন্তু উদ্যম পাওয়া যায় না। আর উদ্যম ছাড়া কোনো সংস্কার প্রাণ পায় না।
এই বাস্তবতা থেকেই বোঝা যায় কেন মর্যাদা এত গুরুত্বপূর্ণ। মর্যাদা বলতে আমি কেবল সামাজিক সম্মান বোঝাচ্ছি না। ১৯৬৬ সালে আইএলও ও ইউনেস্কোর সুপারিশ শিক্ষকের মর্যাদাকে অধিকার ও দায়িত্বের একটি কাঠামো হিসেবে দেখেছিল। তার ষাট বছর পূর্ণ হচ্ছে এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা কতটা এগিয়েছি, সেই হিসাব নেওয়ার এটাই সময়। মর্যাদার মধ্যে আছে ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ চাকরি, স্পষ্ট পেশাগত অগ্রগতির পথ, পাঠদানের স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অধিকার। এগুলোর কোনোটি বাদ গেলে মর্যাদা অসম্পূর্ণ থাকে, আর অসম্পূর্ণ মর্যাদার ওপর দাঁড়ানো সংস্কার টলমলে হয়।
কেন শুরুটা শিক্ষক দিয়েই হতে হবে, তার তিনটি যুক্তি আমি দিতে চাই।
প্রথম যুক্তি আস্থার। যে শিক্ষককে পেশাদার হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তিনি নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস পান। তিনি পাঠদানের পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেন, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলান। কিন্তু যে ব্যবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য নির্দেশ ও নজরদারি, সেখানে শিক্ষক নিরাপদ পথে হাঁটতে শেখেন। সংস্কার চায় সৃজনশীলতা, আর সৃজনশীলতা জন্মায় আস্থার পরিবেশে।
দ্বিতীয় যুক্তি প্রতিভার। যে কোনো পেশার মান নির্ভর করে সেখানে কারা আসছেন তার ওপর। আজ অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে ভাবে না, কারণ তারা সেখানে নিরাপত্তা, সুযোগ ও সম্মানের নিশ্চয়তা দেখে না। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি মানে শেষ পর্যন্ত ভালো শিক্ষক পাওয়া। ভালো শিক্ষক পেতে হলে পেশাটিকে আকর্ষণীয় করতে হবে। এই কাজটি সংস্কারের সবচেয়ে গোড়ার কাজ, কারণ বাকি সব পরিবর্তন এর ওপরেই দাঁড়ায়।
তৃতীয় যুক্তি ধারাবাহিকতার। বারবার বদলে যাওয়া নীতি শিক্ষককে ক্লান্ত করে। নতুন পদ্ধতি শিখতে না শিখতেই আরেকটি এসে যায়। এই সংস্কার ক্লান্তি থেকে বাঁচার উপায় হলো শিক্ষকদের আগে থেকেই আলোচনায় যুক্ত করা। তাঁরা যদি পরিকল্পনার অংশীদার হন, তাহলে সেটি তাঁদের নিজেদের হয়ে ওঠে এবং বাস্তবায়নে তাঁরা সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এই যুক্তিগুলো আরও জোরালো। আমি নিজে একটি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানে পর্যটন ও আতিথেয়তা বিভাগে পড়াই। এই খাতে শিল্পের চাহিদা বদলায় খুব দ্রুত। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার কথা আমরা বলি, কিন্তু সেই শিক্ষা দিতে হলে শিক্ষকের নিজের হাতে কলমে অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। তাঁকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হয়, কর্মশালায় আধুনিক সরঞ্জাম দিতে হয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। এসব না দিয়ে নতুন পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দিলে শিক্ষক এমন দায়িত্ব পান, যা পালনের উপকরণ তাঁর হাতে নেই। তখন সংস্কার হয় নামমাত্র, আর স্নাতকেরা সনদ নিয়ে বের হয় ঠিকই, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি নিয়ে নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ এই প্রয়োজনকে আরও তীব্র করেছে। তথ্য এখন সবার হাতের মুঠোয়। তাই শিক্ষকের ভূমিকা এখন তথ্য দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করতে শেখানো, যাচাই করতে শেখানো, নৈতিকতা ও মানবিকতা গড়ে তোলার দিকে সরে এসেছে। এই কাজ আগের চেয়ে কঠিন ও সূক্ষ্ম। যে সংস্কার এই নতুন ভূমিকাকে স্বীকার করবে না, সে সংস্কার সময়ের পেছনে পড়ে থাকবে। আর যে শিক্ষকের কাছে আমরা এই নতুন ভূমিকা দাবি করছি, তাঁকে প্রযুক্তি শেখার সুযোগ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
মর্যাদার আরেকটি দিক নিরাপত্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে এক টুকরো ভিডিও বা অর্ধসত্য মন্তব্য একজন শিক্ষকের বছরের পর বছরের সুনাম নষ্ট করে দিতে পারে। শিক্ষকও মানুষ, তাঁর ভুল হলে জবাবদিহি অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই জবাবদিহি হতে হবে তথ্য যাচাই করে, তাঁর বক্তব্য শুনে, ন্যায্য প্রক্রিয়ায়। আতঙ্কের মধ্যে থাকা শিক্ষক ঝুঁকি নিতে চান না, আর ঝুঁকি ছাড়া শিক্ষার উন্নতি হয় না।
শিক্ষকের কাজের বোঝার প্রশ্নটিও সংস্কারের আলোচনায় জরুরি। পাঠদানের পাশাপাশি তথ্য সংকলন, প্রতিবেদন, নানা কমিটির কাজ, এসব মিলিয়ে অনেক শিক্ষক শেখানোর জন্য যথেষ্ট সময় পান না। প্রতিটি নতুন সংস্কারের সঙ্গে যদি আরও কাগজপত্র যুক্ত হয়, তাহলে সংস্কার শিক্ষকের জন্য সহায়তা না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সংস্কারের নকশা করার সময়ই জিজ্ঞেস করা দরকার, এতে শিক্ষকের সময় বাঁচবে নাকি আরও কমবে।
তবে একতরফা দাবি করলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকবে। শিক্ষক হিসেবে আমাদেরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সম্মান দাবি করার আগে তা অর্জনের দায় আমাদের আছে। বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানো, সময়ানুবর্তিতা ও সততা বজায় রাখা, শিক্ষার্থীর প্রতি সহমর্মী থাকা এবং প্রতিদিন শেখার আগ্রহ ধরে রাখা, এগুলো পেশার মর্যাদাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে। কিছু শিক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা পুরো পেশার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মর্যাদা ও জবাবদিহি একে অপরের বিরোধী নয়, পরিপূরক। স্বচ্ছ মূল্যায়ন ও পেশাগত আচরণবিধি থাকলে শিক্ষকের দাবি আরও গ্রহণযোগ্য হয়।
তাহলে সংস্কারের শুরুতে কী করা দরকার। প্রথমত, যে কোনো সংস্কার প্রস্তাবের খসড়া পর্যায়েই মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং বড় পরিবর্তনের আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদের মতামত নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ন্যায্য বেতন কাঠামো, স্বচ্ছ পদোন্নতি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণকে অধিকার হিসেবে দেখে ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, কারিগরি শিক্ষকদের জন্য শিল্প অভিজ্ঞতার নিয়মিত সুযোগ ও আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পঞ্চমত, প্রশাসনিক বোঝা যুক্তিসংগত রাখতে হবে। ষষ্ঠত, অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
অভিভাবক ও সমাজেরও এখানে ভূমিকা আছে। শিক্ষককে হেয় করার সংস্কৃতি বদলাতে হবে, শিক্ষকের সঙ্গে অংশীদারত্বের মনোভাব গড়তে হবে। সন্তানের শিক্ষার সাফল্য ঘরে ও বিদ্যালয়ের সমন্বিত চেষ্টার ফল।কেউ বলতে পারেন, সীমিত সম্পদের দেশে সবকিছু একসঙ্গে সম্ভব নয়। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু অগ্রাধিকার ঠিক করাই আসল কথা। বহু সংস্কার ব্যর্থ হয় এ কারণে নয় যে নকশা খারাপ ছিল, ব্যর্থ হয় এ কারণে যে যাঁরা তা বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের প্রস্তুত করা হয়নি। শিক্ষকে বিনিয়োগ করলে বাকি সব বিনিয়োগের ফলও বাড়ে। এটি ব্যয় নয়, সবচেয়ে নিশ্চিত পুঁজি।
শেষ পর্যন্ত কথাটা এই দালান গড়তে গেলে আগে ভিত গড়তে হয়। শিক্ষাব্যবস্থার ভিত হলেন শিক্ষক। সেই ভিত দুর্বল রেখে ওপরে যত সুন্দর কাঠামোই তুলি, তা টেকসই হবে না। এই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, সংস্কারের পরিকল্পনা শুরু করার আগে আমরা শিক্ষকের পাশে দাঁড়াব, তাঁর কথা শুনব, তাঁর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করব। কারণ শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলাতে চাইলে আগে বদলাতে হবে শিক্ষকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
মো. মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।












