শ্যামনগরে ১০জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা, ৫দিনেও গ্রেপ্তার নেই
পত্রদূত রিপোর্ট: শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে গরু চরাতে যেয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় একই পরিবারের ১০ জন জখম হওয়ার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ২৮ মে ৫ মিনিটের ব্যবধানে জেলেখালি গ্রামের রণজিৎ কুমার গাইন ও মথুরাপুর গ্রামের হুসাইন গাজীর দায়েরকৃত দুটি মামলা রেকর্ড দেখানো হয়েছে। তবে মামলার পাঁচ দিনেও পুলিশ কোন আসামী গ্রেপ্তার না করায় ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জেলেখালি গ্রামের বৃদ্ধ কৃষ্ণপদ গায়েন।
রবিবার সকালে মথুরাপুর ও জেলেখালি গ্রামে যেয়ে দেখা গেছে, আব্দুল মজিদ পাইক, তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা তাদের বাড়ির পাশে ও জেলেখালি গ্রামের কৃষ্ণপদ গায়েন ও তার স্বজনরা বাড়ির সামনেই অবস্থান করছেন। আব্দুল মজিদ পাইকের সাত শতক জমির উপর দিয়ে ইট সোলিং রাস্তা ও তার বাবা- মায়ের কবরস্থান রয়েছে। জেলেখালির ফকির রপ্তান ওরফে শিবপদ রপ্তান ও তার স্ত্রী আরতি রপ্তানের বন্দোবস্তকৃত ৭০ শতকের মধ্যে কৃষ্ণপদ গাইনের নামে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেফিট করে দখলে নেওয়া ৩৩ শতকের মধ্যে আট শতক জমি আপোষের মাধ্যমে বিনিময় করে তা দখলে রেখেছেন। ওই আট শতক জমি মজিদ পাইক খাস সম্পত্তি হিসেবে নিজের দখল দাবি করে কৃষ্ণপদ গাইনের কাছে নতুন করে ওই জমি দাবি করে আসছেন।
আট শতক রাস্তা ও কবরস্থানের জমি ছাড়াও মজিদ পাইক সাড়ে ৯৬ শতক জমি দখলে রয়েছেন। তবে একজন প্রভাবশলিী জনপ্রতিনিধি শান্তিপূর্ণ মীমাংসার স্বার্থে কোন আসামী গ্রেপ্তার হবে না মজিদ পাইককে এমন আশ^াস দেওয়ায় মজিদ পাইক, তার পুত্রবধু খাদিজা, তার ছেলে ইব্রাহীমসহ কয়েকজন বাড়িতে অবস্থান করছেন। মজিদ পাইকের মেয়ে মর্জিনা ওরফে খুকুমনি সাতক্ষীরায় হাসপাতালে ভর্তি আছে বলে দাবি করা হয়েছে। অপরদিকে মজিদ পাইকের ছেলে হুসাইনের দায়েরকৃত মামলার তিনজন অসামী সাতক্ষীরায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। অন্যরা পলাতক রয়েছেন। স্থানীয় জামায়ত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মজিদ পাইকের ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কৃষ্ণপদ গায়েনের সুসম্পর্ক রয়েছে।
জানতে চাইলে মজিদ পাইক বলেন. ১৯৯০ সালে ৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য এন্তাজ কাগুচীর ছেলে মুনসুর কাগুচী ও তার বোন গোলজান বিবি ও বোন মোমেনা কাগুচির স্বামী আব্দুল হামিদের কাছ থেকে তিনটি দলিল মূলে মুন্সিগঞ্জ মৌজার এসএ ৭৯৪ খতিয়ানের ৯৪ ও ৯৫ দাগের ৯৯ শতক জমি কেনেন তিনি ও তার ভাই আব্দুল মাজেদ। ১৯৯৭ সালের ৩০ মার্চ ভাই মাজেদ তাকে ৩৩ শতক জমি লিখে দেয়। যদিও বর্তমান মাঠজরিপে বিআরএস ৩০৫৫ দাগে ৯৭ শতক জমি আব্দুল মজিদ ও আব্দুল মাজেদ এর নামে রেকর্ড হয়। ফকির রপ্তান ও তার স্ত্রী আরতি রপ্তানের বন্দোবস্তকৃত ৭০ শতক জমির মধ্যে ৬৪ শতক জমি তাদের নামে বিআরএস রেকর্ড হলেও তাকে ৩৩ শতক, তার ভাই বিষ্ণুপদ গাইনের কাছে ২২ শতক ও আবু বাক্কারের কাছে ১২ শতক জমি এফিডেফিডের মাধ্যমে দখলে দিয়ে অন্যত্র বসবাস করছেন।
আব্দুল মজিদ পাইক জানান, তার কেনা জমি কম হয়ে যাওয়ায় তা বুঝে পাওয়ার জন্য গত ১৯ এপ্রিল তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহায়তার শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। এ সময় তিনি কৃষ্ণপদ গায়েনের আট শতক জমি খাস বলে তা নিজের বলে দাবি করেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্ত মুন্সিগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিলে আগামি ৩ জুন উভয়পক্ষকে নিয়ে মাপ জরিপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যদিও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইউপি চেয়ারম্যানসহ উভয়পক্ষের সাথে কথা বলে গত ২৫ মে সোমবার জমি পরিমাপের সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ি ২৫ মে ও ২৬ মে দুই দিন মাপ জরিপ হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত ঈদের পর পরিষদে বসে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
২৭ মে বুধবার সকাল ৬টার দিকে গীতা রানী গাইন গরু ঘাস খাওয়াতে নিংে যাওয়ার সময় নতুন সীমানা পিলার উঠিয়ে দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান তার পুত্রবধু খাদিজা। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে কৃষ্ণপদ গাইনের পরিবারের লোকজন ছুঁটে এসে তাকে (মজিদ)সহ জামাতা বেল্লাল, মেয়ে খুকুমনি, পোতা ইব্রাহীম, ছেলে হাসানকে পিটিয়ে জখম করে। এ সময় তারাও প্রতিরোধ গড়ে তুললে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েকজন জখম হয়। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হলেও স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশনা অনুযায়ি পুলিশ কোন আসামীকে ধরবে না এমন আশ^স্ত হওয়ায় তারা বাড়িতেই অবস্থান করছেন। মেয়ে খুকুমনি ও জামাতা বেল্লাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গায়েন পরিবারের কাছে তিনি ১০ শতক জমি পাবেন বলে দাবি করেন। তিনি ৯৪ ও ৯৫ দাগের কেনা জমি বুঝে পেতে চান।
কৃষ্ণপদ গায়েন দাবি করেন, ফকির রপ্তান ও আরতী রপ্তানের কাছ থেকে পাওয়া তার ও তার ভাই বিষ্ণুপদ গায়েনের ৫৫ শতক জমির মধ্যে আট শতক জমি মজিদ পাইকের সাথে বিনিময় করা হয়। এখন ওই আট শতক জমি খাস দাবি করে মজিদ তাদের কাছে নতুন করে জমি চাইছে। ২৫ ও ২৬ মে উভয়পক্ষের সার্ভেয়র দিয়ে জমি মাপ করা হলেও ঈদ পরবর্তী পরিষদে বসে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল।
২৭ মে সকাল ৬টার পর তার স্ত্রী গীতা রানী গায়েন মজিদের বাড়ির সামনে রাস্তা থেকে নিজ বিলান জমিতে গরু খাস খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় নতুন বসানো সীমানা পিলার তোলার মিথ্যা অভিযোগ আনে। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে মজিদের ছেলে হাসান, হুসাইন, জামাতা বেল্লালসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা গীতার মাথায় ধারোলো দা দিয়ে কুপিয়ে ও পরে লাহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। খবর পেয়ে গীতাকে উদ্ধারে গেলে ছেলে রণজিৎ গাইন, শিবপদ গাইন, ধর্মদাস গাইন, বিষ্ণুপদ গাইন, রবীন্দ্রনাথ গাইন, অনিমেষ গাইন, ইন্দ্রজিৎ গাইন, সুরেন গাইন ও কৌশল্যা গাইন গীতাকে উদ্ধারে গেলে জামায়ত কর্মী হুসাইনের হাতে থাকা লোহার রড, বেল্লালের হাতে থাকা ধারালো দা ও আরো কয়েকজনের কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে তাদেরকে টিপিয়ে ও কুপিয়ে জখম করে।
মারাত্মক জখম অবস্থায় তাদেরকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে ছুঁটে আসেন বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান কবীর ও রাজ্জাক সরদারসহ কয়েকজন। অথচ ঘটনা ভিন্নখাতে করতে মজিদ পাইক, তার মেয়ে খুকুমনি, তার জামাতা বেল্লাল ও দুই ছেলে কাল্পনিক ক্ষত তৈরি করে হাসপাতালে ভর্তি হয়। হামলার ঘটনায় তার ছেলে রণজিৎ গায়েন বাদি হয়ে মজিদ পাইকসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে খানায় এজাহার দায়ের করলে ২৭ মে দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে ওই মামলা রেকর্ড করা হয়। একইভাবে ২৭ মে দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে মজিদ পাইকের ছেলে আব্দুল হুসাইনের দায়েরকৃত রণজিৎ গায়েনসহ নয়জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কাল্পনিক এজাহারটিও মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। গত ৫ দিনেও তাদের দায়েরকৃত মামলার আসামীদের গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। ফলে ন্যয় বিচার পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী নন।
এ ব্যাপারে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেবাশীষ গায়েন, সমাজকর্মী কমল আউলিয়া, মিজানুর কাগুচী, ফজলুর রহমান, বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান ও সার্ভেয়র রাশেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএস ম্যাপ অনুযায়ি নিদ্দিষ্ট সীমানা পিলার না পাওয়ায় সঠিক সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে মজিদ পাইক সাড়ে ৯৬ শতক জমি দখলের পাশাপাশি তার জমির উপর দিয়ে ইটসোলিং এর প্রায় আট শতক রাস্তা চলে গেছে। সুতরাং মজিদ পাইক রেকডীয় ৯৭ শতকের চেয়ে সাড়ে সাত শতক বেশি জমি দৃশ্যমান হয়েছে। ঈদের পরপরই পরিষদে বসে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে আসার কথা থাকলেও ২৭ তারিখের হামলার ঘটনা তাদেরকে হতাশ করেছে।
শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক সুদেব পাল জানান, দুটি মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা তিনি। তবে কেন আসামী ধরা হচ্ছে না সে ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি।











