নিজের উপার্জনে প্রথম কোরবানি: তরুণদের চোখে অন্যরকম ঈদের আনন্দ
আসাদুজ্জামান সরদার: ঈদুল আজহার আনন্দ সবার জন্যই স্পেশাল, কিন্তু এবার সাতক্ষীরার বেশ কয়েকজন তরুণের কাছে এই আনন্দের মাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতকাল যারা বাবার দেওয়া বা পারিবারিক কোরবানির অংশীদার ছিলেন, তারা এবার নিজেই কোরবানিদাতা। নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত প্রথম বেতনের টাকা, উৎসব বোনাস কিংবা প্রথম ব্যবসার লভ্যাংশ দিয়ে এবার আল্লাহর নামে পশু উৎসর্গ করছেন তারা। এই প্রথম কোরবানির” অনুভূতিতে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি, দায়িত্ববোধ এবং পরিবারের জন্য সীমাহীন গর্ব।
স্বপ্ন পূরণ: সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার রায়হানুল বাশার। গত ৮ মাস হলো লেখাপড়া শেষ করে নর্দাণ ইউনিভার্সিটি খুলনার ক্যাম্পাসে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছেন। এবার ঈদে তার মা গরুর ভাগে শরিক থাকলেও, রায়হানুল নিজের উপার্জনের টাকায় প্রথমবার এককভাবে একটি ছাগল কোরবানি দিচ্ছেন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে প্রভাষক রায়হানুল বাশার বলেন, ছোটবেলা থেকে আব্বাকে দেখতাম হাটে গিয়ে গরু কিনতে। এবার যখন নিজের টাকায় হাটে গিয়ে দরদাম করে একটা খাসি কিনলাম, তখন বুকটা এক অদ্ভুত গর্বে ভরে উঠেছিল। মায়ের হাতে যখন হাটের রসিদটা এনে দিলাম, মায়ের চোখে আনন্দাশ্রু দেখেছি। নিজের উপার্জনে প্রথম কোরবানি দেওয়ার এই আনন্দ কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব না।
২৮ বছর পর ত্যাগের আসল আনন্দ পেলেন আয়াত উল্লাহ: সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামের তরুণ আয়াত উল্লাহ। তিনি বর্তমানে মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ‘রবি’র ‘সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। জীবনের ২৮টি বছর পেরিয়ে এবারই প্রথম নিজের উপার্জনের টাকায় এককভাবে একটি ছাগল কোরবানি দিয়েছেন তিনি। এর আগে প্রতিবছর তার বাবা কিংবা পরিবার থেকে কোরবানি দেওয়া হতো।
নিজের অনন্য এই অনুভূতি প্রকাশ করে আয়াত উল্লাহ বলেন, যদি ফ্র্যাঙ্কলি বলি, কোরবানির অনুভূতি সবসময়ই ভালো। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে-যখন নিজের উপার্জনের টাকায় নিজে কোরবানি দেওয়া যায় এবং সেই মাংস সবাইকে খাওয়ানো যায়, সেই অনুভূতিটা একদমই ডিফরেন্ট। ছোটবেলা থেকে শুধু ঈদের আনন্দের ব্যাপারটা দেখে আসছি। কিন্তু নিজের টাকায় কোরবানি দেওয়ার পর সেই মাংস যখন সবাইকে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিচ্ছিলাম, তখন ত্যাগ করার যে আসল ভালো লাগা, সেটা এবারই প্রথম পেয়েছি।
তিনি আরও বলেন, এক কথায় ছোট করে বললে, এই ২৮ বছর শুধুমাত্র ঈদের আনন্দটুকুই উপভোগ করেছি। কিন্তু কোরবানির ঈদের যে ত্যাগ করার আনন্দটা, ত্যাগ করতে পারার যে মহিমাটা এবং মানুষকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেও যে আনন্দ-এইটা এবারই প্রথম উপভোগ করছি।
নতুন উদ্যোক্তার প্রথম সাফল্য: সাতক্ষীরার রাজার বাগান এলাকার আরেক তরুণ উদ্যোক্তা রায়হান কবির। গত দুই বছর ধরে পুকুরে মাছ চাষ ও ছাগল পালন করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের পর গত দুই বছরে তার ব্যবসা বেশ ভালো অবস্থানে এসেছে। এবার তিনি নিজের আয়ে পরিবারের সবার সাথে মিলে বড় কোরবানি দিচ্ছেন।
হাটের অভিজ্ঞতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার আনন্দ জানিয়ে রায়হান কবির বলেন, নিজের খামারের পশু দেখভালের পাশাপাশি এবার হাটে গিয়ে যখন নিজের টাকায় পছন্দের পশুটি কিনলাম, সেই অভিজ্ঞতা দারুণ! প্রথমবার নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা পশুকে ঘরে আনার পর পাড়ার সবাই যখন দেখতে আসছিল, তখন অন্যরকম এক তৃপ্তি পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি জীবনে স্বাবলম্বী হতে পেরেছি।
এই তরুণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রথম কোরবানিদাতার এই আনন্দ কেবল হাটের কেনাকাটা বা কোরবানি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। পশুটি বাড়িতে আনার পর তার যতœ নেওয়া, ঘাস-খড় খাওয়ানো এবং পশুর সাথে ছবি বা ছোট ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার মধ্যেও তারা এক ধরণের অনাবিল আনন্দ খুঁজে পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার রাজার বাগান এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব আব্দুল আজিজ বলেন, তরুণ প্রজন্ম যখন পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের শুরুতেই অপচয় না করে নিজের আয়ে কোরবানি দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে, তখন সমাজ ও পরিবার দুটোই উপকৃত হয়। এটি তাদের যেমন দায়িত্বশীল করে তোলে, তেমনি ত্যাগের মহিমাকেও হৃদয়ে ধারণ করতে শেখায়।











