শ্যামা কালী: সৃষ্টি, শক্তি ও অশুভ বিনাশের আদ্যশক্তি
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি। চারদিকে ঘন অন্ধকার, আর সেই অন্ধকার দূর করতে জ্বলে ওঠে অগণিত প্রদীপ। মন্দিরে মন্দিরে শোনা যায় শ্যামাসংগীত, ধূপের গন্ধে মুখরিত হয় পূজামণ্ডপ। ভক্তদের প্রার্থনা ও আরাধনায় উদ্ভাসিত হন দেবী শ্যামা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা ও দীপাবলি এভাবেই নিয়ে আসে ভক্তি, সাধনা ও আলোর বার্তা।
শ্যামা কালী বা দক্ষিণাকালী শক্তির এক বিশেষ রূপ। হিন্দুধর্মীয় দর্শনে তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির মূল উৎস। তিনি সৃষ্টি, পালন ও সংহারের শক্তির প্রতীক। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী কালীর আরাধনায় জীবনের অশুভ, অন্ধকার, ভয় ও বাধা দূর হয়। তাঁর কাছে মানুষ প্রার্থনা করে সাহস, শক্তি, জ্ঞান ও কল্যাণ।
দেবী কালীর উৎপত্তি নিয়ে পুরাণে নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। দেবীমাহাত্ম্য অনুসারে, অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গার ক্রোধ থেকে তাঁর ললাটে কৃষ্ণবর্ণের এক ভয়ংকর শক্তির আবির্ভাব ঘটে। সেই শক্তিই দেবী কালী। অসুরবিনাশের জন্যই তাঁর আবির্ভাব। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অসুরদের পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দেন।
রক্তবীজ বধের কাহিনি দেবী কালীর অন্যতম পরিচিত পৌরাণিক আখ্যান। রক্তবীজ নামের অসুরের বিশেষ ক্ষমতা ছিল, তার রক্তের এক ফোঁটা মাটিতে পড়লেই সেখান থেকে আরেক অসুরের জন্ম হতো। ফলে তাকে পরাজিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন দেবী কালী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করতে থাকেন। এভাবে তিনি রক্তবীজকে বধ করে দেবতাদের বিপদমুক্ত করেন। এই কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
দেবী কালীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে শ্যামা কালী বিশেষভাবে পূজিত। বাংলার ঘরে ঘরে তিনি মা শ্যামা, আদ্যামা কিংবা মহামায়া হিসেবে পরিচিত। তাঁর গায়ের রং সাধারণত কৃষ্ণ বা নীল বর্ণের। চার হাতে থাকে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড এবং বর ও অভয় মুদ্রা। গলায় মুণ্ডমালা, কোমরে কর্তিত হাতের মালা, উন্মুক্ত কেশ ও প্রসারিত জিহ্বা তাঁর পরিচিত প্রতীকী রূপ। তাঁর পদতলে শায়িত থাকেন দেবাদিদেব মহাদেব।
পুরাণের একটি কাহিনি অনুসারে, অসুরবিনাশের পর দেবী কালী ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রলয়ংকরী নৃত্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিলে দেবতারা তাঁকে থামাতে ব্যর্থ হন। তখন শিব তাঁর চলার পথে শুয়ে পড়েন। শিবের বুকে পা পড়তেই দেবী নিজের স্বামীকে চিনতে পেরে বিস্মিত ও লজ্জিত হন। তিনি জিহ্বা বের করে ফেলেন। কালীর এই রূপে শক্তি ও চেতনার এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। শক্তি ও শিব পরস্পরের পরিপূরক—এই ভাবনাও এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
হিন্দুধর্মীয় দর্শনে কালীকে দশমহাবিদ্যার অন্যতম প্রধান দেবী হিসেবে মানা হয়। শাক্ত ও তান্ত্রিক সাধনায় তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। শ্মশানকালী, দক্ষিণাকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, তারা ও চামুণ্ডা—বিভিন্ন নামে ও রূপে তিনি পূজিত হন। তবে বাংলায় শ্যামা কালী বা দক্ষিণাকালীর মাতৃরূপের আরাধনা বিশেষ জনপ্রিয়।
দুর্গাপূজার বিজয়ার পর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই রাতেই উদযাপিত হয় দীপাবলি বা দীপান্বিতা উৎসব। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে মানুষ অন্ধকারের ওপর আলোর, অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের এবং অশুভের ওপর শুভশক্তির বিজয় কামনা করে।
দীপাবলি শুধু আলোকসজ্জার উৎসব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা পৌরাণিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস। রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে রাবণকে পরাজিত করে শ্রীরাম যখন অযোধ্যায় ফিরে আসেন, তখন নগরবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। সেই আনন্দ থেকেই দীপ জ্বালানোর ঐতিহ্যের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
আবার বিষ্ণুপুরাণের কাহিনিতে বামন অবতারের মাধ্যমে অসুররাজ বলিকে পাতালে পাঠানোর কথা রয়েছে। দীপাবলির সঙ্গে এই কাহিনিরও যোগসূত্র রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলি উদযাপনের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আখ্যান প্রচলিত।
বাংলার অনেক পরিবারে দীপাবলির রাতে পূর্বপুরুষদের স্মরণে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় বাড়ির আঙিনা, মন্দির ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। কোথাও কোথাও বাঁশের মাথায় প্রদীপ বসিয়ে আলো জ্বালানোর ঐতিহ্যও দেখা যায়।
কালীপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। তবে এই শক্তি কেবল অসুরবিনাশের প্রতীক নয়; অন্যায়, অবিচার, হিংসা, লোভ, অহংকার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে মানুষের নৈতিক শক্তিরও প্রতীক। দেবী কালীর মাতৃরূপ মানুষকে সাহস ও আশ্রয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তন্ত্রশাস্ত্রে পঞ্চমকারের যে ব্যাখ্যা রয়েছে, তার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বিশেষভাবে আলোচিত। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুনের আক্ষরিক অর্থের বাইরেও আত্মসংযম, ইন্দ্রিয়জয়, সাধনা এবং জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের প্রতীকী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি ও আত্মোপলব্ধির গুরুত্ব প্রকাশ পায়।
ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করা। অন্ধকার দূর করতে যেমন একটি প্রদীপই যথেষ্ট, তেমনি সমাজের অন্যায় ও অমানবিকতা দূর করতে প্রত্যেক মানুষের বিবেক, সততা ও মানবিকতার আলো প্রয়োজন।
শ্যামাপূজা উপলক্ষে মন্দিরে মন্দিরে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পূজার সূচিতে থাকে দেবীর আবাহন, বাল্যভোগ, পূজা-অর্চনা, ভোগ নিবেদন, প্রসাদ বিতরণ, শ্যামাসংগীত, ভক্তিমূলক গান, ধর্মীয় আলোচনা, চণ্ডীপাঠ ও প্রদীপ প্রজ্বালন। মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী শ্যামা মায়ের মহাপূজা।
এদিন ভক্তরা দেবীর কাছে পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং বিশ্বমানবতার শান্তির জন্যও প্রার্থনা করা হয়।
শ্যামা কালী সৃষ্টির আদ্যাশক্তির প্রতীক। তাঁর আরাধনা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো শেষ হয় না। অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, শুভশক্তির জয়ই চিরন্তন প্রত্যাশা। তাই শ্যামাপূজা ও দীপাবলির মূল বাণী হোক—অশুভের বিনাশ, শুভবোধের জাগরণ এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।
লেখক: সংবাদকর্মী









